জব চার্নকের 'দ্য সিটি অফ জয়'। শংকরের 'চৌরঙ্গী'। সত্যজিৎ রায়ের 'মহানগর' কিংবা কবীর সুমনের 'নাগরিক ক্লান্তি'। এ শহরের নানা রূপ। এ শহরের ঐতিহ্য, আধুনিকতা আর বৈচিত্র্য শুধু দেশের কাছে নয়, গোটা বিশ্বের কাছে ঈর্ষণীয়। শিল্পের উত্থান, ৩৪ বছরের সাম্রাজ্য থেকে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী বাংলার রাজধানী। এ শহর যেমন দুর্গাপুজো, বড়দিন কিংবা ইদে রঙিন-প্রাণোবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনই ভোট উৎসবে হয়ে ওঠে যুক্তিবাদী, চিন্তাধর্মী। কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বসতি। ঝকঝকে শপিং মল থেকে চায়ের ঠেক, ঝড় ওঠে রাজনৈতিক আলোচনার। আর এবার সেই আলোচনায় ঘৃতাহুতি পড়েছে থিম সং, পালটা থিম সংয়ে। 'যে লড়ছে সবার ডাকে, সেই জিতবে বাংলা মাকে' বনাম 'পালটানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার'। এ শহরের ১১ কেন্দ্রের কোনওটিতেই এখনও পর্যন্ত গেরুয়া আবির ওড়েনি। প্রতিটি আসন তৃণমূলের দখলে। তবে এবার মোদি-শাহরা বাঙালি মন পেতে যেভাবে ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করছেন, তাতে কি খেলা ঘুরবে? এটাই এখন লাখ টাকার সওয়াল। শঙ্খ ঘোষের কবিতা ধার করে বলা যায়, 'পথগুলি সব দেদার খোলা/যার খুশি আয় বিরুদ্ধতায়।' শেষ হাসি হাসবে কে, জানা যাবে ৪ মে। তার আগে ঘুরে দেখা যাক ১১ কেন্দ্রের এবারের ছবিটা ঠিক কেমন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৮৪ সালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে উঠে আসা সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ রাজ্যের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। চতুর্থবার মসনদ দখলের লড়াইতে তিনি আজও সমান তেজস্বী। সেই মমতার দল তৃণমূলের দখলেই আজ কলকাতার প্রায় সব আসন। তবে এবার কলকাতায় বড় চমক দিয়ে ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। লড়াই তাঁর খোদ তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গে। অন্যদিকে কোথাও তাপস রায়, কোথাও প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়ালের মতো প্রার্থী লড়ছেন। প্রচারে নজর কাড়ছে বামেরাও। আফরিন শিল্পী, আইনজীবী শ্রীজীব বিশ্বাসের মতো প্রার্থীরা। লড়াই যে এবার টানটান, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। তবে রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে নিজেদের অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল শিবির। একনজরে বিধানসভা কেন্দ্রগুলির সমীকরণ-
ভবানীপুর:
বঙ্গভোটে এবার হাই ভোল্টেজ কেন্দ্র ভবানীপুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্রে এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ২০১১ সালে প্রথমবার এই কেন্দ্রে জিতেছিলেন সুব্রত বক্সী। পরে তিনি আসনটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে দিলে তিনি উপনির্বাচনে জিতে আসেন। ২০১৬-তে আবার এই কেন্দ্রে জেতেন মমতা। ২০২১-এ ভবানীপুর ছেড়ে নন্দীগ্রামে ভোটে লড়েন মমতা। কিন্তু নন্দীগ্রামে তাঁকে বেআইনিভাবে হারানোর অভিযোগ ওঠে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে। এই নিয়ে মামলা এখনও হাই কোর্টে বিচারাধীন।
