মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে 'ফ্যাসিস্ট' আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়ছিল শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগকে। নিষেধাজ্ঞা জারি হয় লিগের একাধিক অঙ্গ সংগঠনের উপরও। যে কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামি লিগ। এর আগে ব্যাপক গণ অভ্যুথানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে জীবন বাঁচাতে দিল্লি গিয়ে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে কয়েকহাজার আওয়ামি লিগের নেতা-কর্মীরাও ভারতে ঠাঁই নেন। দু'বছর নির্বাসনে থাকার পর সম্প্রতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা করেছেন। আসছে ১৫ আগস্ট অর্থাৎ মুজিব হত্যার অভিশপ্ত দিনটিও। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস স্মরণে রেখে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া লিগের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা দেশজুড়ে নানা জায়গায় ঝটিকা মিছিল বের করছেন। রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে গ্রেপ্তারও হচ্ছেন মুজিব-হাসিনা অনুগামীরা।
রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ৫৩ জন নেতা–কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে ভাটারা থানার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ভবন থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। ভাটারা থানার বরাত দিয়ে ডিএমপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ আগস্ট শোকদিবস পালনের প্রস্তুতি সভা ও ঝটিকা মিছিল সফল করার উদ্দেশে নেতা-কর্মীরা সমবেত হয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বাবা-সহ তাঁর পরিবারের ১৮ জন কয়েকজন সেনা সদস্যের হাতে নিহত হয়েছিলেন। পুলিশের অভিযোগ, গত রাতে দলটির নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার ছবি-সহ প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিলেন। ভাটারা থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। ধৃতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানায় ডিএমপি। ঢাকা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো নিয়মিতভাবে নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করছে।
এদিকে, দেশের উত্তর জনপদ জেলা দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে শেখ হাসিনা ফাঁসির রায় প্রত্যাহারের দাবিতে মশালমিছিল ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে প্রাক্তন সংসদ সদস্য শিবলি সাদিক-সহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামি লিগ, যুবলিগ ও ছাত্রলিগের নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হয়েছে। নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে থানায় মামলাটি করেন। মামলায় ১১৪ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৭০-৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ, প্রাক্তন সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের নির্দেশে অন্য আসামিরা সেখানে সমবেত হন। তাঁরা সেখানে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় প্রত্যাহারের দাবিতে পশুকুড়াল, লোহার রড, সামুরাই, হকিস্টিক, বাঁশের লাঠি-সহ মশাল মিছিল করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। বিষয়টি পুলিশ জানতে পারে, রাত সোয়া ১০টার দিকে সেখানে অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মশাল মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় সেখান থেকে রাজ ইসলাম (২২) ও মাসুদ রানা (২১) নামের দু'জনকে আটক করে পুলিশ।
পদ্মা পাড়ের শরীয়তপুর সদর উপজেলার গঙ্গানগর বাজারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লিগের এক কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্বে শরীয়তপুরের গঙ্গানগর বাজারে মিছিল ও পথসভা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওই দুটি কর্মসূচিতে অন্তত ৫ শতাধিক স্থানীয় আওয়ামি লিগের নেতা–কর্মী ও সমর্থক উপস্থিত হন। পরে পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে দুজনকে আটক করে। ওই কর্মসূচিতে স্লোগান দিয়ে বক্তব্য পেশ করছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লিগের ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিথুন ঢালি। তিনি শরীয়তপুর সদর উপজেলার গঙ্গানগর এলাকার বাসিন্দা। ওই মিছিল ও সমাবেশের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিষিদ্ধ ছাত্রলিগ ও আওয়ামি লিগের আত্মগোপনে থাকা নেতারা ওই ভিডিও তাঁদের ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। মিছিলে অংশ নেওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের নেতা–কর্মী ও সমর্থকরা জানান, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন উপলক্ষে ওই মিছিল ও সংক্ষিপ্ত পথসভা আয়োজন করা হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের হাতে জাতীয় পতাকা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের দলীয় পতাকা ছিল। মিছিল শেষে বাজারের শেষ প্রান্তে গিয়ে গঙ্গানগর-কাজিরহাট সড়কে সংক্ষিপ্ত পথসভা করা হয়। এ সময় বক্তব্য রাখছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লিগের ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিথুন ঢালি। একটি ব্যানারে লেখা ছিল - ‘১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস ২০২৬, শোক থেকে শক্তি, শোক থেকে জাগরণ’। ব্যানারটিতে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সব সদস্যের ছবি ছিল।
শরীয়তপুর–১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল হোসেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামি লিগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম ও জাজিরা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোবারক আলি শিকদারের ছবি ছিল।মিছিলটি শেষ করে বাজারের শেষ প্রান্তে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে পথসভা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামি লিগ সরকারের পতনের পর শরীয়তপুরের আওয়ামি লিগ ও ছাত্রলিগের নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। তবে বিভিন্ন সময় ঝটিকা মিছিল, অল্প সময়ের জন্য সড়ক অবরোধ, শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার বিভিন্ন দিবসে এবং দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে সংগঠনটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা কর্মকাণ্ড পালন করেছে। এসব কর্মসূচির পরে পুলিশ বিভিন্ন থানায় দলটির নেতাদের নামে মামলা করেছে।
এছাড়া বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের নেতা কর্মীরা মশালমিছিল করেছেন। মিছিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল রাতেই এ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ৩ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের। ভিডিওতে দেখা যায়, ৫০-৬০ জন নেতা-কর্মী মশাল হাতে নিয়ে মিছিল করছেন। এ সময় নানা ধরনের স্লোগান দিতে দেখা যায় তাঁদের। মিছিল শেষে বক্তব্য দেন কয়েকজন। জানা গিয়েছে, বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের চুনতিবাজার এলাকায় মিছিলটি হয়েছে।
