বর্ষার মাসে দোলখেলা, যেখানে প্রধান উপাদান আবার রঙ নয়, মাখন— এমন অভিনব উৎসবের কথা শুনেছেন কখনও? না শোনাই স্বাভাবিক, অথচ এ কোনও হালের ট্রেন্ড নয়। এই রীতি বহু প্রাচীনকাল থেকেই মেনে চলেছে এক পাহাড়ি উপত্যকার বাসিন্দারা। চাইলে পর্যটকরাও অংশ নিতে পারেন এমন দোলখেলায়।
ভারতের উৎসবের বৈচিত্র্য সত্যিই অবাক করার মতো। একই উৎসব দেশের একেক প্রান্তে একেক নামে, একেক ধরনের রীতিতে পালিত হয়। স্থানীয় সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে গিয়ে পরিচিত উৎসবও কখনও সম্পূর্ণ নতুন রূপ পায়। তেমনই এক উৎসব হল উত্তরাখণ্ডের আন্দুরি উৎসব, অনেকে একে ‘মাখন হোলি’ বা ‘বাটার ফেস্টিভ্যাল’-ও বলে (Butter Holi)।
উত্তরকাশীর রাইথাল গ্রামের কাছে দায়ারা বুগিয়ালের সবুজ পাহাড়ি তৃণভূমিতে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় ভাষায় ‘বুগিয়াল’ বলতে বোঝায় বিস্তীর্ণ পাহাড়ি তৃণভূমি বা ঘাসে ঢাকা চারণভূমি। প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময় রাইথাল গ্রামের বাসিন্দারা তাঁদের গবাদি পশু নিয়ে উঠে যান দায়ারা বুগিয়ালে। কয়েক মাস ধরে সেখানকার সবুজ ঘাসে পশুগুলি চরে বেড়ায়। রাখালেরা সেই সময় অস্থায়ী তাঁবুতে থেকে পশুগুলির দেখাশোনা করেন।
পাহাড়ি মানুষের বিশ্বাস, বুগিয়ালের পুষ্টিকর ঘাস খেয়ে গবাদি পশু আরও স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে। ফলে দুধ উৎপাদনও বাড়ে। কয়েক মাস চারণের পর যখন পশুগুলি গ্রামে ফিরে আসে, তখন সেই আনন্দ থেকেই এই উৎসবের আয়োজন।
উৎসবটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভগবান কৃষ্ণের কথাও। মাখনচোর হিসেবেই শ্রীকৃষ্ণ ভারতীয় পুরাণে সুপরিচিত। তাই গবাদি পশুর সুস্থতা, দুধ ও মাখনের প্রভূত উৎপাদনের জন্য শ্রীকৃষ্ণ ও বুগিয়াল মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়।
সাধারণত ভাদ্র সংক্রান্তির সময়, অর্থাৎ আগস্ট মাসে এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের শুরুতে থাকে পুজো ও প্রার্থনা। পাহাড়ি লোকগান, নাচ এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানেও মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ। দই-হাঁড়ি ভাঙার মতো আয়োজনও থাকে। কিন্তু আসল মজা শুরু হয় তার পরেই। পুজো ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে সকলে একে অপরের মুখে মাখন মাখিয়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবুজ পাহাড়ি তৃণভূমি পরিণত হয় একেবারে অন্য রকমের হোলির আসরে।
আন্দুরি উৎসবের প্রস্তুতি একদিনে শুরু হয় না। উৎসবের বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ফুল দিয়ে বাড়ি সাজানো হয়। বাড়ির দরজার সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয় নানা সজ্জাদ্রব্য। তবে সময়ের সঙ্গে উৎসবের রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। অতীতে মাখন ছাড়া গোবর মাখানোও ছিল উৎসবের অঙ্গ। এখন যদিও তেমনটা আর হয় না বললেই চলে।
বর্তমানে আন্দুরি উৎসবকে ঘিরে পর্যটকদের জন্য ট্রেকিং, ক্যাম্পিং, রাতের তাঁবুতে থাকা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো নানা আয়োজনও দেখা যায়। পর্যটকরাও উদারচিত্তে শামিল হন এই স্থানীয় উদযাপনে।
