shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

১৯৭৮ ও ইন্দিরা গান্ধীর কলকাতা

১৯৭৮ সালের ১৮ মার্চ ব্রিগেডে হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক জনসভা। রাজ্য কংগ্রেসের তাবড় তাবড় সব নেতা ইন্দিরা গান্ধীর পাশে নেই। তবুও ব্রিগেডেই জনসভা হল। ইন্দিরা গান্ধীর জিত। বঙ্গভোটের ইতিহাসের আজ দশম পর্ব।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 08:34 PM Apr 09, 2026Updated: 08:35 PM Apr 09, 2026

নির্বাচন আর রাজনৈতিক ক্ষমতা পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রী কখনও ক্ষমতাসীন, কখনও ক্ষমতাচ্যুত।‌ কিন্তু ইতিহাস বলে, ক্ষমতাচ্যুত হয়েও আবার মানুষের সমর্থন নিয়ে ভারতের বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী সিংহাসনে আরূঢ় হয়েছেন। ১৯৭৮ সালটা কংগ্রেস রাজনীতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেবার জানুয়ারিতে দল ভাগ হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে তিন রাজ্যের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীই যে কংগ্রেস দলের মূলস্রোতের নেত্রী, তা প্রমাণিত হয়েছিল।‌ সে বছর মার্চ মাসে তিনি এলেন কলকাতায়।

Advertisement

ইন্দিরা গান্ধীর ব্রিগেডে সেটাই ছিল নাকি সবচেয়ে বড় মিটিং।‌ অন্তত দেবপ্রসাদ রায়ের স্মৃতিচারণে সেই কথাই উঠে এল। তিনি বলেন, অন্তত সেইসময় ১৫ লক্ষ মানুষ এসেছিল। পুলিশ রিপোর্টেও তাই বলা হয়েছিল।‌


কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরের ড্রাইভারকে ডাকলাম - ওহে চালক, আমাকে নিয়ে চলো সেদিনের কলকাতায়। একদম পার্ক স্ট্রিটে পার্ক হোটেলের সামনে এসে গাড়ি থামল। আমি চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কেন? তিনি বললেন, এই পার্ক হোটেলেও ইন্দিরা গান্ধীর স্মৃতি আছে।

কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা দেবপ্রসাদ রায়ের ‘ডুয়ার্স থেকে দিল্লি’ বইটিতে সেদিনের ইন্দিরা গান্ধীর কাহিনি জানা যায়। ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন রেলমন্ত্রী বরকত গণি খান চৌধুরী। ’৭৮ সালে যখন দলভাগ হয়েছে তখন ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন কলকাতায়। ১৮ মার্চ ব্রিগেডে হয়েছিল তাঁর ঐতিহাসিক জনসভা। রাজ্য কংগ্রেসের তাবড় তাবড় সব নেতা ইন্দিরা গান্ধীর পাশে নেই। তবুও ব্রিগেডেই জনসভা হল। ইন্দিরা গান্ধীর জিত। সভার প্রস্তুতি তখন চলছে জোরকদমে। সেদিন দেবপ্রসাদ রায় অর্থাৎ ডি.পি.রায় যাকে আমরা 'মিঠুদা' বলি, সেই মিঠুদা ছিলেন ব্রিগেডে জনসভা সংগঠিত করার এক অন্যতম কারিগর। মিঠুদার হাতে দায়িত্ব পড়ল, বাইক বাহিনী নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে এয়ারপোর্ট থেকে তিনি যেখানে উঠবেন সেখানে তাঁকে নিয়ে আসতে হবে। তখন বাইক জোগাড় করাই ছিল একটা কঠিন কাজ! মাথা গুণে দেখা গেল, ২০০টা বাইক জোগাড় হয়েছে মাত্র। কিন্তু কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে? কোন হোটেলে?

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দেবপ্রসাদ রায়। ফাইল ছবি


বরকত গণি খান চৌধুরী ইন্দিরা গান্ধীর কলকাতা আসার আগে মিঠুদাকে ডেকে বলেছিলেন, ব্রিগেড করতে হবে, চাঁদা তুলতে হবে। তারপর তো ক্ষমতাচ্যুত ইন্দিরা কংগ্রেসের জন্য লোকে টাকাপয়সাও কম দিচ্ছে। মিঠুদা বরকত গণি খানকে বলেছিলেন, পার্ক হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার রাম সিংকে আমি চিনি। ওর কাছে একবার যাবেন? উনি চাঁদা দিতে পারেন। মিঠুদা রাম সিংয়ের কাছে বরকত গণি খান চৌধুরীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। বরকতদা বলেছিলেন, ‘‘Beggars can't be choosers.’’ তাই চল, যাই। রাম সিংয়ের কাছে যাওয়া হল। উনি দশ হাজার টাকা দিতে রাজি হলেন। তাও একটা শর্তে।


শর্তটি হল, ইন্দিরাজিকে পার্ক হোটেলে থাকতে হবে। নিমরাজি হয়েও বরকতদা চলে এলেন। এদিকে যেদিন ইন্দিরা গান্ধী কলকাতা এলেন তখনও স্পষ্ট নয় যে, ইন্দিরা গান্ধী কোথায় থাকবেন? ইন্দিরা গান্ধী আসার তিনদিন আগে সেই ম্যানেজার রাম সিং দেবপ্রসাদ রায়কে ফোন করে জানিয়েছিলেন, ''আপনার সভাপতিকে বলে দিন, ইন্দিরা গান্ধী পার্ক হোটেলেই উঠছেন।'' আসলে লন্ডনে তৎকালীন পার্ক হোটেলের মালিক জিৎ পালের বড়দা লন্ডনের লর্ডসভার সদস্য স্বরাজ পলকে জানানো হয়েছিল। তিনি সরাসরি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলে পার্ক হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আর বুঝিয়েছিলেন, দুঃসময়েও‌ ‘এপিজে গোষ্ঠী’ ইন্দিরা গান্ধীর পাশে আছেন।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ফাইল ছবি

’৮০ সালের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনজন সভাপতি হয়েছিলেন। যথাক্রমে রামচন্দ্র রথ, গুলাম নবি আজাদ আর তারিক আনোয়ার। ’৭৭ সালের লোকসভা ভোটে রামচন্দ্র রথ একমাত্র লোকসভা ভোটে জিতে এসেছিলেন। আর তাই তাঁকে সভাপতি করা হয়েছিল বলে সকলে মনে করেন।

রাজনীতিতে ক্ষমতাহীনদের পাশেও কিছু মানুষ, কিছু ব্যবসায়ী, কিছু বুদ্ধিজীবী থাকেন। আর ইন্দিরা গান্ধীর মতে, সাধারণ মানুষও থাকে। তাদের সবসময় দেখা যায় না। ইন্দিরা গান্ধী ব্রিগেডে সভা করতে এলেন। তিনি পার্ক হোটেলে থাকলেন। সেই বাইক বাহিনী নিয়ে মিঠুদা ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে পার্ক হোটেলে পৌঁছলেন।‌ ইন্দিরা গান্ধীর ব্রিগেডে সেটাই ছিল নাকি সবচেয়ে বড় মিটিং।‌ অন্তত দেবপ্রসাদ রায়ের স্মৃতিচারণে সেই কথাই উঠে এল। তিনি বলেন, অন্তত সেইসময় ১৫ লক্ষ মানুষ এসেছিল। পুলিশ রিপোর্টেও তাই বলা হয়েছিল।‌ সন্ধ্যায় নিজাম প্যালেসের প্রেস কনফারেন্স হল। সেই প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিক সুমিত মিত্র প্রশ্ন করেছিলেন, ‘madam, you are drawing large crowd again. Do we presume that you are nearing power?’ ইন্দিরাজির জবাব, ‘Power has many concepts. To some people power is to be in the remaining office. To me, power means remaining in the masses, That way I am always powerful’.

কী দারুণ জবাব!
সাংবাদিক সুমিত মিত্রের আরেকটি প্রশ্ন ছিল, ‘‘Don't you think that Rajnarayan is colourful personality?’’
ইন্দিরা গান্ধী জবাব দিয়েছিলেন, ‘That depends on colour of your vision’.

সেই সময় ভোটের সময় দারুণ দারুণ স্লোগান বের করা হত। ১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে ইন্দিরা গান্ধী জিতলেন চিকমাগালুর থেকে। কলকাতায় মিছিল বের হল। মিছিলে স্লোগান ছিল– 'ভুল করেছে রায়বেরেলি/চিকমাগালুর করেনি।' দেখিয়ে দিল মোরারজিকে ইন্দিরাজি মরেনি। কিন্তু মোরারজি ভুল করলেন। ইন্দিরাজিকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করে।‌ ফলে ’৭৭-র জুলাইয়ে বিহারের বেলচি থেকে যে স্লোগান উঠেছিল, 'আধি রোটি খায়েঙ্গে/ইন্দিরাজিকো লায়েঙ্গে।' সেটাই সারা দেশে স্লোগানে পরিণত হল। এমনকী, কলকাতার রাজপথেও মুহুর্মুহু সেই স্লোগান শোনা গিয়েছিল।

