shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

হলদি নদীর পাড়ে ভোটযুদ্ধে ইস্যু পরিযায়ী শ্রমিক, হলদিয়ায় তৃণমূল-বিজেপির অঙ্ক গুলিয়ে দিতে পারে SIR!

তৃণমূল, বিজেপির পাশাপাশি সিপিএমও এখানে এবার ভালো ভোট পেতে পারে, মত রাজনৈতিক মহলের।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 06:55 PM Apr 06, 2026Updated: 07:54 PM Apr 06, 2026

একদিক দিয়ে বয়ে গিয়েছে রূপনারায়ণ নদী, অন্যদিকে হলদি। দুয়ের সঙ্গমস্থলে হলদিয়া। এখানে নদীবন্দর ঘিরে তৈরি হওয়া শিল্পাঞ্চলই এখানকার অর্থনৈতিক ভিত্তি। আর নদীর মতোই প্রবহমান হলদিয়ায় রাজনীতি। একটা সময় ছিল পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প ঘিরে গমগম করত পূর্ব মেদিনীপুরের এই এলাকা। দেশি, বিদেশ শিল্পপতিদের নিত্য আনাগোনা ছিল। কলকারখানায় শ্রমিক সমাগমের শেষ ছিল না। এমনকী শ্রমিক আন্দোলনেরও সাক্ষী এই হলদিয়া। একসময়ে হলদিয়া শিল্পাঞ্চলকে 'বাংলার গর্ব' হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠ। হলদি নদীতে সূর্যাস্তের রঙের মতোই এখন ম্লান সেই গরিমা। বরং শ্রমিকদের কর্ম সুরক্ষা বিঘ্নিত হতে হতে এখন হলদিয়া প্রবলভাবে থাবা বসিয়েছে পরিযায়ী শ্রমিক সমস্যা। ছাব্বিশে এই বিধানসভা কেন্দ্রের মূল নির্বাচনী ইস্যু হতে চলেছে এটাই। পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফিরিয়ে আনার ব্রত গেরুয়া শিবিরের। আর ঘাসফুল শিবিরের বক্তব্য, শ্রমিক বঞ্চনা সইব না। যে বাম আমলে ফুলেফেঁপে উঠেছিল হলদিয়া শিল্পাঞ্চল, সেই বামপ্রার্থী অবশ্য পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। তিনি জোর দিচ্ছেন শিক্ষা শেষে সামগ্রিক কর্মসংস্থানের উপর। সবমিলিয়ে ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটেও হটস্পট হলদিয়া।

Advertisement

সম্প্রতি বাংলার বাইরে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের শয়ে শয়ে অভিযোগ শুধু আর অভিযোগের স্তরে আটকে নেই। এনিয়ে সরগরম জাতীয় রাজনীতি। এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এটি এক বড় ইস্যু।

কেমন হতে চলেছে হলদিয়ার 'ব্যালট ব্যাটেল', তার আন্দাজ পাওয়ার আগে এলাকাটা একটু ঘুরে দেখা যাক। ২০১১ সালে কেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের জেরে পূর্ব মেদিনীপুরের সুতাহাটা কেন্দ্রটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। আত্মপ্রকাশ করে তফসিলি অধ্যুষিত হলদিয়া বিধানসভা কেন্দ্র। সুতাহাটা ব্লক ও হলদিয়া পৌরসভা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই কেন্দ্রটি। এখানকার মোট ভোটার কমবেশি ২ লক্ষ ৬৭ হাজার। তফসিলি ভোটার প্রায় ২৭ শতাংশ, সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটার ১৭ শতাংশ। এসআইআর শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, প্রায় ৮ হাজার জনের নাম বাদ পড়েছে। এখনও ৭৯৭৩ জনের নাম বিচারাধীন।

রাজনীতির অঙ্ক অনুযায়ী, সুতাহাটা ব্লকে পঞ্চায়েত সমিতির ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতে তৃণমূল, ৪টি আসন বিজেপির দখলে। এই ব্লকে রয়েছে ছ'টি গ্রাম পঞ্চায়েত। তার মধ্যে দুটিতে বিজেপি, চারটিতে তৃণমূল ক্ষমতায়। অর্থাৎ পঞ্চায়েত স্তরে তৃণমূলেরই হাতে। এদিকে, হলদিয়া পৌরসভায় শেষ নির্বাচন হয় ২০১৭ সালে। ২৯টি আসনের মধ্যে সবকটিতেই নিরঙ্কুশ জয় পায় তৃণমূল। বোর্ডের মেয়াদ শেষে আর পুর নির্বাচন হয়নি। ২০২২ সাল সেপ্টেম্বরের পর থেকে প্রশাসক হিসেবে হলদিয়া মহকুমা শাসক পৌরসভা পরিচালনা করে চলেছেন।

২০১১ সালে রাজ্যে বাম দূর্গ ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও হলদিয়ার হাওয়া ছিল বামমুখী। ২০১৬ সালে সিপিএমের তাপসী মণ্ডল তৃণমূলের মধুরিমা মণ্ডলকে হারিয়ে বিধায়ক হন। ২০২১ সালেও তৃণমূল প্রার্থী স্বপন নস্করকে পরাজিত করেন সেই তাপসীই, তবে সেবার গেরুয়া শিবিরের প্রার্থী হয়ে। ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারী যখন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তখন তাঁর অনুগামী হিসেবে যাঁরা দলবদল করেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন এককালে হলদিয়ার দাপুটে সিপিএম নেত্রী তাপসী মণ্ডল। ৫ বছর আবার তাঁর পরিচয় বদলে গিয়েছে। ২০২৬ সালে তাপসী মণ্ডল শাসকদল তৃণমূলের প্রার্থী।


এবার চোখ রাখা যাক বিধানসভা-লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফলের দিকে। ২০১১ সালে রাজ্যে বাম দূর্গ ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও হলদিয়ার হাওয়া ছিল বামমুখী। ২০১৬ সালে সিপিএমের তাপসী মণ্ডল তৃণমূলের মধুরিমা মণ্ডলকে হারিয়ে বিধায়ক হন। ২০২১ সালেও তৃণমূল প্রার্থী স্বপন নস্করকে পরাজিত করেন সেই তাপসীই, তবে সেবার গেরুয়া শিবিরের প্রার্থী হয়ে। ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারী যখন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তখন তাঁর অনুগামী হিসেবে যাঁরা দলবদল করেন, তাঁদেরই একজন ছিলেন এককালে হলদিয়ার দাপুটে সিপিএম নেত্রী তাপসী মণ্ডল। ৫ বছর আবার তাঁর পরিচয় বদলে গিয়েছে। ২০২৬ সালে তাপসী মণ্ডল শাসকদল তৃণমূলের প্রার্থী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) উন্নয়নের কথা প্রচার করে ভোট (West Bengal Assembly Election) চাইছেন। তাপসী মণ্ডলের মূল প্রতিপক্ষ একদা তাঁরই সহযোদ্ধা বিজেপির প্রদীপ বিজলি এবং সিপিএমের অশোককুমার মাইতি।

হলদিয়ার তৃণমূল প্রার্থী তাপসী মণ্ডল।

হলদিয়া বিধানসভা এলাকার মূল ইস্যু পরিযায়ী শ্রমিকের সমস্যা। বাম আমলে এখানে শ্রমিক আন্দোলন একটা সমস্যা ছিল। যার জেরে একের পর এক কারখানা লকআউট হতে থাকে। কাজ হারান হাজার হাজার শ্রমিক। পরবর্তী সময়ে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরও সেভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগ করলেও কর্মসংস্কৃতি বিশেষ ফেরেনি। ফলে ভাগ্যান্বেষণে হলদিয়া ছেড়ে বহু শ্রমিক পরিবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বাড়তে থাকে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা। সম্প্রতি বাংলার বাইরে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের শয়ে শয়ে অভিযোগ শুধু আর অভিযোগের স্তরে আটকে নেই। এনিয়ে সরগরম জাতীয় রাজনীতি। এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এটি এক বড় ইস্যু।

২০১৬ সালে সিপিএমের হয়ে তাপসী মণ্ডলের লড়াইয়ের সময় তাঁকে হাতভরে আশীর্বাদ করেছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন। তাঁদের বিপুল সমর্থন তৃণমূলের বাড়বাড়ন্তের সময়ও জয়লাভ করেছিলেন তাপসী। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর ঘনঘন দলবদলে এবারও মুসলিমরা তাঁকে কতটা সমর্থন দেবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। তাছাড়া এসআইআরের পর বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে অনেক মুসলিম। তাও প্রভাব ফেলবে তাপসীর ভোটব্যাঙ্কে।

এখন প্রশ্ন হল, এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে হলদিয়ায় ভোটের (West Bengal Assembly Election) হাওয়া নিজেদের পালে ঘোরাতে কোন শিবিরের অস্ত্র ঠিক কী? বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ বিজলির বক্তব্য, ''ভোটে জিতে আমাদের মূল কাজ হবে এখানকার পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফিরিয়ে আনা এবং এখানে তাঁদের যথাযথ কর্মসংস্থান করা। তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যে শিল্পের যা পরিস্থিতি, এই বেহাল দশা থেকে হলদিয়া শিল্পাঞ্চলকে বের করে এনে পুনরুজ্জীবিত করব আমরা। কেন্দ্রের বহু প্রকল্প আছে, যা রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে বাস্তবায়িত করা যাচ্ছে না। সেগুলো আমরা করতে চাই। এখানকার মানুষজন দেখছেন, কীভাবে প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের কাজের জন্য বাইরে গিয়ে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে। তাঁরা এর পুনরাবৃত্তি চাইবেন না। এছাড়া তরুণ প্রজন্মও এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সাক্ষী। তাই তাঁরাও বরাবর আমাদের সমর্থন দিচ্ছে। হলদিয়ায় বিজেপির জয় সময়ের অপেক্ষা।''

জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ বিজলি।

পরিযায়ীদের সমস্যা নিয়ে তৃণমূল প্রার্থীর স্ট্র্যাটেজি কী? তাপসী মণ্ডল বলছেন, ''শ্রমিকদের বঞ্চনা, ঠিকমতো মজুরি না দেওয়া এগুলো নিয়ে আমরা বরাবর সরব। পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের আলাদা শ্রমশ্রী প্রকল্প আছে। যাঁরা ফিরে আসছেন, সুফল পাচ্ছেন। যাঁরা বাইরে থাকতে চান না, তাঁরাও চলে এলে এখানে ভালো কাজ পাবেন। চতুর্থ তৃণমূল সরকার গঠন হওয়ার পর আরও বেশি বেশি সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা মিলবে। সেসব নিয়েই আমরা প্রচার করছি। এছাড়া এসআইআরে এখানে বহু নাম বাদ পড়েছে। অনেকের নাম বিচারাধীন। আমরা তাঁদের সাহায্য করছি আইনিভাবে। কোনও বৈধ ভোটারের নাম যাতে বাদ না পড়ে, তার জন্য আমরা সক্রিয়।''

তৃণমূল-বিজেপির বিরোধিতায় জোরকদমে প্রচার সিপিএম প্রার্থী অশোককুমার মাইতি।

সিপিএম প্রার্থী অশোককুমার মাইতির কথায়, ''আমাদের মূল লক্ষ্য, ছেলেমেয়েরা যাতে পড়াশোনা শেষে কাজ পায়। রাজ্যে এখন কর্মসংস্থানের খুবই অভাব। সেই পরিবেশ বদলাতে আমরা বরাবর লড়াই করছি। এছাড়া এখানকার শ্রমিক পরিবারগুলি দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়েছে। তাঁদের কথা ভেবে আমরা ঠিক করেছি, ক্ষমতায় এলে প্রথম ১০০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেব। পরবর্তী ২০০ ইউনিটের অর্ধেক দাম দিতে হবে। একদিকে তৃণমূলের মিথ্যাচার, অন্যদিকে মূল ইস্যু এড়িয়ে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, দুয়ের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই।''

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে সিপিএমের হয়ে তাপসী মণ্ডলের লড়াইয়ের সময় তাঁকে হাতভরে আশীর্বাদ করেছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন। তাঁদের বিপুল সমর্থন তৃণমূলের বাড়বাড়ন্তের সময়ও জয়লাভ করেছিলেন তাপসী। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর ঘনঘন দলবদলে এবারও মুসলিমরা তাঁকে কতটা সমর্থন দেবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। তাছাড়া এসআইআরের পর বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে অনেক মুসলিম। তাও প্রভাব ফেলবে তাপসীর ভোটব্যাঙ্কে। এহেন বিপক্ষকে নিয়ে বিজেপি প্রার্থী বলছেন, ''যেভাবে উনি এখানকার মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাতে হলদিয়ার মা-বোনেরা এই নির্বাচনে ওঁকে হলদি নদীতে ছুঁড়ে ফেলবে।'' তবে কি পাল্লা ভারী বিজেপির? নাহ, আগাম এমন সহজ-সরল পূর্বাভাসও দেওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই মনে করছেন, তৃণমূল প্রার্থী এবার তৃণমূলের সঙ্গে সঙ্গে বামভোটও নিজের ঝুলিতে ভরতে সফল হবেন। অথবা উলটোটাও হতে পারে। অর্থাৎ সিপিএম, বিজেপি ঘুরে তৃণমূলে এসে প্রার্থীপদ পাওয়া তাপসী মণ্ডল জনসমর্থন টানতে ব্যর্থ হবেন এবং তার সুফল লাভ করতে পারেন সিপিএম প্রার্থী। অর্থাৎ ফ্যাক্টর এখানে তাপসী মণ্ডলই। ২০২৬-এর ভোটে জিতে তিনি কি হ্যাটট্রিক করবেন নাকি হলদি নদীর পাড়ে ফের ফুটবে পদ্ম কিংবা উড়বে লাল পতাকা? এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে ৪ মে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement