shono
Advertisement
Barrackpore

বারাকপুরে 'রাজ' রাজত্বে খুশি জনতা, হিন্দুত্বের জিগির তুলে কতটা লড়াই দেবেন নবাগত কৌস্তভ?

'স্মার্ট সিটি'র স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তৃণমূল প্রার্থী রাজ, বিজেপির কাছে এ লড়াই কার্যত অসম! কী বলছেন বারাকপুরের বাসিন্দারা?
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 06:33 PM Apr 13, 2026Updated: 07:31 PM Apr 13, 2026

সিপাই বিদ্রোহের শহর বারাকপুর (Barrackpore)। মঙ্গল পাণ্ডে নিজে এখানে বসে ব্রিটিশ নিধনের ব্লুপ্রিন্ট ছকতেন। তাঁর সেই স্মৃতি এখনও সযত্নে সংরক্ষিত। ইতিহাসের জ্বলন্ত দিনগুলো পেরিয়ে এখন পুরোদস্তুর আধুনিকা সে। উপর-উপর একেবারে ঝাঁ চকচকে। 'স্মার্ট সিটি' থেকে আর মাত্র কয়েকধাপ দূরে। কিন্তু চর্মচক্ষে যা ধরা দেয়, সেটাই কি সমগ্র চিত্র? তেমনটা তো নয়। কলকাতা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরের বারাকপুরের গভীরে এখনও তাই কিছু কিছু ক্ষত রয়ে গিয়েছে। নির্বাচনী আবহে ফের সেসব উসকে ওঠে। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের (West Bengal Assembly Election) আবহেও তাই রাজ্যের অন্যতম হটস্পট বারাকপুর।

Advertisement

বারাকপুরের একটা অংশ ও পাশের এলাকা টিটাগড়ের বেশিরভাগই অবাঙালি। এর টিটাগড়ে মুসলিম ভোটার বেশি। তাঁরা বরাবর তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে। আর অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষজনের সমর্থন টানতে সক্ষম হয়েছে গেরুয়া শিবির। এছাড়া সময়ের দাবি মেনে বাম ও কংগ্রেসের পুরনো ভোটব্যাঙ্কে ধস নামলেও কিছুটা অটুট।

বারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটার ১ লক্ষ ৭৩ হাজার ৩৪৬। এর মধ্যে পুরুষ ৮৭ হাজার ৩২১ ও মহিলা ৮৬ হাজার ২৪জন। তবে এসআইআরের পর এই সংখ্যার কিছুটা হেরফের হয়েছে। বিচারাধীন প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ভোটারের মধ্যে ৭ হাজারের বেশি বৈধ ভোটার। তিন হাজারের সামান্য বেশি ভোটার ট্রাইব্যুনালের রায়ে আপাতত 'অযোগ্য'। তবে এসআইআরের প্রভাব এখানে খুব বেশি পড়েনি, এমনই শোনা যাচ্ছে বারাকপুরের অন্দরে।

এখানে মিশ্র জনবিন্যাস। বারাকপুরের (Barrackpore) একটা অংশ ও পাশের এলাকা টিটাগড়ের বেশিরভাগই অবাঙালি। এর টিটাগড়ে মুসলিম ভোটার বেশি। তাঁরা বরাবর তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে। আর অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষজনের সমর্থন টানতে সক্ষম হয়েছে গেরুয়া শিবির। এছাড়া সময়ের দাবি মেনে বাম ও কংগ্রেসের পুরনো ভোটব্যাঙ্কে ধস নামলেও কিছুটা অটুট। আর তাই ছাব্বিশের লড়াই এখানে জমজমাট। তৃণমূল-বিজেপির দ্বিমুখী লড়াইয়ের পাশাপাশি সিপিএম, কংগ্রেসও ভোট ময়দানে নিজেদের সীমিত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়েছে।

বাস্তবে বারাকপুরের ভোটযুদ্ধ শাসকপক্ষের কাছে সহজ। গত ৫ বছরে বহু কাজ করেছেন এখানকার জনপ্রতিনিধি। রাস্তা সংস্কার, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি থেকে শুরু করে স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন - অনেক কিছুই হয়েছে। তবে এখনও কিছু বাকি রয়েছে। এখানকার মূল সমস্যা কোনও কোনও জায়গায় বৃষ্টির জল জমা। তবে সেই কাজ যে সহজ নয়, তাও মেনে নিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী।

প্রচারের ফাঁকে ভোটারদের সঙ্গে সেলফি তৃণমূল প্রার্থী রাজ চক্রবর্তীর।

বাম জমানায় এই কেন্দ্র বরাবর লাল দুর্গ ছিল। ২০১১ সালে গোটা রাজ্যে সবুজ ঝড়ে অবশ্য লাল ফিকে হয়ে যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে বারাকপুর ছিনিয়ে নেন 'সজ্জন' শীলভদ্র দত্ত। ২০১৬ সালেও তিনিই ফের বিধায়ক হন। তবে বর্তমানে শীলভদ্রবাবু গেরুয়া শিবিরের সৈনিক। ২০২১ সালে বারাকপুরের বিজেপি প্রার্থীর হিসেবে লড়ে পরাজিত হয়েছেন তৃণমূলের তারকা প্রার্থী রাজ চক্রবর্তীর কাছে। ছাব্বিশে আবার এই কেন্দ্রে শাসকদলের সৈনিক সেই রাজ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা অবশ্য নতুন। যুযুধান প্রতিপক্ষ বিজেপির তরুণ নেতা কৌস্তভ বাগচী, যিনি কংগ্রেস ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যোগ দিয়ে এই প্রথম প্রার্থী হলেন। বারাকপুরের মাটিতে রাজের আরও দুই প্রতিপক্ষ সিপিএমের অধ্যাপক প্রার্থী সুমনরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা শম্ভু দাস।