১৯৮০ সালে ভোট। কংগ্রেস (ই)-র স্লোগান ছিল, ‘Elect a government that works.’ একটা বাক্য। কিন্তু সাংঘাতিক বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩৫৪-জন সদস্য নিয়ে ইন্দিরা ফিরে এলেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অবশ্য জয়ী ছিলেন মাত্র চারজন।‌ অশোক সেন, আনন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়, বরকত গণি খান চৌধুরী এবং গোলাম ইয়াজদানি। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির তখন প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল। ’৬৭-র ছাত্র-যুব আন্দোলন তখন ওঁর নেতৃত্বেই হয়েছিল। তাঁর ফলশ্রুতিতে বাংলায় আবার কংগ্রেস ঘুরেও দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সঞ্জয় গান্ধী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে পছন্দ করতেন না। সঞ্জয় গান্ধী তাঁকে খুব অসম্মান জনকভাবে পদ থেকে অপসারিত করেছিলেন, সে তথ্য কারওরই তো অজানা নয়। সর্বভারতীয় যুব-কংগ্রসের সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে অম্বিকা সোনিকে সভানেত্রী করা হয়েছিল।

সর্বভারতীয় যুব-কংগ্রসের সভাপতির পদ থেকে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে সরিয়ে অম্বিকা সোনিকে সভানেত্রী করা হয়েছিল। ফাইল ছবি


কেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে সরিয়ে অম্বিকা সোনিকে সভানেত্রী করেছিলেন, তা নিয়ে সেদিন অনেক বিতর্ক, অনেক গুজব, অনেক কথা ও কাহিনি দিল্লির ক্ষমতার অলিন্দে ঘুরে বেরিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনও দিনই সঞ্জয় গান্ধীকে ‘কাছের মানুষ’ বলে মনে করেননি। বরং যেন‌ কংগ্রেসের বহু নেতার কাছে সঞ্জয় গান্ধী ছিলেন খলনায়ক। পশ্চিমবঙ্গে সঞ্জয় গান্ধীর অন্যতম ভারপ্রাপ্ত নেতা ছিলেন কমলনাথ। কমলনাথ মধ্যপ্রদেশের নেতা হলেও বাংলায় কথা বলতেন। কলকাতায় তাঁর ব্যবসা ছিল। কলকাতায় ছিল ঘনিষ্ঠতা অনেকের সঙ্গে। তার মধ্যে একজন সম্পাদকও ছিলেন।‌ স্বাভাবিকভাবেই ছাত্র পরিষদ বা যুব কংগ্রেসের নবীন সদস্যদের সঞ্জয় গান্ধীর প্রতি বিদ্বেষের মনোভাব তৈরি হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর জ্যোতি বসুর সরকার বেশ কিছু কমিশন গঠন করে। তাঁর মধ্যে ছিল ‘শর্মা কমিশন’। জরুরি অবস্থার সময় কমলনাথ কীভাবে ক্ষমতার বহির্ভূত শক্তি ব্যবহার করে সরকারি সিদ্ধান্তে প্রভাব ঘটিয়েছেন, তা নিয়ে তদন্ত পর্যন্ত হয়েছিল।

’৮০ সালের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনজন সভাপতি হয়েছিলেন। যথাক্রমে রামচন্দ্র রথ, গুলাম নবি আজাদ আর তারিক আনোয়ার। ’৭৭ সালের লোকসভা ভোটে রামচন্দ্র রথ একমাত্র লোকসভা ভোটে জিতে এসেছিলেন। আর তাই তাঁকে সভাপতি করা হয়েছিল বলে সকলে মনে করেন। দেবপ্রসাদ রায় বলেন, ‘‘রামচন্দ্র রথ সঞ্জয় অনুগামীদের ভিতর এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ ছিলেন।‌ জ্ঞানের গভীরতায়, ভাষার উপর দখলে ওঁর পাশাপাশি কেউ ছিল বলে মনে হয়নি। কিন্তু আলস্যে তুলনাহীন, চরিত্রে লাগামহীন।‌ আর সবকিছুকে অকপটে মেনে নেওয়ার সাহস আমার দীর্ঘ দিল্লি জীবনে আর কারওর ভিতরে দেখিনি। আবার ওঁর আলস্যের জন্যেই আমরা যাঁরা পদাধিকারী ছিলাম, কাজ করার অনেক সুযোগ পেয়েছিলাম।’’