ছাব্বিশে আবারও মমতা ফিরেছেন ভবানীপুরে। ভবানীপুর যেন একটুকরো ভারত। হিন্দু, মুসলিম, গুজরাটি, রাজস্থানি, শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। প্রচারেও একথা মনে করাচ্ছে তৃণমূল। কিন্তু এই কেন্দ্রে বড় চ্যালেঞ্জ এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া। রাজ্যের অন্যতম এই হেভিওয়েট কেন্দ্রে ৫১ হাজারেরও উপর নাম বাদ গিয়েছে। যা অনেক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। যদিও নেত্রীর জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা বলে দাবি তৃণমূলের। যদিও পালটা মমতাকে হারানোর হুঁশিয়ারি শুভেন্দু অধিকারীর। একেবারে মাটি কামড়ে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। স্থানীয়দের কথায়, এবার ভবানীপুরের লড়াই হাড্ডহাড্ডি হতে পারে।
বন্দর:
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট সেনাপতি ফিরহাদ হাকিমের দায়িত্ব এবার দু'টি। বন্দরের দায়িত্ব এবং তার থেকেও বেশি জরুরি মুখ্যমন্ত্রীর ভবানীপুর কেন্দ্র। কারণ বন্দর কেন্দ্রের পাশাপাশি ভবানীপুরের দায়িত্বও মমতা তাঁকেই দিয়েছেন। ৫১.৮০ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস এই কেন্দ্রে। উত্তরপ্রদেশ, বিহারের বিভিন্ন জেলা থেকে কলকাতা বন্দরে কাজ করতে আসা মানুষ পরবর্তীকালে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন। তবে আপাদমস্তক শহুরে ভোটার রয়েছে এই কেন্দ্রে। হুগলি নদী লাগোয়া এই কেন্দ্রে রয়েছে জাহাজ তৈরির কারখানা, ডক রোড এবং গুদামঘর।
একসময় কংগ্রেস আর বামেরা দফায় দফায় জিতত এই কেন্দ্র থেকে। ২০০৯-এ লোকসভা ভোটে এই এলাকায় লিড পায় তৃণমূল। তারপর ২০১১-তে তৃণমূলের দখলে চলে যায় এই কেন্দ্র। শেষবার ২০২১-এ ফিরহাদ হাকিম ১ লক্ষ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই এলাকা আর ফিরহাদের সঙ্গ ছাড়েনি।
চেতলায় প্রচারে কন্যাকে নিয়ে ফিরহাদ হাকিম। নিজস্ব চিত্র
গার্ডেনরিচ শিপিং এবং শিল্প-কারখানার পাশাপাশি মেটিয়াবুরুজের কাপড়ের বাজার বিখ্যাত। ঔপনিবেশিক যুগের স্থাপত্যও রয়েছে এই কেন্দ্রে। বন্দরের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জেরে এই অঞ্চল দ্রুত বেড়েছে। তবে নানা সমস্যাও রয়েছে। যানজট, অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা, সরু অপরিসর রাস্তা নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। সেই অভিযোগকে হাতিয়ার করে প্রচারে নেমেছেন বিজেপি প্রার্থী রাকেশ সিং। তবে এই কেন্দ্রে বিজেপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক।
বেলেঘাটা:
কলকাতার এই কেন্দ্রে এবার বড় চমক দিয়েছে তৃণমূল। প্রথমবার বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হয়েছেন কুণাল ঘোষ। চুটিয়ে প্রচারও করেছেন তিনি। এই কেন্দ্রে দীর্ঘদিন বিধায়ক ছিলেন পরেশ পাল। এবার টিকিট পাননি তিনি। জনসংযোগ ছিল তাঁর অন্যতম হাতিয়ার। তবে রাজনৈতিক মহল বলছে, হাওয়া বুঝেই এবার প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল।
কখনও গোষ্ঠী সংঘর্ষ, কখনও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে এই এলাকায়। বোমা, গুলি চলার অভিযোগও উঠেছে। সার্বিক সমস্যার কথাও সামনে এসেছে বারবার। বসতি উন্নয়ন, পানীয় জলের সমস্যা- এমন অনেক অভিযোগই সামনে এসেছে। এবার নতুন প্রার্থী দিয়ে সেই বেলেঘাটার চেহারাটা বদলে দেওয়ার বার্তা দিয়েছে তৃণমূল। প্রচারের শুরু থেকেই রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে, কুণাল ঘোষ অনেকটাই এগিয়ে। কুণালের বিরুদ্ধে লড়ছেন বিজেপি প্রার্থী পার্থ চৌধুরী। তবে তাঁকে ঘিরে যে বিক্ষোভের আগুন দেখা গিয়েছে বিজেপির অন্দরে, তা তৃণমূলকে এগিয়ে দিয়েছে বেশ খানিকটা। পার্থ চৌধুরীকে প্রার্থী হিসেবে মানতে না পেরে এলাকায় পড়েছে পোস্টার, বিক্ষোভ হয়েছে বিজেপির দপ্তরেও। এই কেন্দ্রে সিপিএমের প্রার্থী পারমিতা রায়।
