বেলডাঙা শহর থেকে কিছুটা এগোলেই ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে বিরাট কর্মকাণ্ড। একটা সময় ছাতিয়ানির এই এলাকাগুলি ছিল শুধুই ফাঁকা মাঠ। চাষবাস হত। বছরের এই সময় অবশ্য বেশিরভাগ খেতের গম কাটা হয়ে গিয়েছে। ফলে ধু ধু প্রান্তর ছাড়া কিছুই চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু এখন ছাতিয়ানিতে গেলেই বিরাট ওই কর্মযজ্ঞ চোখে পড়বে। সৌজন্যে 'বাবরি মসজিদ।'
গত বছর ৬ ডিসেম্বর ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে মসজিদের শিলান্যাস করেন তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। মুর্শিদাবাদ তথা গোটা রাজ্যের ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজ হুমায়ুনের সেই বাবরিতে মুক্ত হস্তে দান করেন। কেউ ইট, কেউ সিমেন্ট, কেউ বালি, কেউ টাকা পয়সা, যে যা পেরেছেন দান করছেন। সেই বাবরি চত্বরে এখনও মসজিদ নির্মাণের কাজ চলছে। মসজিদ চত্ত্বরে দৃশ্যতই রোজ বসছে 'মেলা'। যেখানে মসজিদের প্রতিকৃতির ছবি-সহ টিশার্ট, কফি মগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি হচ্ছে। আখের রস, আইসক্রিম, ফুচকা থেকে শুরু করে বসছে নানা দোকান। লেগেছে খাওয়ার হোটেল। স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও ভিড় করছেন মানুষ।
Advertisement
রেজিনগরে মসজিদ নির্মাণ। ফাইল ছবি।
সেই জনসমাগম এবং সেদিনের অনুদানের বহর দেখে খানিক অতি উৎসাহে আলাদা দল ঘোষণা করে ফেলেছেন হুমায়ুন। ভোটের ময়দানে নিজে নেমেছেন দুই আসন থেকে। সঙ্গী হিসাবে পেয়ে গিয়েছেন হায়দরাবাদের সাংসদ তথা মিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসিকে। তাঁর আশা ধর্মীয় ভাবাবেগ ভোটবাক্সে আছড়ে পড়লে ভোটের সুনামি হবে। শুধু যে তিনি রেজিনগর জিতবেন তাই নয়, গোটা রাজ্যেই সংখ্যালঘু ভোটারদের একজোট করে বাংলায় সরকার গড়ার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবেন। কিন্তু বাবরির শিলান্যাসের পর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ধর্মীয় আবেগ খানিক স্তিমিত হয়েছে। মানুষ এখনও মসজিদ চত্বরে যান। সেটা নেহাতই ধর্মবিশ্বাসের জন্য, মসজিদে যাওয়া মানেই যে হুমায়ুনের সমর্থক হবেন তিনি তেমনটা নয়।
এটা ঠিক রেজিনগর বিধানসভা তথা গোটা মুর্শিদাবাদ এবং মালদহের ভোটচিত্রে বড় নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হতে চলেছে বাবরি। একই সঙ্গে এটাও ঠিক যে বাবরি মসজিদ নির্মাণের আগে থেকেই রেজিনগরের হুমায়ুনের প্রভাব রয়েছে। হুমায়ুন যে জেলা পরিষদের সদস্য থেকে বিধায়ক হয়ে রাজ্যের মন্ত্রী হয়েছিলেন সেটাও এই রেজিনগরকে সম্বল করেই। এই কেন্দ্রের বর্তমান ভোটার সংখ্যা মোটামুটি ২ কোটি ৫৯ হাজার। এই এলাকায় ৬২ শতাংশ মুসলিম ভোটার, ৩৮ শতাংশ হিন্দু। তৃণমূল প্রার্থী করেছে আতাউর রহমানকে। দলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি। তাঁর স্ত্রী এখনও পঞ্চায়েত সমিতির সভানেত্রী। বস্তুত এলাকার তৃণমূলের সংগঠন আতায়ুরেরই হাতে। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন রবিউল আলম চৌধুরী। আতাউরের সঙ্গে তাঁর যে বিশেষ বনিবনা ছিল তেমন নয়। সম্ভবত সেকারণেই রবিউলকে সরিয়ে পাশের কেন্দ্র বেলডাঙায় প্রার্থী করা হয়েছে। রেজিনগরে এখন শাসক শিবিরে সেভাবে গোষ্ঠীবাজি চোখে পড়ে না। লড়াইয়ে অবশ্য রয়েছেন কংগ্রেসের জিল্লু শেখ এবং বিজেপির বাপন ঘোষও। দু'জনেই সাংগঠনিক স্তরে পরিচিত।
এই কেন্দ্রের বর্তমান ভোটার সংখ্যা মোটামুটি ২ কোটি ৫৯ হাজার। এই এলাকায় ৬২ শতাংশ মুসলিম ভোটার, ৩৮ শতাংশ হিন্দু। তৃণমূল প্রার্থী করেছে আতায়ুর রহমানকে। দলের প্রাক্তন ব্লক সভাপতি। তাঁর স্ত্রী এখনও পঞ্চায়েত সমিতির সভানেত্রী। বস্তুত এলাকার তৃণমূলের সংগঠন আতায়ুরেরই হাতে।
শুক্রবারই বেলডাঙার বাবরি চত্বর শুরু প্রচার, একসঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে ঝাঁপাবেন হুমায়ুন-ওয়েসি।
