ইরানের সভ্যতা (Iran) ৭ হাজার বছরের চেয়েও প্রাচীন। মেসোপটেমিয়া বা মিশরের উন্নত সভ্যতাও কালের গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকে গিয়েছে। আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে মঙ্গোল, বারে বারে বহির্শত্রুরা আক্রমণ করলেও সমস্ত হামলার মধ্যেও অবিচল ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক 'গোটা সভ্যতা' ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকির পর থেকেই এই বিষয়টি বারবার চর্চায় উঠে এসেছে। শেষপর্যন্ত বিষয়টা যুদ্ধবিরতির দিকে গড়িয়েছে। আর তারপর থেকেই ওয়াকিবহাল মহলে 'অপরাজেয়' ইরানি সভ্যতা হয়ে গিয়েছে আলোচনার চুম্বক। চর্চা চলছে, কোন জাদুতে আলেকজান্ডার থেকে ট্রাম্প, বারবার বহিরাগতদের সামলাতে পেরেছে ইরান?
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট: ৩৩৪ থেকে ৩৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে তৎকালীন পারস্য বা আজকের ইরান জয় করেছিলেন গ্রিসের 'দিগ্বিজয়ী' বীর! পারস্য সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুসকে পরাজিত করেন তিনি। পারস্যের রাজধানী পার্সিপোলিস দখল করার পর তিনি নাকি মত্ত অবস্থায় সেই শহরটির প্রাসাদগুলি পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও ইরান দাবি করে, আলেকজান্ডার যুদ্ধে জিতলেও আদপে তিনি পারস্যেরই একজন হয়ে ওঠেন। পারস্যের পোশাক ও রাজসভার রীতিনীতি গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এমনকী, গ্রিক ও পারস্যের বাসিন্দাদের মধ্যে গণবিবাহেরও আয়োজন করেন তিনি। ফার্সি সাহিত্যে তিনি 'সিকান্দার' নামে পরিচিত। তাছাড়া ইরান জয় করলেও সেখানে তাঁর শাসন খুব বেশিদিন টেকেনি। সামরিকভাবে জয়ী হলেও ইরানিদের সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদকে তিনি পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেননি।
চেঙ্গিস খান: একই কথা বলা যায় চেঙ্গিস খান সম্পর্কে। মঙ্গোলরা ইরান দখল করে দীর্ঘদিন সেখানে শাসন কায়েম রাখতে পেরেছিল। বুখারা, সমরকন্দ এবং নিশাপুরের মতো প্রধান শহরগুলো ধ্বংস করে দেয় তারা। অবশিষ্ট ইরান নাকি দখল করেছিলেন চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান। কিন্তু এতদিন শাসন করলেও ইরানের জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতিকে মুছে ফেলা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পারস্য শৈলীতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ থেকে সেখানকার পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা করা- মঙ্গোলরা ইরান দখল করলেও আসলে জয় করতে পারেনি। বরং নিজেরাই সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এমনই তীব্র সংক্রামক তেহরানের সাংস্কৃতিক গঠন।
ইরান জয় করলেও সেখানে আলেকজান্ডারের শাসন খুব বেশিদিন টেকেনি। সামরিকভাবে জয়ী হলেও ইরানিদের সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদকে তিনি পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেননি।
আসলে ইরানের ঐতিহাসিক শিকড় অনেক গভীর পর্যন্ত চারিয়ে গিয়েছে বহুদিন আগে থেকেই। এর ফলে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়েছে তাদের। যা হামলাকারীদের গিলে নিতে পারে! এমনকী রাজনৈতিক ভাবে পতন ঘটলেও সমাজ নিজের মতো করে অবকাঠামো তৈরি করে ফেলে। কিন্তু ঠিক কী কারণে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া যায়নি ইরানকে? এর নেপথ্যে রয়েছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। পাহাড় ও বিশাল ভূখণ্ডে ঘেরা এই অঞ্চলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব বরাবরই। এমনকী রাজধানীগুলির পতন ঘটলেও টিকে থাকত আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো। এহেন ইরানে এবার নজর ডোনাল্ড ট্রাম্পের। কিন্তু এবারও যাবতীয় শক্তি প্রয়োগ করেও তিনি সফল হতে পারেননি। ফলে শেষপর্যন্ত কার্যতই হার মানতে হচ্ছে তাঁকে। আর সাত হাজার বছর পেরিয়েও ইরান রয়ে গিয়েছে স্বাধীনই।