মানিকতলা:
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীদের অন্যতম আখড়া ছিল মানিকতলা। নাম ছিল ‘মানিকতলা গুপ্ত সমিতি’। ঋষি অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বে চলত বিপ্লবী কার্যকলাপ। ব্রিটিশদের কুনজরে ছিল এই এলাকা। বাম-কংগ্রেস পার করে সেই মানিকতলা হয়ে ওঠে সাধন পাণ্ডের দুর্ভেদ্য দূর্গ। অপরাজেয় হয়ে ওঠেন তিনি। পরপর ৯ বার জেতেন সাধন পাণ্ডে। এখনও সেই কেন্দ্র আবর্তিত হচ্ছে পাণ্ডে পরিবারকে ঘিরেই। উপনির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন সাধনের স্ত্রী সুপ্তি। আর এবার প্রার্থী সাধনকন্যা শ্রেয়া। তাঁর দাবি, প্রার্থী হওয়ার অনেক আগে থেকেই এলাকার মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন, বহুতল থেকে বসতি সবটাই তাঁর নখদর্পণে।
মধ্য কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় সবরকম সুবিধা রয়েছে মানিকতলায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাণ্ডে পরিবারকে হারানোর শক্তি এখনও তৈরি হয়নি। তবে এবার বিজেপিও কঠিন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে শ্রেয়াকে। একসময় তৃণমূলের বিধায়ক পদে থাকা তাপস রায়কে প্রার্থী করা হয়েছে শ্রেয়ার বিরুদ্ধে। অভিজ্ঞতায়, বয়সে ছোট, বন্ধু সাধনের মেয়ের সঙ্গেই এবার তাঁর লড়াই।
বালিগঞ্জ:
শোনা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘলদের কাছ থেকে এই এলাকাটি ভাড়া নিয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, এটি খোলা গ্রামাঞ্চল থেকে বিশাল জমিদারিতে রূপান্তরিত হয়। আজ এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অভিজাত বাংলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অভিজাত এলাকা। ধনি, প্রভাবশালীদের আবাসস্থল।
২০০৬ থেকে এই কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে সুব্রত মুখোপাধ্যায় টানা চারবার জিতেছেন। ২০২২ সালে তৎকালীন মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর উপনির্বাচন হয়। সেবার তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন বিজেপির প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। তবে এখন বাবুল রাজ্য়সভার সাংসদ। এই কেন্দ্র থেকে লড়ছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তবে এই কেন্দ্রে বারবার নজর কাড়ে বামেদের প্রার্থী। গত নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই কেন্দ্রে উপনির্বাচনে সায়রা শাহ হালিমকে প্রার্থী করে সিপিএম। আর এবার এই কেন্দ্র চর্চায় সিপিএমের তরুণ প্রার্থী আফরিন শিল্পীর জন্য। তবে অভিজ্ঞতায় কয়েক গুণ এগিয়ে থাকা শোভনদেবকে আফরিন কোনওভাবেই চাপে ফেলতে পারবেন না। অন্যদিকে এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী ড. শতরূপা।
চৌরঙ্গী:
শিয়ালদহ, কোলে মার্কেট, বউবাজারের যানজট, বাজার, বেআইনি দোকানের সমস্যায় জেরবার মানুষ। অ্যাম্বুল্যান্স আটকে যায়। নিকাশি জল জমার সমস্যা দাীর্ঘদিনের। কোনও সুরাহা হয়নি। কংগ্রেস ও বিজেপির একযোগে অভিযোগ, তৃণমূলের কাউন্সিলররাই বিধায়ককে পান না। এবারও টিকিট পেয়েছেন বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের পুরনো কেন্দ্র চৌরঙ্গী। এক সময় তাঁর স্ত্রীও জিতেছিলেন। বিশেষ করে বাঙালি অধ্যুষিত পুরনো এলাকা লেবুতলা পার্ক, বউবাজার, শিয়ালদহে বর্তমানে বিজেপির বিহারের সংস্কৃতির বাড়বাড়ন্ত নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ওয়ার্ড রয়েছে ৪৪ ও ৬২। এই দুটি ওয়ার্ডে গুরুত্ব দিয়েছে কংগ্রেস। কেউ কেউ মনে করেন এই এলাকাই খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে চৌরঙ্গীর। সদ্য কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া সন্তোষ পাঠককে এই আসনে প্রার্থী করা হয়েছে।
এন্টালি:
এই এন্টালি থেকেই মাদার টেরেসা তাঁর মিশন শুরু করেছিলেন। ১৮ শতকে ব্রিটিশদের ডিহি পঞ্চান্নগ্রামের অংশ ছিল এটি। নামকরণ হয়েছে ‘হিন্টালি’ শব্দ থেকে। হেনরি ডিরোজিওর বাড়ি রয়েছে এখানে। শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত এন্টালি। এলাকার সমস্য়া অনেক।
পার্কিং, যানজটের সমস্যা রয়েছে বেশি।
এন্টালিতে ওড়িয়া ভাষাভাষীর মানুষ তো বটেই, একটা বড় অংশের মুসলিম, খ্রিস্টান, চিনা মানুষের বাস। শিয়ালদহ ও ধর্মতলার মাঝখানে এই এন্টালি এলাকায় রয়েছে এন্টালি মার্কেট, কনভেন্ট পার্ক। এজেসি বোস রোড এবং সিআইটি রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা গিয়েছে। রয়েছে অসংখ্য পুরনো বাড়ি। নতুন প্রার্থীকে ঘিরে সমস্যা সমাধানের আশা দেখছে এই কেন্দ্রের মানুষ। স্বর্ণকমল সাহার ছেলে সন্দীপন সাহাকে এবার প্রার্থী করেছে তৃণমূল। তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ বিজেপির প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল।
কাশীপুর-বেলগাছিয়া:
এই কেন্দ্র থেকে এবার তৃণমূল প্রার্থী অতীন ঘোষ। বিজেপির পুরনো নেতা রীতেশ তিওয়ারিকে প্রার্থী করেছে। বামেদের প্রার্থী রাজেন্দ্র গুপ্ত।
এটি কলকাতা পুরসভার ১ থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটে বামেদের পতনের পরেই এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোটের ভাগও বেড়েছে। ২০১৬ সালে সিপিএমের ভোট ছিল ৩২.৪০ শতাংশ, যা ২০২১ সালে কমে ১০.৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির ভোট ২০১১ সালে ৩.১২ শতাংশ ছিল, ২০২১ সালে ৩০.২৪ শতাংশ হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে তৃণমূল এগিয়ে। ২০১৯ সালে বিজেপি প্রথম এই আসনে সিপিএমকে ছাড়িয়ে যায়। মুসলিম ১৭.৩০ শতাংশ, তফসিলি জাতি ৪.৪৭ শতাংশ। কিন্তু এরপরেই এই কেন্দ্রে দাপট রয়েছে তৃণমূলের।
এই বিধানসভায় বড় ইস্যু হল- কাশীপুর এলাকায় গঙ্গার পাড় ভাঙছে। আতঙ্ক। বারবার সংস্কারের দাবি জানিয়ে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখেছিলেন অতীন, কিন্তু লাভ হয়নি। কাশীপুর রোডে বছরের পর বছর রয়েছে রেলের সিমেন্টের গুদাম। সিমেন্টের ধুলো থেকে দূষণ হয়। ফলে ওই পথে যাতায়াত কার্যত দুঃসাধ্য। এলাকা থাকে ধুলোয় ভরা। যা নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। অন্যদিকে ভালো ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের অভাব। যানজটের সমস্যা নিয়েও রয়েছে ক্ষোভ।
শ্যামপুকুর:
এসআইআরে প্রার্থী নিজেই ছিলেন ‘বিচারাধীন’। তিনবারের বিধায়ক, দু'বারের মন্ত্রী শশী পাঁজা এই কেন্দ্রের প্রার্থী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্রিগেড সভার দিন শশীকে লক্ষ্য করে আক্রমণ হয়। তাঁর বাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে শ্যামপুকুর। অন্যতম হাইভোল্টেজ এই কেন্দ্র।
এই কেন্দ্র নিয়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে সিপিএমের বিবাদ হয়েছে। এক সময় তাদের জেতা কেন্দ্র ছিল। ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হেমন্ত বসুর কেন্দ্র এই শ্যামপুকুর। অভিযোগ, যুক্তফ্রন্ট আমলে সিপিএমের 'হার্মাদ'দের হাতে খুন হন হেমন্তবাবু। সম্প্রতি সেই কেন্দ্রের আনাচে-কানাচে বিজেপির উত্থান চোখে পড়েছে। তৃণমূল নিয়ে চোরা ক্ষোভ শশী পাঁজার কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে বামেদের সংগঠন দুর্বল। উন্নয়নের লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে বিজেপি। ডেঙ্গু, জল জমার সমস্যা রয়েছে। রয়েছে পার্কিংয়ের মতো বড় সমস্যা।
জোড়াসাঁকো:
এক সময় কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি করেছেন বর্ষীয়ান নেতা বিজয় উপাধ্যায়। গত এক দশকের বেশি সময় কলকাতা পুরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তৃণমূলের কাউন্সিলর তিনি। এই ওয়ার্ড আবার শ্যামপুকুর বিধানসভার মধ্যে পড়ে। তবে তিনি জোড়াসাঁকোরই ভূমিপুত্র। আবার বিজেপি প্রার্থী বিজয় ওঝা পাঁচপুরুষ ধরে জোড়াসাঁকোরই বাসিন্দা। সেখানে লড়াই এবার টানটান।
আগে স্মিতা বক্সি এখানকার তৃণমূল বিধায়ক হলেও ২১-এ এখানে অবাঙালি প্রার্থী দেয় তৃণমূল। বিজেপির মীনাদেবী পুরোহিতকে হারান জোড়াফুলের বিবেক গুপ্তা। ২০২১ সালের নির্বাচনে ৫২,১২৩ ভোট পেয়ে বিজেপিকে ১২ হাজারের বেশি ভোটে হারান তিনি। লোকসভা নির্বাচনে ছবিটা বদলায়। তিনটি লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে তৃণমূল বিজেপির চেয়ে পিছিয়ে থেকেছে। ২০১৪ সালে সেই ব্যবধান ছিল ১৬,৪৮২। ২০১৯-এ তা কমে দাঁড়ায় ৩,৮৮২। কিন্তু ২০২৪ সালে তা আবার বেড়ে হয় ৭,৪০১।
যানজট, বেআইনি পার্কিং, পুরনো কলকাতার ট্রাফিক সমস্যা, নিকাশি জল জমার সমস্যা রয়েছে। ছোট ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এবারও বিজয় উপাধ্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী বিজয় ওঝা।
রাসবিহারী:
সম্প্রতি তৃণমূল প্রার্থীর বাড়ি ও অফিসে ইডি তল্লাশির ঘটনায় শিরোনামে আসে এই কেন্দ্র। কংগ্রেসের পুরনো গড় এই কেন্দ্রে তৃণমূল তৈরি হওয়ার পর থেকে জিতে এসেছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। পরে তাঁকে ভবানীপুরে ও ২০২১-এ খড়দায় পাঠানো হয়। সেই থেকে ওই কেন্দ্রের প্রার্থী এবং বিধায়ক দেবাশিস কুমার।
গড়িয়াহাট, দেশপ্রিয় পার্ক , রাসবিহারী অ্যাভিনিউ, সাদার্ন অ্যাভিনিউ, টালিগঞ্জ আর বালিগঞ্জের কিছু অংশ নিয়ে এই বিধানসভা। কলকাতার ভরকেন্দ্র দেশপ্রিয় পার্কের সব থেকে বড় দুর্গাকে কেন্দ্র করে কয়েক বছর আগেই চর্চায় উঠে আসে এই কেন্দ্র। ওই পুজো ছাড়াও এলাকার বর্ধিষ্ণু এলাকা, একদিকে কালীঘাট মন্দির, অন্যদিকে লেক কালীবাড়ি নিয়ে বহুল পরিচিত এই কেন্দ্রে। শাসকদলের অন্যতম গড় এটি। মজবুত সংগঠন। সেখানেই বিজেপি প্রার্থী দলের প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত। মনে করা হচ্ছে, এবার লড়াই হতে পারে হাড্ডহাড্ডি।
