স্টাফ রিপোর্টার, শিলিগুড়ি: সবুজ কার্পেটে লুকিয়ে যমদূত! পর্যটকদের ভ্রমণে তাই 'লাল সতর্কতা'! ভরা পর্যটন মরশুমে শ্বাপদের আতঙ্কে একরকম সিঁটিয়ে পড়েছে তরাই-ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ এলাকা। এবার পর্যটকরা এখানে এসে মনের খেয়ালে চা বাগিচার শ্যামলীমায় ভেসে বেড়াবেন। নিজস্বিতে মজে থাকবেন, তার উপায় নেই। সতর্ক বনদপ্তর থেকে রিসর্ট কর্তৃপক্ষ এবং ট্যুর অপারেটর মহল। রীতিমতো 'লাল সতর্কতা জারি করে পর্যটকদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, গাইড ছাড়া কেউ যেন চা বাগানের পথে পা না-রাখেন। যেমন, লাটাগুড়ি রিসর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক দিব্যেন্দু দে বলেন, "বনদপ্তরের পাশাপাশি আমরাও পর্যটকদের বলছি ইচ্ছামতো কেউ যেন চা বাগানে না যান। কারণ, চিতাবাঘ গভীর জঙ্গলে নয়। জঙ্গল লাগোয়া চা বাগানে থাকে।"
রিসর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তরফে টোটো চালকদেরও সতর্ক করা হয়েছে। কারণ, তরাই-ডুয়ার্সে পৌঁছে পর্যটকরা টোটো ভাড়া করে আশপাশের চা-বাগান, বনবস্তিতে বেড়াতে যান। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের ডিএফও পারভিন কাশোয়ান বলেন, "জঙ্গল ও সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পর্যটকদের বলা হচ্ছে গাইড ছাড়া কেউ যেন চা বাগান দেখতে না যায়।" বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার আগে ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বানাররহাট থানার কলাবাড়ি বান্দ লাইনের এক বাড়ির উঠোন থেকে পাঁচ বছরের শিশুকে কন্যাকে তুলে নিয়ে যায় চিতাবাঘ।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে উত্তরের চা বাগান লাগোয়া বিভিন্ন এলাকায় চিতাবাঘের হামলায় ১৮ জন জখম হয়েছেন। ডিসেম্বরে চারটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা গিয়েছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে লোকালয়ে চিতাবাঘের হামলার ঘটনা বেড়ে যায়। গত বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরের তরাই ও ডুয়ার্সে ন'টি চিতাবাঘের হামলা হয়। মৃত্যু হয় ৩ জনের। জখম হন অন্তত ১৫ জন। গত বছরের ১ জানুয়ারি আলিপুরদুয়ার জেলার দলগাঁও চা বাগানে এক মহিলাকে খুবলে খায় চিতাবাঘ। পরদিন ১০ জানুয়ারি বীরপাড়া চা বাগানের ফ্যাক্টরি লাইনে এক কিশোরীর খুবলে খাওয়া দেহ উদ্ধার হয়। নৃশংস হামলার কারণ অনুসন্ধানে নেমে চোখ কপালে ওঠে পরিবেশ কর্মীদের।
জানা যায়, কুকুর ছানার লোভে চিতাবাঘ চা বাগানে ঘাপটি মেরেছিল। শিকার শেষ হতে মানুষকে টার্গেট করেছে। এর আগে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর চিতাবাঘের হামলা ঘটে জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের দক্ষিণ কাঠুলিয়া এলাকায়। জখম হন এক ব্যক্তি। শুধু চা বাগান লাগোয়া এলাকা কেন? গত ১১ নভেম্বর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ নম্বর গেটের কাছে একটি বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসা চিতাবাঘের হামলায় ২ জন জখম হয়। এগারো দিন পর ২২ নভেম্বর মাথাভাঙ্গার বৈরাগীরহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের সাতগাছি গ্রামে লোকালয়ে চিতাবাঘ ঢুকে চিতাবাঘ হামলা চালায়। এক তরুণী সহ ৭ জন জখম হয়।
বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ডুয়ার্স ছাড়াও তরাইয়ের নকশালবাড়ি ও পার্শ্ববর্তী বাগডোগরা এলাকায় চিতাবাঘের আনাগোনা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে চা বাগানগুলোতে শ্রমিকরা কাজে যেতে ভয় পাচ্ছেন। শিলিগুড়ি মহকুমার নিউ চামটা, মোহরগাঁও, সুকনা, মারাপুর, তরাই, মেরিভিউ, ফুলবাড়ি, অটল, আজমাবাদ, বিনয়নগর, বাগডোগরা, শিমুলবাড়ি, পানিঘাটা, লংভিউ, পানিঘাটা, নকশালবাড়ি, গাঙ্গুরাম, ত্রিহানা, হাঁসখাওয়া, মিনি ও রাঙাপানি চা-বাগান সংলগ্ন এলাকায় চিতাবাঘের উপদ্রব বেড়েছে। এদিকে পর্যটকরা শীতের মরশুমে ডুয়ার্স ও তরাইয়ে বেড়াতে এলে চা বাগানে সময় কাটাতে পছন্দ করেন। কিন্তু সেখানেই যে বিপদ লুকিয়ে রয়েছে।