এমনিতে রেজিনগরের নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুর কোনও অভাব নেই। রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকা একটি কলেজের দাবি রয়েছে। শিল্প তালুকের জন্য জায়গা থাকলেও শিল্প নেই। ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে রেজিনগর শিল্পতালুক লেখা সাইন বোর্ড উঁকি মারছে। প্রবেশপথের লোহার দু’টি গেটে মরচে ধরেছে। সেই সঙ্গে চারিদিকে ঝোপ জঙ্গল। স্বপ্ন ছিল ১৮৩ একর জমির উপরে ওই শিল্পতালুকে ‘ই বাস’ কারখানা গড়ে উঠবে। একাধিক বহুজাতিক সংস্থার ওয়্যার হাউস হবে, স্থানীয়দের কর্মসংস্থান হবে। গত ১৬ বছরে সেখানে দু’একটি ছোটখাট ভবন ছাড়া শিল্পতালুকে কিছুই গড়ে ওঠেনি। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাপিয়ে ইস্যু ধর্মীয় ভাবাবেগ, এবং বাবরি মসজিদ। যা হুমায়ুনের (Humayun Kabir) পালে হাওয়া দিতে পারে। এসআইআরে অন্যান্য সংখ্যালঘু এলাকার মতো রেজিনগরেও বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে। সেটার ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষোভের সুফল হুমায়ুন তুলবেন নাকি তৃণমূল তুলবে, সেটা সময়ের গর্ভে।
এমনিতে রেজিনগরের নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুর কোনও অভাব নেই। রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকা একটি কলেজের দাবি রয়েছে। শিল্প তালুকের জন্য জায়গা থাকলেও শিল্প নেই। ন্তু এবার এসব কিছুকে ছাপিয়ে ইস্যু ধর্মীয় ভাবাবেগ, এবং বাবরি মসজিদ।
হুমায়ুনের (Humayun Kabir) অ্যাডভান্টেজ হল, তিনি রেজিনগরের বহু ভোটারকে জনে জনে চেনেন। আবার এটাও ঠিক দীর্ঘদিন তিনি রেজিনগরের স্থানীয় রাজনীতি করেননি। শেষবার রেজিনগরে তিনি বিধায়ক হন ২০১১ সালে কংগ্রেসের টিকিটে। মজার কথা হল, মুর্শিদাবাদে প্রথম কংগ্রেস বিধায়ক হিসাবে তৃণমূলে যোগ দেন তিনিই। সেসময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে মন্ত্রীও করেন। কিন্তু ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে ওই রেজিনগরেই তৎকালীন কংগ্রেস প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীর কাছে হেরে যান। সেই রবিউলও পরে তৃণমূলে যোগ দেন। ২০১৩ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন রেজিনগরের (Rejinagar) বিধায়ক। এর মধ্যে ২০১৬ সালে হুমায়ুন নিজে তাঁকে নির্দল হিসাবে টক্কর দেন। কিন্তু সেবারও ৫ হাজার ভোটে তৎকালীন কংগ্রেস নেতার কাছে হারতে হয়। একুশের ভোটের আগে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। কিন্তু নিজের এলাকায় টিকিট পাননি। তাঁকে পাঠানো হয় ভরতপুরে। মোদ্দা কথা, শেষ দেড় দশকে হুমায়ুন রেজিনগরে জেতেননি। তৃণমূলের স্থানীয় নেতারা বলছেন, "রেজিনগরের মানুষ ধর্মীয় রাজনীতি গ্রহণ করবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন, রাজ্যের বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা মানুষ যেভাবে পাচ্ছেন, সেটার সুফল আমরা পাবই।" শাসকদলের দাবি, তাঁদের সংগঠন এলাকায় এখনও শক্তিশালী। তাছাড়া প্রার্থী আতাউরও জনসংযোগে হুমায়ুনের চেয়ে কম যান না। এলাকায় তাঁরও প্রতিপত্তি রয়েছে।
তৃণমূল প্রার্থী আতায়ুর। ফাইল ছবি।
হুমায়ুন ঘনিষ্ঠ শিবির আবার বলছে অন্য কথা। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যে সংখ্যালঘু উন্নয়নের নামে স্রেফ 'আইওয়াশ' চলছে। তাছাড়া সরকারি প্রকল্পেও দুর্নীতি হচ্ছে। আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বক্তব্য, রেজিনগরের (Rejinagar) ভূমিপুত্র হুমায়ুন সাহেব এখন রাজ্যস্তরের নেতা। বাবরি মসজিদ করার সময় যেভাবে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়েছে, তাতে ব্যথিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সেই সহানুভূতির স্রোত ভোটবাক্সে এসে পড়বে। তাছাড়া আসাদউদ্দিন ওয়েইসির মতো বড় নেতা হুমায়ুনের পাশে দাঁড়ানোয় সংখ্যালঘু ভোট তাঁর পক্ষে। যদিও তৃণমূলের পালটা যুক্তি, বাংলার মানুষ জানে ওয়েইসি শুধু ভোট কাটুয়া। বিজেপির সুবিধা হয়, এমন কিছুই সংখ্যালঘুরা করবেন না। এসব যুক্তি-পালটা যুক্তির মধ্যে বিজেপিও কিন্তু ফ্যাক্টর হতে পারে, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। ভুলে গেলে চলবে না যে, ৬৮ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে তৃণমূল-আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, কংগ্রেস টানাটানি করছে, অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ হিন্দু ভোট 'অরক্ষিত'। যার বেশিরভাগটাই গত ৩ নির্বাচনে পড়ে আসছে বিজেপির ভোটবাক্সে। এবারও যদি তেমন হয়, তাহলে হুমায়ুন এবং আতায়ুরের বিধায়ক হওয়ার স্বপ্নে ভাগীরথীর জলে ভেসে যেতে পারে। যদিও শাসক দল এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টি দুই শিবিরই সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের ভাষ্যে, 'বিজেপি এখানে ফ্যাক্টর নয়।'