যাই হোক, ফিরে আসি নির্বাচনের গল্পে।

আজ আমরা যে রাজনীতির মধ্যে আছি, সেখানে সর্বশক্তিমান দল বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের করুণ হাল‌ দেখছি। যা হয়ে গেল বহু বছর।‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরিসরটি নিজের বুদ্ধি এবং পরিশ্রম দিয়ে দখল করে নিয়েছেন। কিন্তু সেই ’৮০ সালের নির্বাচনের সময় পশ্চিমবঙ্গেও কংগ্রেস ছিল একটা বড় শক্তি। যুব কংগ্রেস মানে কী সাংঘাতিক ব্যাপার! সাংবাদিকতা করতে এসে আমিও দেখেছি। রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি পদে সোমেন মিত্রকে দেখেছি। তারপরে এসেছেন প্রদ্যুৎ গুহ। প্রদ্যুৎ গুহের পর যুব কংগ্রেসের কী অবস্থা হয়েছে, তাও দেখেছি। যাই হোক, রাজনীতিতে কীরকম ভাবে উত্থান হয়, কীরকম ভাবে পতন হয় তার কাহিনি ভবিষ্যতে আরও শোনাব।

আপাতত অমর সিংয়ের কাহিনি বলতে খুব ইচ্ছে করছে। রামচন্দ্র রথ তখন যুব কংগ্রেসের সভাপতি।‌ দেবপ্রসাদ রায় রামচন্দ্র রথের খুব ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। রামচন্দ্র রথ কলকাতায় এলেন। বিমানবন্দরে যুব কংগ্রেসের নেতারা তাঁকে রিসিভ করতে গেলেন।‌ সেখানে যাঁরা তাঁকে স্বাগত জানাতে এসেছেন, সেখানে হঠাৎ দেখা গেল, অমর সিং নামে এক যুবক মালা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। দেবপ্রসাদ রায় কলকাতা বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন থেকে নিয়ে আসতে। কেননা তিনি প্রকৃত পদাধিকারী এবং রামচন্দ্র রথের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সাথী। দেবপ্রসাদ রায় বলছেন, অমর সিং তখন রাজনীতিতে আসেনেইনি। বড়বাজারে ওঁর বাবার আট ফুট বাই দশ ফুটের একটা গামছার দোকান ছিল। অশোক সিং বলে একজন মাসলম্যানের স্কুটারের পিছনে ঘুরত আর নেতাদের খিদমত করত। মিঠুদা (দেবপ্রসাদ রায়) বলছেন, ‘‘ওঁকে এয়ারপোর্টে দেখে আমার মটকা গরম হয়ে গেল। আমি বললাম, অমর তুই এখানে? ও বলল, রামচন্দ্র রথ সাহেবকে নিতে এসেছি।‌আমি বললাম, তুই কে? তোর সঙ্গে রথ কেন যাবেন? আমার সঙ্গে যাবেন।‌ ও বলল, আমি ফোনে রাজি করিয়েছি।’’

অমর সিং পরবর্তী সময়ে দেশের দুঁদে রাজনৈতিক নেতা। ফাইল ছবি

তখন অমর সিংয়ের হাত থেকে মালাটা কেড়ে নিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের করে দিয়েছিলেন দেবপ্রসাদ রায়। কিন্তু ওই ঘটনার পর অমর সিং আরও পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এলো।‌ অমর সিংয়ের সেই বড়বাজারের এক ব্লক কংগ্রেস সভাপতি থেকে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন, কতখানি প্রভাবশালী হয়েছিলেন, সেটা তো আমরা প্রত্যেকে জানি। কমলনাথের বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট কমিশন গঠন করেছে।‌ সেই ‘শর্মা কমিশনের’ অফিস যুব কংগ্রেস কর্মীরা ভাঙচুর করল।‌ যুব কংগ্রেস জিন্দাবাদ, কমলনাথ জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে লাগল। কিন্তু ওই কর্মসূচি আসলে যুব কংগ্রেসের ছিল না। কমলনাথ তখন কংগ্রেসের কেউ-ই নন।

আসলে এই হল ভোটের রাজনীতি। ভোটের রাজনীতিতে কে টিকিট পাবে, আর কে টিকিট পাবে না, সেটা অনেক সময় সেদিনও কংগ্রেসের হাইকমান্ডের খেয়ালখুশি মতো হত। যেমন মুখ্যমন্ত্রী বদল করতেন ইন্দিরা গান্ধী। রাজীব গান্ধীও প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বদল করেছেন নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে। কলকাতা পুরসভায় ফোটোফিনিশ ফলাফল দিয়েছিলেন, তৎকালীন রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। কিন্তু তারপরেও তাঁকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল।‌


