বৃহস্পতিবার প্রয়াত হয়েছেন মারজানে সত্রপি (Marjane Satrapi)। কিন্তু প্রকৃত শিল্পীর মতোই মৃত্যুর পরেও তিনি 'জীবিত' রয়ে গিয়েছেন ইরানের আকাশে-বাতাসে। 'পার্সোপোলিস'-এর স্রষ্টা হিসেবে তিনি বিশ্ববন্দিত। কিন্তু নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে নির্ভীক এক কণ্ঠস্বরই তাঁর সামগ্রিক পরিচয়। সেই পরিচয় জাগতিক মৃত্যুতে মুছে যাওয়ার নয়। বরং তাঁর কাজ ও জীবন আগামিদিনেও ইরানের জনতাকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়ার শক্তি জোগাবে।
১৯৬৯ সালে ইরানের রাশতে শহরে তাঁর জন্ম। বাল্যাবস্থায় যে ইরানকে দেখেছিলেন সেটা বদলে যায় তাঁর দশ বছর বয়সেই। ১৯৭৯–এর বিপ্লবের পর তিনি দেখতে থাকেন কী করে তাঁর দেশটা ধর্মতান্ত্রিক ইসলামিক রাজতন্ত্রের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে! যার ফলে ১৯৯৪ সালে তিনি স্থায়ীভাবে ফ্রান্সে চলে যান। তখন তাঁর বয়স ২৫। মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই থেকেছেন তিনি। এবং নিজস্ব শিল্পভাষায় তুলে ধরেন 'ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি'র ছবি। লেখা হয় আত্মজৈবনিক গ্রাফিক নভেল 'পার্সেপলিস'। এই বই সারা পৃথিবীতে বন্দিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে লক্ষ লক্ষ কপি।
ঠিক কী ছিল বইটির বিশেষত্ব? আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের আমলে কাটানো কৈশোরের ছবি সেখানে এঁকেছেন সত্রপি। কীভাবে এক কিশোরীর চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে জন্মভূমি, সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নারীস্বাধীনতার খর্বায়নের এক বিশ্বস্ত দলিল 'পার্সেপলিস'। পরবর্তী সময়ে ফরাসি নির্মাতা ভিনসেন্ট পারোনোর সঙ্গে মিলে তিনি তৈরি করেন ওই কাহিনির এক অ্যানিমেটেড চিত্ররূপ। সাদা-কালো সেই অ্যানিমেশন ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কারে পুরস্কৃতও হয়। এরই পাশাপাশি সক্রিয় মানবাধিকার কর্মীও ছিলেন তিনি। ইরানের নারী ও বন্দিদের উপরে নিপীড়নের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার থেকেছেন। ২০২৫ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘লিজিয়ঁ দ’অনর’ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু সত্রপি তা নিতে রাজি হননি।
কীভাবে এক কিশোরীর চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে জন্মভূমি, সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নারীস্বাধীনতার খর্বায়নের এক বিশ্বস্ত দলিল 'পার্সেপলিস'। পরবর্তী সময়ে তিনি তৈরি করেন ওই কাহিনির এক অ্যানিমেটেড চিত্ররূপ।
২০২৫ সালেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর স্বামীর। এই মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তিনি। সেই বিষণ্ণতাই যেন ২০২৬-এ সত্রপিকে নিয়ে পাড়ি দিল না ফেরার দেশে। এই মুহূর্তে তাঁর স্বদেশ আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় দীর্ণ। মারা গিয়েছেন আয়াতোল্লা খামেনেই। আপাতত যুদ্ধবিরতি কোনওমতে টিকে থাকলেও যে কোনও মুহূর্তে ফের দাউদাউ জ্বলে উঠতে পারে ধ্বংসের আগুন। এমন এক সময়ে সত্রপি চলে গেলেন। রেখে গেলেন তাঁর শিল্পভাষা, প্রতিবাদের স্বর।
