shono
Advertisement
Hotspot kaliganj

মেয়ের মৃত্যু প্রভাব ফেলবে ভোটবাক্সে? কালীগঞ্জের 'সহানুভূতি' পাবেন তামান্নার মা?

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই আসনে বিশেষ আশা দেখছে না বিজেপি। ২০২৫ সালে এই কেন্দ্রে ৫০ হাজার ভোটে হারের পরও শুভেন্দু অধিকারী এই কেন্দ্রে 'জয়' দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল হিন্দু ভোট একত্রিত হচ্ছে।
Published By: Subhajit MandalPosted: 10:01 PM Apr 14, 2026Updated: 10:14 PM Apr 14, 2026

'আমার তামান্না চলে গিয়েছে। আর কোনও তামান্না যেন না যায়', বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়ে মায়েদের এই কথাগুলিই বলছেন সাবিনা ইয়াসমিন। প্রচারে বেরিয়ে মাঝে মাঝে গলা ধরে আসছে তাঁর। তবু দৃপ্তকণ্ঠে পার্টির লাল ঝান্ডা হাতে নিয়ে এগিয়ে চলার শপথ নিয়েছেন তামান্না খাতুনের মা।

Advertisement

২০২৫ সালের ২৩ জুন, কালীগঞ্জ উপনির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন দুপুরে বোমাবাজিতে মৃত্যু হয় মোলান্দি গ্রামের ৯ বছরের নাবালিকা তামান্না খাতুনের। সে খবর চোখে জল এনেছিল গোটা রাজ্যের। সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে দ্রুত পুলিশকে দোষীদের গ্রেপ্তার করে কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। পুলিশও দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বোমাবাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু পুলিশি তদন্তে সন্তুষ্ট হতে পারেননি সাবিনারা। পরবর্তীতে গতবছর জুলাই মাসে মেয়ের মৃত্যুর সুবিচার চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় কালীগঞ্জের নিহত নাবালিকা তামান্না খাতুনের পরিবার। সিবিআই তদন্ত চায় পরিবার। কিন্তু তারপরও পেরিয়েছে বহুদিন। আজও 'সুবিচারে'র অপেক্ষায় তামান্নার মা। শাসক শিবিরের উপর আস্থা না রেখে, শাসক বদলের উদ্দেশে ভোটের ময়দানে তিনি নিজেও। প্রতিমুহূর্তে মেয়ের স্মৃতি তাড়া করছে সাবিনাকে। প্রতিবেশীরা বলেন, অবসাদে ভুগছিলেন মহিলা। গত ডিসেম্বরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। অবসাদ ভুলে তাঁর সামনে নতুন লড়াই। সেই সাবিনা ইয়াসমিনই আজকের প্রতিবেদনের মুখ্য চরিত্র। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কি? সেটা সময় বলবে।

কালীগঞ্জে সিপিএমের প্রার্থী মৃত তামান্না খাতুনের মা সাবিনা ইয়াসমিন।

এমনিতে বাংলা তথা দেশের ইতিহাসে আলাদা জায়গা রয়েছে কালীগঞ্জের। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বশ্যতা স্বীকারের, মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার, মীর মদনদের আপ্রাণ লড়াই, সবকিছুর সাক্ষী এই কালীগঞ্জ। ইতিহাসের মূর্ত প্রতীক হয়ে আজও দাঁড়িয়ে পলাশীর সেই মনুমেন্ট। আশপাশটা সুন্দর সাজানো-গোছানো। কিন্তু কালীগঞ্জ বিধানসভার সিংহভাগটাই প্রত্যন্ত গ্রাম। প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার গ্রাম্য। কোনও কোনও গ্রাম বেশ দুর্গমও। প্রায় ৬০ শতাংশ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই বিধানসভা কেন্দ্রটি রাজ্যের শাসকদলের শক্ত ঘাঁটি। একটা সময় এই কেন্দ্রে পালা করে জিতত কংগ্রেস ও আরএসপি। ২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের বছর কালীগঞ্জে প্রথমবার জোড়াফুল ফোটে। ২০১৬ সালে অবশ্য এই কেন্দ্রটি কংগ্রেসের দখলে যায়। একুশে ফের তৃণমূলের টিকিটে জেতেন নাসিরুদ্দিন আহমেদ। ২০২৫ সালে বিধায়ক থাকাকালীনই মৃত্যু হয় নাসির সাহেবের। তাঁর প্রয়াণের পর উপনির্বাচনে কালীগঞ্জ থেকে জিতে আসেন তাঁর কন্যা আলিফা আহমেদ। তিনিই ফের শাসক শিবিরের প্রার্থী। আলিফার জয়ের পরই বিজয় মিছিল থেকে ছোড়া বোমার আঘাতে সন্তানহারা হন সাবিনা ইয়াসমিন। আলিফাকে এবার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন সেই সাবিনাই। এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করেছে বাপন ঘোষকে। তিনি সংগঠনের লোক। ২০২৫ উপনির্বাচনে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হিসাবে লড়েছিলেন কাবিলউদ্দিন শেখ। এবার তিনি লড়বেন শুধু কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে।

আলিফা আহমেদ। ফাইল ছবি।

রাজ্যের অন্যান্য সংখ্যালঘু এলাকার মতো কালীগঞ্জেও পরিযায়ী শ্রমিক একটা বড় ইস্যু। সেভাবে কর্মসংস্থান নেই। কৃষিই একমাত্র ভরসা। যদিও শাসক শিবিরের দাবি, গত ১৫ বছরে কালীগঞ্জ বদলে গিয়েছে। সরকারি তহবিল থেকে রাস্তা, আলো, বাস স্ট্যান্ড, বিশ্রামাগার-সহ শতাধিক প্রকল্পের কাজ হয়েছে বলে দাবি কালীগঞ্জের বিদায়ী বিধায়ক আলিফা আহমেদের। বিধায়ক তহবিলের ৩ কোটি ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ইতিমধ্যেই খরচ হয়েছে। বাকি টাকাও উন্নয়নমূলক কাজে বরাদ্দ করা আছে। যা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও হাতিয়ার হতে চলেছে তৃণমূল প্রার্থী আলিফা আহমেদের। তৃণমূলের দাবি, শিক্ষাক্ষেত্রে বিধায়ক তহবিলের প্রায় ৭০ লক্ষ টাকায় কালীগঞ্জ বিধানসভার ২০টি উচ্চ বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যায়ন করা হয়েছে।

পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলিতে প্রবেশদ্বার নির্মাণ, মুক্ত মঞ্চ তৈরির মতো বিভিন্ন কাজ হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে কালীগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে। রাস্তা নির্মাণে প্রায় ৫৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। কালীগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্গত ১৩টি অঞ্চলে একটি করে রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আলোকসজ্জার ক্ষেত্রেও বড়সড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩টি অঞ্চলের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় সোলার হাই মাস্ট লাইট লাগানো হয়েছে। কাজ যে হয়েছে সেটা মানছেন স্থানীয়রাও। তবে কিছু অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, একটা স্টেডিয়ামও করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটা এখনও চালু হয়নি। একটা কমিউনিটি সেন্টার এখনও নির্মীয়মাণ। সাধারণ মানুষ এসবের সুবিধা পাচ্ছেন না। যদিও বিধায়ক আলিফা আহমেদ বলছেন, "আমাদের সরকারের একটাই মন্ত্র, সেটা হল উন্নয়ন এবং পরিষেবাকে প্রতিটা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।"

তৃণমূলের দাবি, শিক্ষাক্ষেত্রে বিধায়ক তহবিলের প্রায় ৭০ লক্ষ টাকায় কালীগঞ্জ বিধানসভার ২০টি উচ্চ বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলিতে প্রবেশদ্বার নির্মাণ, মুক্ত মঞ্চ তৈরির মতো বিভিন্ন কাজ হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে কালীগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে। রাস্তা নির্মাণে প্রায় ৫৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। কালীগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্গত ১৩টি অঞ্চলে একটি করে রাস্তা নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আলোকসজ্জার ক্ষেত্রেও বড়সড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিরোধীরা অবশ্য উন্নয়নের তত্ত্ব মানতে নারাজ। সিপিএম নেতা দেবাশিস আচার্য বলেন, "বিগত পাঁচ বছরে জল পরিষেবাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কালীগঞ্জের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জল আর স্বাস্থ্যের বেহাল অবস্থাও কালীগঞ্জের বিধায়কের আমলেই হয়েছে।" কালীগঞ্জের বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষ বলেন, "৩৪ বছরের বাম সরকার এবং ১৫ বছরে তৃণমূল সরকারের আমলে কালীগঞ্জে কোনও উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। মানুষের চিকিৎসা হয় না। শুধু রেফার করা হয়।" বস্তুত, এলাকার কিছু কিছু সৌন্দর্যায়নের কাজ হলেও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যের মতো ইস্যুতে এখনও কালীগঞ্জ পিছিয়ে। শাসক শিবিরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যে একেবারে নেই তেমনও নয়। কিন্তু সেই ক্ষোভ কাজে লাগাবে কে?

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই আসনে বিশেষ আশা দেখছে না বিজেপি। ২০২৫ সালে এই কেন্দ্রে ৫০ হাজার ভোটে হারের পরও শুভেন্দু অধিকারী এই কেন্দ্রে 'জয়' দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল হিন্দু ভোট একত্রিত হচ্ছে। হিন্দু এলাকায় জিতেছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপির দৌড় যে শুধুই হিন্দু এলাকায় সেটা মেনে নিয়েছেন শুভেন্দু। সেদিক থেকে দেখতে হলে বিজেপি চ্যালেঞ্জার নয়। প্রকৃত অর্থে শাসকের চ্যালেঞ্জার হতে পার‍ত বামেরা। সাবিনা প্রার্থী হলে সহানুভূতির স্রোত বইবে, এই আশাতেই পার্টি সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে টিকিট দেওয়া। কিন্তু সাবিনা প্রার্থী হওয়ার পর যেভাবে দলের অন্দরেই বিরোধ শুরু হয়েছে, সেটা কস্মিনকালেও ভাবেননি আলিমুদ্দিনের ভোট ম্যানেজাররা। সিপিএমের স্থানীয় নেতারা বলছেন, "দীর্ঘদিন ধরে শাসক শিবিরের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমরা সংগঠন আগলে রেখেছি। সেখানে পার্টির সদস্য নয়, এমন একজনকে টিকিট দেওয়া হল।" শোনা যাচ্ছে, সাবিনা প্রার্থী হওয়ায় দলের পুরনো নেতাদের অনেকেই রাস্তায় নামেননি। তাছাড়া এভাবে সহানুভূতিকে ভোটের বাক্সে কাজে লাগানোর নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দলের কর্মীরা বলছেন, সাবিনাকে সামনে রেখে অন্য কাউকে প্রার্থী করলে হয়তো দলের লাভটা বেশি হত।

অতএব কী দাঁড়াল? কালীগঞ্জের ভোটযুদ্ধে প্রবল শক্তিশালী শাসকের বিরুদ্ধে সাবিনা ইয়াসমিন যদি সিরাজের মতো লড়তেও চান, তাঁর নিজের শিবিরের 'মীরজাফর'রাই হয়তো তাঁর লড়াইকে কঠিন করে দেবেন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement