shono
Advertisement
WB Assembly Election 2026

শিক্ষা দুর্নীতির 'শাপমোচন' হবে রত্নার হাতে? বেহালা পশ্চিমে দ্বিতীয় হওয়ার লড়াইয়ে সিপিএম

বেহালা পূর্ব থেকে নতুন কেন্দ্রে পরীক্ষা তৃণমূল প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের, জনপ্রিয় বিজেপি প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁ এবং সিপিএমের পরিচিত মুখ নীহার ভক্তও প্রচারে এগিয়ে।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 09:14 PM Apr 25, 2026Updated: 10:30 PM Apr 25, 2026

কলকাতার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে গেলে বেহালা। বঙ্গ রাজনীতিতে অবশ্য বেহালা বললে কিছুটা ভুল হয়। এখানে দুটি কেন্দ্র - বেহালা পূর্ব, বেহালা পশ্চিম। আর ছাব্বিশের নির্বাচনে (WB Assembly Election 2026) অন্যতম হটস্পট কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে বেহালা পশ্চিম। তার বিবিধ কারণ থাকলেও যে ইস্যু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল শিক্ষা দুর্নীতি। যে দুর্নীতিতে জড়িয়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে জেলবন্দি ছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তা নিয়ে তোলপাড় হয়ে উঠেছিল রাজ্য রাজনীতি। সেই জল যে কত দূর গড়িয়েছিল, প্রত্যেক পশ্চিমবঙ্গবাসী তা জানেন। এই দুর্নীতি ঘিরে যে পাঁক লেগেছিল বেহালা পশ্চিমের গায়ে, তা সাফ করার গুরুদায়িত্ব নিশ্চিতভাবে শাসক শিবিরের। সেই 'শাপমুক্তি' কি হবে? নাকি এই দুর্নীতিকে তুরুপের তাস করেই বেহালা পশ্চিমের দখল নিয়ে নেবে বিরোধী সিপিএম কিংবা বিজেপি? উত্তর খোঁজার চেষ্টায় এই প্রতিবেদন।

Advertisement

আগে যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ছিল বেহালা পশ্চিমের অংশটি। কলকাতার একেবারে লাগোয়া এই এলাকা। এর সঙ্গে বেহালা পূর্ব অংশের বিস্তর ফারাক। পরে, ২০০২ সালে সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর যাদবপুর থেকে আলাদা হয়ে আত্মপ্রকাশ করে বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রটি। কলকাতা পুরসভার ১১৮, ১১৯ এবং ১২৫, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০, ১৩১, ১৩২ - এই দশটি ওয়ার্ড বেহালা পশ্চিমের অন্তর্গত। এখানকার মোট ভোটার ২ লক্ষ ৬৪ হাজার ১৬২। পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৪৫২, মহিলা ভোটার ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৭০৬ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন চারজন। এসআইআরের পর ১১, ৯০৫ জনের নাম বাদ পড়েছে। এখানকার ভোটাররা মূলত অভিজাত, ধনী সম্প্রদায়ের। তাঁরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন।

বাম আমলে বেহালা ছিল সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে তৎকালীন বিরোধী দল তৃণমূল লাল দুর্গে ধস নামিয়েছিল। সেবার সিপিএম প্রার্থীকে পরাজিত করে বেহালা দখল করেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সেই থেকে টানা ৫ বার অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্রভাবে পার্থবাবুই ধরে রেখেছেন বেহালা পশ্চিমের গড়।

বাম আমলে বেহালা ছিল সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে তৎকালীন বিরোধী দল তৃণমূল লাল দুর্গে ধস নামিয়েছিল। সেবার সিপিএম প্রার্থীকে পরাজিত করে বেহালা দখল করেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। সেই থেকে টানা ৫ বার অর্থাৎ ২০২১ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্রভাবে পার্থবাবুই ধরে রেখেছেন বেহালা পশ্চিমের গড়। আর বেহালা পূর্বে ছিলেন প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। দুই সতীর্থ মিলেমিশে বেহালার অনেক সমস্যারই সমাধান করেছেন। বিশেষত জল জমা এবং শহরের এত কাছে হয়েও বেহালার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতিতে ঢের কাজ হয়েছে। এখানে পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিধায়ক থাকাকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি থেকে নিকাশি সমস্যার খানিকটা সমাধান হয়েছে। মেট্রোরেলের সম্প্রসারণে যাতায়াত এখন কিছুটা মসৃণ। নিয়মিত ম্যানহোল পরিষ্কার করা হয়। ফলে বৃষ্টির জল বিশেষ জমে না। তবে এই সমাধানের নেপথ্যে সেখানকার কাউন্সিলর রত্না চট্টোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য কাজ, যার জন্য অল্প বৃষ্টিতে জল জমে যাওয়ার সমস্যা থেকে মুক্ত বেহালাবাসী। কিন্তু শিক্ষা দুর্নীতিতে পার্থ জেলবন্দি হওয়ার পর থেকে বিধায়কের অনুপস্থিতিতে উন্নয়ন থমকে দীর্ঘদিন।

বেহালার বাসিন্দাদের হাসপাতাল বলতে একমাত্র ভরসার জায়গা বিদ্যাসাগর স্টেট জেনারেল হাসপাতাল। তাই অনেক সময় চিকিৎসার জন্য সংলগ্ন কলকাতার হাসপাতালগুলিতে ছুটতে হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে একটা ক্ষোভ রয়েছে বাসিন্দাদের। এছাড়া ইদানীং জলাজমি বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে। সেটা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিতে সরব ভোটাররা। ছাব্বিশের ভোটে শিক্ষা দুর্নীতির পাশাপাশি এসবও বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জোকা-তারাতলা মেট্রো সম্প্রসারণের ফলে যাতায়াত কিছুটা সুবিধা হয়েছে বেহালা পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রে।

ফলে এখনও এখানে বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গিয়েছে। বেহালার বাসিন্দাদের হাসপাতাল বলতে একমাত্র ভরসার জায়গা বিদ্যাসাগর স্টেট জেনারেল হাসপাতাল। তাই অনেক সময় চিকিৎসার জন্য সংলগ্ন কলকাতার হাসপাতালগুলিতে ছুটতে হচ্ছে। তাই স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে একটা ক্ষোভ রয়েছে বাসিন্দাদের। এছাড়া ইদানীং জলাজমি বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে। সেটা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিতে সরব ভোটাররা। ছাব্বিশের ভোটে শিক্ষা দুর্নীতির পাশাপাশি এসবও বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৩২ নং ওয়ার্ডের এক বাসিন্দার কথায়, ‘‘ডায়মন্ড হারবার রোডের পশ্চিমদিকের এই বিধানসভাটি ৫ বছর ধরেই বিধায়ক শূন্য। সামান্য বৃষ্টিতে একাধিক এলাকায় জল জমে যায়। বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা। বেগোরখাল লাগোয়া এলাকায় প্রায় ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে জল জমে থাকায় সমস্যায় ভুগতে হয় মানুষকে। এর জন্য লাগোয়া ১২৯ নম্বর ওয়ার্ডে গতবার ব্যাপকভাবে বেড়েছিল ডেঙ্গির প্রকোপ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিষেবা তথৈবচ।'' আরেক বাসিন্দার অভিযোগ, ‘‘এথখানকার কাউন্সিলরদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। গত ৫ বছরে ওয়ার্ডভিত্তিক একাধিক সমস্যা আছে। বিধায়কশূন্য হওয়ায় এখনও অনেক সমস্যার সমাধান হয়নি। এছাড়া তারাতলায় একের পর এক কারখানায় তালা ঝুলেছে।''

বেহালা পশ্চিমের তৃণমূল প্রার্থী পাশের কেন্দ্র বেহালা পূর্বের বিদায়ী বিধায়ক রত্না চট্টোপাধ্যায়। বিজেপির হয়ে ভোট ময়দানে যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি ইন্দ্রনীল খাঁ। একদা শক্তিশালী দুর্গ বামেদের প্রার্থী সিপিএমের জনপ্রিয় নেতা নীহার ভক্ত। তিনজন প্রার্থীর মধ্যে এবার কড়া টক্কর। রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জও। রত্না চট্টোপাধ্যায় এই আসনে নতুন। যদিও এর আগে কাউন্সিলর থাকাকালীন এই এলাকায় তাঁর নিবিড় জনসংযোগ ছিল, ঘরের মেয়ে তিনি। সেসময় প্রচুর কাজও করেছেন। স্থানীয়দের অনেক দাবি মিটিয়েছেন। এখনও প্রায় ঘরে ঘরে ঢুকে প্রচার চলছে রত্নাদেবীর। আসলে শিক্ষা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কেন্দ্রের ভাবমূর্তি ফের উজ্জ্বল করা তাঁর যে গুরুদায়িত্ব। তবে আত্মবিশ্বাসী রত্নাদেবী। বলছেন, ''আমাকে এবার নতুন জায়গায় প্রার্থী করা হয়েছে। তবে এখানে আমার দীর্ঘদিনের জনসংযোগ। মা (কস্তুরী দাস)-বাবার (দুলাল দাস) দৌলতে আমি ঘরের মেয়ে। কাউন্সিলর থাকতে এখানকার সবার সঙ্গে ভালো আলাপ ছিল। এখনও তাঁদের ঘরে ঘরে যাচ্ছি। যতটা সম্ভব বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছি তাঁদের দাবিদাওয়াগুলো, যাতে জেতার পর আমি সেগুলো দ্রুত পূরণ করে দিতে পারি।''

বেহালা পশ্চিমে নতুন পরীক্ষা তৃণমূল প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের। ছবি: ফেসবুক

অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁ বিশিষ্ট চিকিৎসক তথা ক্যানসার বিশেষজ্ঞ। বেহালা পশ্চিমে তিনি জনপ্রিয় এবং সংগঠন ধীরে ধীরে বাড়িয়েছেন নিজস্ব জনপ্রিয়তার জেরে। ফলে তিনিও প্রচারে একবিন্দু পিছিয়ে নেই। এমনকী প্রচারের শেষবেলায় তিনি বাধাপ্রাপ্ত হয়েও তা প্রতিরোধ করে এগিয়ে গিয়েছেন। এমনিতেই ইন্দ্রনীলবাবু দলের সমস্ত কর্মসূচিতে অত্যন্ত সক্রিয়, সারাবছর আন্দোলনে থাকেন। তাই জনতার মনে তার একটা প্রভাব থাকবেই। তাই জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাস তাঁরও কম নেই এতটুকুও। জনপ্রিয়তা আর সংগঠনের জোরে ছাব্বিশে তিনি বেহালা পশ্চিম দখল করবেন, বলছেন ইন্দ্রনীল।

বিজেপির চিকিৎসক প্রার্থী ইন্দ্রনীল খাঁ। ছবি: ফেসবুক

দীর্ঘদিনের সিপিএমের গড়ে ফের কাস্তে, হাতুড়িতে শান দিয়ে নেমে পড়েছেন দলের কর্মীরা। তৃণমূল, বিজেপির পাশাপাশি প্রচারে বেশ ঝড় তুলছেন সিপিএম প্রার্থী ও জনপ্রিয় নেতা নীহার ভক্ত। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে জনসংযোগের পাশাপাশি প্রচারে গুরুত্ব পাচ্ছে ছোট পথসভা। জেন জি-কে দেখা যাচ্ছে তাঁর প্রচারে। সেখানে ঝাঁজাল বক্তব্য রাখছেন প্রার্থী নিজে। তুলে ধরছেন বিকল্প বামপন্থার কথা। নীহারবাবুকে প্রার্থী ঘোষণা করার পর তাঁর হয়ে প্রচার সেরে এসেছিলেন সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা ও বামপন্থী সমর্থক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ও। মহম্মদ সেলিম-সহ সিপিএমের একাধিক নেতা ও বামমনস্ক সেলিব্রিটিরা সাধারণ মানুষের কাছে নীহারবাবুর হয়ে ভোট চাইছেন। কিন্তু তাঁদের সেই প্রার্থনা কি পূরণ হবে ভোটবাক্সে? এই উত্তর মিলবে ৪ মে।

প্রচারে ঝড় তুলছেন সিপিএম প্রার্থী নীহার ভক্ত। ছবি: ফেসবুক

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement