ইছামতীর তীরে প্রাচীন জনপদ বনগাঁ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে বনগাঁর দুটি বিধানসভা কেন্দ্রই বিজেপির খাসতালুকে পরিণত রয়েছে৷ বনগাঁ উত্তরে আগেরবার বিজেপির অশোক কীর্তনিয়া ১০ হাজার ৪৮৮ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন তৃণমূলের শ্যামল রায়কে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি এই কেন্দ্র থেকে ব্যবধান বাড়িয়ে ২৫ হাজার ৩০ ভোটে এগিয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই কেন্দ্রে বিজেপি রাজনৈতিক জমি যথেষ্ট শক্তপোক্ত৷ সেই জমি বিজেপির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবার ভরসা রেখেছেন তৃণমূলের বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বিশ্বজিৎ দাসের উপর৷
বিশ্বজিৎ দাস এই কেন্দ্রের দুবারের বিধায়ক৷ ফলে এই এলাকার অনেক মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি রয়েছে৷ স্বাভাবিকভাবে প্রচারে তিনি কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন৷ ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিশ্বজিৎ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন৷ একুশের বিধানসভায় তিনি বাগদা থেকে বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে জিতে আসেন৷ পরে অবশ্য তিনি তৃণমূলে ফেরেন৷ দল তাকে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা সভাপতিও করে। কিন্তু তৃণমূল কর্মীদের একটা অংশ জানাচ্ছে, তাঁর বিজেপিতে যাওয়া, আবার তৃণমূলে ফিরে আসা দলের অনেকেই এখনও মেনে নিতে পারেননিI তাছাড়া সাম্প্রতিক সময় বনগাঁ পুরসভা নিয়ে ডামাডোলও শহরের মানুষের কাছে একটি বিরক্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছে৷
তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস। ফাইল ছবি।
তৃণমূলের বনগাঁ পুরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান গোপাল শেঠকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে দিলীপ মজুমদারকে৷ গোপালবাবুর বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়েছিল৷ সেই অনাস্থায় ৯ জন কাউন্সিলরও সই করেননি৷ ঘটনাচক্রে সে সময় একই রাতে ওই কাউন্সিলরদের বাড়িতে বোমাবাজি ও গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছিল৷ ওই ঘটনায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছিল৷ বিশ্বজিৎবাবুর কাছে চ্যালেঞ্জ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মিটিয়ে সকলকে একসঙ্গে ভোটের ময়দানে নামানো৷ সমস্যা হল, এখনও গোপালবাবুকে প্রচারে দেখা যায়নি৷
বনগাঁ শহরে অটোচালক ও টোটো চালকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, কোনও কারণ ছাড়া নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে টোটোচালক অটোচালকদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়৷ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁরা কাজ বন্ধ রেখে যেতে বাধ্য হন৷ সেটাও ক্ষোভের উদ্রেক করেছে তাঁদের মধ্যে। যদিও বিশ্বজিৎবাবু তাঁদের ক্ষোভ কমাতে টোটোচালকদের নিয়ে দু'টি বৈঠক করেছেন৷ সেই বৈঠক ফলপ্রসূ হয় কিনা, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। পাশাপাশি বনগাঁ শহরের যানজট সমস্যা এখনও মেটেনি। পথে বেরোলে এখনও মানুষকে নাকাল হতে হয়৷ বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে৷
সমস্যা অবশ্য বিজেপিতেও প্রচুর। বর্তমান বিধায়ক অশোক কীর্তনীয়াকে পাঁচ বছর এলাকায় দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। তিনি কোনও উন্নয়ন করেননি বলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে ঢালাও প্রচার করা হচ্ছে৷ এমনকি বিভিন্ন এলাকায় অশোকবাবু প্রচারে গেলে তাকে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে৷ পালটা বিজেপি সমর্থকদের একাংশ বলছেন, অশোকবাবু কাজের মানুষ, স্বচ্ছ মানুষ। স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা, সেভাবে কাজ করতে না পারলেও অশোক কীর্তনিয়া লোকটা সাচ্চা। তাঁর বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতির অভিযোগ নেই৷ যদিও বিজেপি বিধায়ক অশোকবাবু দাবি করছেন, বিধায়ক হিসাবে উন্নয়ন খাতে প্রাপ্ত সিংভাগ অর্থই তিনি ব্যয় করেছেন। গত পাঁচ বছরে বিধায়ক তবিলের কত টাকা পেয়েছেন, কোন খাতে সেটা ব্যয় করেছেন, তা পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক৷ অশোকবাবুর বক্তব্য, "বিধায়ক তহবিলের টাকা আমি যা খরচ করতে পেরেছি রাজ্যের কোনও তৃণমূল বিধায়কও তা পারেননি৷" এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বাইরে লড়াইয়ে রয়েছেন বাম সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী পীযুষ কান্তি সাহা। আগের বার যে হাজার পনেরো ভোট তিনি পেয়েছিলেন, সেটা ধরে রাখাই আসল লড়াই তাঁর। কংগ্রেস প্রার্থী নীলাঞ্জন সাহাও জামানত বাঁচাতেই লড়ছেন।
অশোক কীর্তনিয়া। ফাইল ছবি।
বনগাঁ উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৪২ হাজার ২৩৯ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে৷ এদের সিংহভাগই মতুয়া৷ বনগাঁ উত্তরের মোট ভোটার ২,২৫,৯৬২। প্রচারে বিশ্বজিৎবাবু বলছেন, "বিজেপি চক্রান্ত করে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এই বৈধ ভোটারদের নাম কেটে দিয়েছে৷ আগামী দিনে এদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো চক্রান্ত করেছে৷" সঙ্গে তাঁর আশ্বাস, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের পাশে রয়েছেন৷ বিজেপির বক্তব্য, তৃণমূলই বিএলওদের দিয়ে চক্রান্ত করে নাম বাদ দিচ্ছে। এই বাদ পড়া মতুয়া ভোটার এই কেন্দ্রে বড় ফ্যাক্টর। তাৎপর্যপূর্ণভাবে বনগাঁ জুড়েই সিএএ সার্টিফিকেট দেওয়ার নামে টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছিল শান্তনু ঠাকুরের মতুয়া মহাসংঘের বিরুদ্ধে। যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে।
বনগাঁ উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৪২ হাজার ২৩৯ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে৷ এদের সিংহভাগই মতুয়া৷ বনগাঁ উত্তরের মোট ভোটার ২,২৫,৯৬২। প্রচারে বিশ্বজিৎবাবু বলছেন, "বিজেপি চক্রান্ত করে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এই বৈধ ভোটারদের নাম কেটে দিয়েছে৷ আগামী দিনে এদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো চক্রান্ত করেছে৷"
ইতিমধ্যে বনগাঁ শহরে সভা করে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ যদিও সেই সভায় আশানুরূপ ভিড় হয়নি বলে দাবি বিজেপির৷ তৃণমূল সে দাবি ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছে। আগামী দিনে বনগাঁয় ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আসার কথা৷ সবমিলিয়ে তৃণমূল চাইছে তাদের হারানো রাজনৈতিক জমি ফিরে পেতে আর বিজেপি চাইছে তাদের অগ্রগতি বজায় রাখতে৷ এখন ইছামতীতে ফের পদ্ম ফুটবে নাকি ইছামতী পাড়ে জোড়াফুল গজাবে, সেটাই দেখার।