যদিও পরবর্তীকালে কমলনাথ নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে সাতবার লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে কংগ্রেস রাজনীতিতে আবার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু ’৮০ সালে ভোটের আগে কমলনাথ গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কেননা সঞ্জয় গান্ধীর তাঁর প্রতি সমর্থন ছিল। কলকাতার নির্বাচনের সমস্ত কিছু কমলনাথই দেখতেন। মাইক্রো লেভেল ইনফরমেশন পর্যন্ত গ্রহণ করা হত কমলনাথের কাছ থেকে। ’৮০ সালের নির্বাচনে আবদুস সাত্তার মুর্শিদাবাদ থেকে দাঁড়িয়েছিলেন।‌ প্রণববাবু দাঁড়িয়েছিলেন বোলপুর থেকে। ইন্দিরা গান্ধী প্রণববাবুকে বলেছিলেন, ‘‘তুমি ভোটে দাঁড়িও না। তুমি হেরে যাবে। মুর্শিদাবাদে সাত্তার জিতবে। আর তুমি বোলপুরে হারবে।’’ কিন্তু প্রণববাবু জেদ ধরেছিলেন।‌ প্রথম থেকেই বোলপুরের আসনটি কঠিন ছিল। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে প্রণববাবুর চিফ ইলেকশন এজেন্টকে সামান্য একটা অজুহাতে বোলপুরের লোকসভা কেন্দ্রের কোনও একটা থানায় ওখানকার ডিএসপি তুষার ভট্টাচার্য আটকে রেখে দিয়েছিলেন। প্রণববাবু রাগে অগ্নিশর্মা!‌ এত ক্ষমতা তুষার ভট্টাচার্যের!

তিনি থানায় চলে যান এবং তুষার ভট্টাচার্যকে গিয়ে বলেন, এখনও সময় আছে, আমার এজেন্টকে ছেড়ে দিন।‌ আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন ইন্দিরাজি কিন্তু ক্ষমতায় আসছেন। আর আমি হারলেও মন্ত্রী, আর জিতলেও মন্ত্রী। তুষারবাবু নম্রভাবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে এজেন্টকে পরের দিন বেল দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। প্রণববাবুকে শান্ত করার চেষ্টা করে গেলেন। আর বললেন, ‘‘আপনার এজেন্টের ভূমিকা ভালো ছিল, এটা আপনাকে মানতে হবে।’’ প্রণববাবু পরে তাই মানতে বাধ্য হয়ে চলে এলেন। কিন্তু প্রণববাবুর এই আত্মবিশ্বাস কী প্রচণ্ড ছিল যে, তিনি পুলিশের ডিএসপিকে বলেছিলেন, তিনি মন্ত্রী হচ্ছেনই। হারলেও হচ্ছেন, জিতলেও হচ্ছেন। তিনি দেশের অর্থমন্ত্রী বলেন এবং গুজরাট থেকে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত করে নিয়ে এসেছিলেন।

আসলে এই হল ভোটের রাজনীতি। ভোটের রাজনীতিতে কে টিকিট পাবে, আর কে টিকিট পাবে না, সেটা অনেক সময় সেদিনও কংগ্রেসের হাইকমান্ডের খেয়ালখুশি মতো হত। যেমন মুখ্যমন্ত্রী বদল করতেন ইন্দিরা গান্ধী। রাজীব গান্ধীও প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বদল করেছেন নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে। কলকাতা পুরসভায় ফোটোফিনিশ ফলাফল দিয়েছিলেন, তৎকালীন রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। কিন্তু তারপরেও তাঁকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল।‌ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি হলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। কেননা তিনি রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন।‌ প্রিয়বাবু প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হলেন ১৯৮৪ সালে।‌ তখন তিনি হাওড়ার লোকসভার সাংসদ হলেন।‌ তারপর তিনি বাণিজ্য মন্ত্রকের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হলেন। রাজনীতি সাপ-লুডোর খেলা।‌

প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি একবার আমাকে বলেছিলেন, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বদল! ওটা তো হাইকমান্ডের ইচ্ছে।‌ হাইকমান্ডের যদি মনে হয় যে অনেকদিন একটা বেঁটে সভাপতি পশ্চিমবঙ্গে কাজ করছে, তবে আমাদের এবার একটা লম্বা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি দরকার।‌ তাহলে লম্বা সভাপতি আসবে।‌ সেটাই হয়েছিল। প্রিয়বাবুর পর রাজীব গান্ধী সিদ্ধার্থশংকর রায়কে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি করেছিলেন।‌ভোটের রাজনীতিতে এই সাপলুডোর খেলাকে আরও চিত্তাকর্ষক করে তোলে। এরপরের পর্বে সেই সাপলুডো খেলার কাহিনি আপনাদের আরও শোনাব।‌

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement