ইরানকে ‘শিক্ষা দিতে’ অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। কিন্তু সেই অভিযান এখন পরিণত হয়েছে ‘ইকোনমিক ফিউরি’তে। গোলা-বারুদ আর নয়, এবার ইরানকে ভাতে মারতে এক প্রকার ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ শুরু করে দিলেন ট্রাম্প।
বুধবার আমেরিকা-ইরানের সংঘর্ষবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, ইরানের উপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে, যার লক্ষ্য দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়া। এসবের মাঝেই মুখ খুলেছেন মার্কিন ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট। কার্যত তিনি ফাঁস করে দিয়েছেন ট্রাম্পের ষড়যন্ত্র। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদবৃদ্ধির নেপথ্য কারণ ইরানের বন্দরগুলিতে নৌ-অবরোধ অব্যাহত রেখে খার্গ দ্বীপে তেল উৎপাদন বন্ধ করা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবার ইরানকে ভাতে মারতে চান। দেশটির আয়ের প্রধান উৎস তেল। সেখানেই তিনি আঘাত হানতে চান, যাতে ক্ষতি স্থায়ী হয়।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গত এক মাস ধরে বোমাবর্ষণের পরও প্রত্যাঘাত থেকে ইরানকে নিবৃত্ত করা যায়নি। উলটে গোটা মধ্যপ্রাচ্য উত্তাল করে তুলেছিল তেহরান। ইরান যেন আহত বাঘ। ট্রাম্প এখন ভালো করেই জানেন, শুধুমাত্র গোলা-বারুদে শায়েস্তা করা যাবে না ইরানকে। তেহরানকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে গেলে তার প্রাণ ভ্রমরায় আঘাত হানতে হবে। যেটা হল তেল। কারণ, ইরানের অর্থনীতির গোটাটাই নির্ভর করছে তেলের উপর। সুতরাং এখানে আঘাত হানলে তেহরানের কোমড় ভেঙে যাবে, যা মেরামত করা এই মুহূর্তে কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গত এক মাস ধরে বোমাবর্ষণের পরও প্রত্যাঘাত থেকে ইরানকে নিবৃত্ত করা যায়নি। উলটে গোটা মধ্যপ্রাচ্য উত্তাল করে তুলেছিল তেহরান। ইরান যেন আহত বাঘ। ট্রাম্প এখন ভালো করেই জানেন, শুধুমাত্র গোলা-বারুদে শায়েস্তা করা যাবে না ইরানকে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের এই ষড়যন্ত্র সম্ভবত ধরে ফেলেছে খামেনেইয়ের দেশ। সেই কারণেই তারা মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানকে বারবার অনুরোধ করছে, যাতে দ্বিতীয় দফার শান্তি বৈঠকের আগে ওয়াশিংটন এই অবরোধ তুলে নেয়।
অন্যদিকে, আমেরিকাও এবিষয়ে অবহিত যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে ফাটল রয়েছে।মঙ্গলবার এবিষয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ট্রাম্প। বলেন, “ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন দ্বিধাবিভক্ত। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের যোদ্ধা আহমদ ভাহিদি কূটনৈতিক খেলা খেলছেন।” তাঁর এই মন্তব্যের পরই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। তাহলে কি ইরানি সেনার মধ্যেই রয়েছেন কোনও ‘গদ্দার’? যিনি গোপনে আমেরিকাকে সাহায্য করছেন? বিষয়টি নিয়ে জোর জল্পনা চলছে। তবে এবিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিক্রয়া দেয়নি তেহরান।
হরমুজ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। তাই এটি ‘তৈল ধমনী’ নামেও পরিচিত। কিন্তু মার্কিন অবরোধের জেরে ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলির চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরে প্রবেশ এবং বেরোনো দুই দিকেই বাধা তৈরি হয়েছে। হরমুজে মার্কিন অবরোধ বেশিদিন স্থায়ী হলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে খার্গ দ্বীপে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই দ্বীপে তেল সংরক্ষণের জায়গা ফুরিয়ে আসবে। তখন বাধ্য হয়ে ইরানকে তেল উৎপাদন কমাতে বা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হতে পারে। এর ফলে দেশের মূল আয়ের উৎস বড়সড় ধাক্কা খাবে।
হরমুজ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। তাই এটি ‘তৈল ধমনী’ নামেও পরিচিত। কিন্তু মার্কিন অবরোধের জেরে ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলির চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরে প্রবেশ এবং বেরোনো দুই দিকেই বাধা তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসেন্ট সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি কোনও দেশ গোপনে ইরানকে তেল বাণিজ্যে সাহায্য করে, তাহলে তাদের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিয়েছে। আমেরিকার দাবি, অবরোধ শুরু হওয়ার পর গত এক সপ্তাহে অন্তত ২৭টি জাহাজকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি গালফ অফ ওমান এলাকায় ইরানের পতাকাবাহী দু’টি কার্গো জাহাজকেও আটক করেছে ওয়াশিংটন। সব মিলিয়ে সামরিক সংঘর্ষের বদলে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে ইরানকে কোণঠাসা করার কৌশল এখন পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করছে আমেরিকা। এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানে এখন প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। মজুতের প্রায় ৬০ শতাংশই ভরে গিয়েছে। আর ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো খালি রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন প্রায় ১৫ লক্ষ ব্যারেল তেল উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ইরান যতটা তেল উৎপাদন করছে, তার তুলনায় বিক্রি হচ্ছে অনেক কম।
তেল কূপ বন্ধ করা মোটেই সহজ নয়। উৎপাদন থামলে তেলের স্তরের চাপ কমে যায়, যার ফলে সেখানে জল ঢুকে পড়তে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তেল কূপ বন্ধ করা মোটেই সহজ নয়। উৎপাদন থামলে তেলের স্তরের চাপ কমে যায়, যার ফলে সেখানে জল ঢুকে পড়তে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও, ইরানে যে তেল উত্তোলিত হয়, তা ভারী ধরনের। এটির রূপ ঘন এবং আঠালো। দীর্ঘ সময় ধরে এই তেল স্থির অবস্থায় থাকলে তা জমাট বেঁধে কঠিন হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে তেল কূপের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। একবার যদি এই তেল কূপ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উৎপাদন পুনরায় শুরু করা অত্যন্ত কঠিন। লেগে যেতে পারে কয়েক বছর। তাছাড়া উৎপাদন ক্ষমতাও হ্রাস পায়। এর ফলে ইরান বছরে প্রায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
