যদি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে গিয়ে মুখোমুখি হন ভগবান শিবের মূর্তির, অবাক হবেন না কি? সেখানে নটরাজ রূপে (Nataraja statue) ধরা দেন দেবাদিদেব। প্রশ্ন জাগতেই পারে— বিজ্ঞান আর ধর্ম কি তবে সহাবস্থান করতে পারে? নয়তো কেনই না বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের কর্মস্থলে রয়েছে শিবের মূর্তি?
আসলে নটরাজের এই মূর্তিকে ঘিরে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানের এক অনন্য গল্প। ২০০৪ সালে ভারত সরকার বিশ্বের বৃহত্তম পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগার CERN-কে প্রায় ২ মিটার উঁচু ব্রোঞ্জের নটরাজ মূর্তিটি উপহার দেয়। বর্তমানে এটি CERN-এর ক্যাম্পাসে স্থাপন করা আছে এবং দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
কেন নটরাজ রূপকেই বেছে নেওয়া হয় উপহার হিসেবে?
নটরাজ হলেন ভগবান শিবের নৃত্যরত রূপ। হিন্দু দর্শনে এই নৃত্য কেবল ধর্মীয় প্রতীক নয়; এটি মহাবিশ্বের সৃষ্টি, সংরক্ষণ, ধ্বংস এবং পুনঃসৃষ্টির চিরন্তন চক্রের প্রতীক। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব কখনও স্থির নয়— সব সময় পরিবর্তনশীল।
বিজ্ঞানের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
CERN-এ বিজ্ঞানীরা উপ-পারমাণবিক কণা, তাদের সংঘর্ষ এবং মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন নিয়ে গবেষণা করেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত এই গবেষণাগারেই ২০১২ সালে আবিষ্কৃত হয়েছিল ‘গড পার্টিকল’ বা ‘ঈশ্বর কণা’। পৃথিবীর ১০০-এরও বেশি দেশের বৈজ্ঞানিক এই গবেষণাগারের সঙ্গে যুক্ত।
কণাগুলোর এই অবিরাম গতি, সৃষ্টি ও রূপান্তরের ধারণার সঙ্গে নটরাজের মহাজাগতিক নৃত্যের একটি প্রতীকী মিল খুঁজে পান অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। অনেকে যদিও মনে করেন, CERN-এ শিবের মূর্তি থাকার অর্থ, বিজ্ঞান নাকি হিন্দু দর্শনকে সত্য বলে স্বীকার করেছে। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। মূর্তিটি ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি সাংস্কৃতিক উপহার। এটি বিজ্ঞান ও প্রাচীন দর্শনের মধ্যে সহাবস্থানের প্রতীক, কোনও ধর্মীয় বা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।
মূর্তির পাশে থাকা ফলকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নটরাজের ‘আনন্দ তাণ্ডবম’ নৃত্য আদতে সৃষ্টি ও ধ্বংসের অনন্ত চক্রের প্রতীক। ভারতীয় শিল্পীরা আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর এমন ভাবনার জন্ম দিয়েছিল। অনেক আধুনিক পদার্থবিদ এই ভাবনাকে উপ-পরমাণবিক জগতের নিরন্তর গতিশীলতার সঙ্গে রূপক অর্থে তুলনা করেছেন।
মহাবিশ্বের গতিশীলতাকে ভারতীয় দর্শন ভাবনায় স্থান দিয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। আজ আধুনিক বিজ্ঞানও সেই মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করে চলেছে। দুই ক্ষেত্রের উদ্দেশ্য এক না হলেও, মহাবিশ্বকে বোঝার কৌতূহলই যেন এক সেতু গড়ে দেয় এই দুইয়ের মাঝে।