কর্মসংস্থান ইস্যুতে জোর দিয়ে প্রচারে সিপিএম প্রার্থী অধ্যাপক সুমনরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক

বাস্তবে বারাকপুরের ভোটযুদ্ধ শাসকপক্ষের কাছে সহজ। গত ৫ বছরে বহু কাজ করেছেন এখানকার জনপ্রতিনিধি। বারাকপুর ও টিটাগড় - দুটি পুরসভাই শাসক শিবিরের দখলে থাকার সুবাদে রাস্তা সংস্কার, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি থেকে শুরু করে স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন - অনেক কাজ হয়েছে। তবে এখনও কিছু বাকি রয়েছে। এখানকার মূল সমস্যা কোনও কোনও জায়গায় বৃষ্টির জল জমা। তবে সেই কাজ যে সহজ নয়, তাও মেনে নিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী। তিনি জানাচ্ছেন, নিকাশি সমস্যার সমাধানে অবিরত কাজ চলবে। তবে এবার তৃণমূল প্রার্থী প্রচারে কিন্তু অন্য কৌশল নিয়েছেন।

মিছিল, মিটিং, ফ্লেক্স-ব্যানার, দেওয়াল লিখনের ভিড়ে আচমকাই অন্য সুর! বারাকপুরে ভোটের প্রচারে নতুন ‘কেমিস্ট্রি’ গড়ছেন তৃণমূলের তারকা প্রার্থী রাজ চক্রবর্তী। নিরাপত্তারক্ষীদের দূরে ঠেলে রাজ ভেঙেছেন জনতার সঙ্গে দূরত্বের দেওয়াল। প্রচারে বেরিয়ে তিনি হাঁটছেন, থামছেন, মিশছেন! তাঁর আশপাশে ভিড় জমছে শুধু প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি শুনতে নয়, তারকার সঙ্গে এক ফ্রেমে ধরা পড়তে চেয়েও। আট থেকে আশি সবার হাতেই ফোন, সবার চোখে একই উচ্ছ্বাস। কেউ ঠিকঠাক ফ্রেম ধরতে না পারলে রাজ নিজেই এগিয়ে নিচ্ছেন মোবাইল, অ্যাঙ্গেল ঠিক করছেন, তারপর 'ক্লিক'! যেন বাস্তবের ভিড়েই শ্যুটিং চলছে, আর প্রার্থী তো নিজেই পরিচালক। এই সহজাত মেলামেশাই তৈরি করছে আলাদা এক ‘হিউম্যান কানেক্ট’। একের পর এক সেলফি ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে। রাজের কথায়, “প্রথমবার যখন এখানে এসেছিলাম, তখন মানুষ রাজ চক্রবর্তীকে একজন পরিচালক হিসেবেই চিনত, সেই পরিচয়েই ছবি তুলত। আজ পরিস্থিতি বদলেছে, এখন তারা তাঁদের বিধায়কের পরিচয়ে ছবি তোলে। কিন্তু শুধু পরিচয় নয়, মানুষের পাশে থাকা, বিপদে এগিয়ে যাওয়া, এই বিশ্বাসটাই তৈরি হয়েছে। বারাকপুরের মানুষ সেটা জানে।”

দিনরাত ঘুরে ঘুরে জনসংযোগ বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচীর। ছবি: ফেসবুক

তৃণমূলের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে প্রচারে ঝাঁপিয়েছেন বিজেপির কৌস্তভ বাগচী। তিনি অবশ্য অবাঙালি এলাকাগুলিতে জনসংযোগে বেশি জোর দিচ্ছেন। সকাল থেকে রাত, দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা থেকে ছোট কর্মিসভা এবং জনসভার মাধ্যমে ভোটারদের সমর্থন টানতে মরিয়া। সেইসঙ্গে পদ্মশিবিরের নীতি মেনে হিন্দুত্বের প্রচারও করে চলেছেন কৌস্তভ। কিন্তু ভোটবাক্সে এসবের প্রতিফলন ঘটাতে সফল হবেন কি? সে বিষয়ে সংশয় থাকছে। প্রথমত বরাবর ছাত্র পরিষদ করা কৌস্তভকে স্থানীয় মানুষজন যেভাবে চিনে এসেছেন, তার সঙ্গে আজকের গেরুয়া পাগড়ি, উত্তরীয় পরা কৌস্তভের কোনও মিল নেই। শিবির বদল করলে বিশ্বাসযোগ্যতায় প্রভাব পড়া তো স্বাভাবিক। এছাড়া রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কুরুচিকর মন্তব্য থেকে শুরু করে একাধিক অপরাধমূলক মামলা রয়েছে কৌস্তভের বিরুদ্ধে। সেসব ছাপিয়ে উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বারাকপুর জেতা নিঃসন্দেহে গেরুয়া শিবিরের কাছে কঠিন লড়াই।

কংগ্রেস প্রার্থী শম্ভু দাস।

এদিকে, সিপিএম প্রার্থী অধ্যাপক মানুষ। স্থানীয় একটি কলেজে তিনি দীর্ঘদিন ধরে পড়ান ও বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর নিজের ইমেজে বেশ কিছুটা ভোট লালপার্টিতে টানতে সক্ষম হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়, ''বারবার এখানে সিপিএম হারছিল। তবে সুমনরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হওয়ার পর আবার তাদের জেতার আশা দেখছি।'' কংগ্রেস প্রার্থী শম্ভু দাস এলাকারই মানুষ এবং গোড়া থেকে হাত শিবিরের একনিষ্ঠ সৈনিক। তিনিও নিজের সীমিত জনভিত্তি নিয়ে প্রচার করে চলেছেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, সেই উত্তর তো মিলবে ৪ মে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement