কোটি কোটি টাকার সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে অবশেষে পুলিশের জালে বীরভূমের চালকল সিন্ডিকেটের ‘অঘোষিত সম্রাট’ তথা আহমদপুর অঞ্চল তৃণমূলের সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য। বুধবার দুপুরে আহমদপুরের একটি রাইস মিলে অতর্কিতে হানা দেয় পুলিশ। সেখানেই হাতেনাতে রাজীব এবং তাঁর ব্যবসায়িক পার্টনার চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃত দু’জনেরই বাড়ি আহমদপুর এলাকায়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের বিরুদ্ধে সাঁইথিয়া থানায় দু’টি এবং পুরুলিয়ার পারা থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছিল খাদ্য দপ্তর। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন সরকারি চাল খোলা বাজারে পাচার ও আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ধৃতদের বিরুদ্ধে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩৪ কোটি টাকা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের বিরুদ্ধে সাঁইথিয়া থানায় দু’টি এবং পুরুলিয়ার পারা থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছিল খাদ্য দপ্তর। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন সরকারি চাল খোলা বাজারে পাচার ও আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ধৃতদের বিরুদ্ধে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩৪ কোটি টাকা।
একদা জেলা রাজনীতির দাপুটে নেতা অনুব্রত মণ্ডলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ‘ছায়াসঙ্গী’ ছিলেন এই রাজীব। ২০২২ সালে গরু পাচার মামলায় অনুব্রত গ্রেপ্তার হওয়ার পরেই সিবিআই ও ইডির নজরে আসেন এই রাইস মিল মালিক। কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যায়, অনুব্রতর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য এক লপ্তে ৬৬ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন এই রাজীবই! এমনকি এই আর্থিক লেনদেনের উৎস খুঁজতে দিল্লির সদর দপ্তরে তাঁকে টানা তিন দিন ম্যারাথন জেরা করেছিলেন তদন্তকারীরা। অনুব্রতর একাধিক বেনামি চালকলের দেখভাল ও আর্থিক লেনদেনও পিছন থেকে রাজীবই নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, রাজীবের স্ত্রী আহমদপুর পঞ্চায়েতের প্রধান এবং একটি স্কুলের শিক্ষিকা হলেও, ক্ষমতা ও দুর্নীতির দাপটে পঞ্চায়েত ভবন বা স্কুল, কোথাওই তাঁর দেখা মেলে না।
একদা জেলা রাজনীতির দাপুটে নেতা অনুব্রত মণ্ডলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ‘ছায়াসঙ্গী’ ছিলেন এই রাজীব। ২০২২ সালে গরু পাচার মামলায় অনুব্রত গ্রেপ্তার হওয়ার পরেই সিবিআই ও ইডির নজরে আসেন এই রাইস মিল মালিক। কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের সূত্রে জানা যায়, অনুব্রতর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য এক লপ্তে ৬৬ লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন এই রাজীবই!
খাদ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী কৃষকদের থেকে কেনা ধান থেকে চাল তৈরি করার জন্য রাজীবদের চালকলে পাঠানো হয়েছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সেই ধান থেকে চাল তৈরি করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি গুদামে ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু সাঁইথিয়ার দু’টি ও পুরুলিয়ার একটি মিল মিলিয়ে প্রায় ১১হাজার ৩০০ মেট্রিক টন চাল সরকারি খাতায় আর জমা পড়েনি। এরপর খাদ্য দপ্তরের একটি উচ্চপর্যায়ের টিম আচমকা মিলগুলি পরিদর্শন করে। আর তাতেই উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য! তদন্তকারীরা দেখতে পান, খাতায়-কলমে যে বিপুল পরিমাণ চাল মজুত থাকার কথা, বাস্তবে সেখানে শুধুই শূন্যতা। দফায় দফায় নোটিস পাঠানো সত্ত্বেও রাজীবরা কোনও সদুত্তর দিতে না পারায়, অবশেষে খাদ্য দপ্তরের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের কঠোর ধারায় মামলা রুজু করে এই দু’জনকে গ্রেপ্তার করে।
আহমদপুরের অলিগলিতে কান পাতলে আজও শোনা যায় রাজীবের লটারির টিকিট বিক্রেতা থেকে কোটি কোটি টাকার রাইস মিলের মালিক হওয়ার সেই রূপকথার মতো উত্থানের কাহিনী। বীরভূমের রাজনৈতিক মহলে এটি ‘ওপেন সিক্রেট’ যে, রাজীবের কলকারখানায় আসলে খাটত জেলার এক শীর্ষ প্রভাবশালী নেতার টাকা। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই কেলেঙ্কারি কয়েক বছর আগের হলেও এতদিন কেন চুপ ছিল খাদ্য দপ্তর? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিকের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, ‘এতদিন মাথার ওপর প্রভাবশালী নেতার হাত ও রাজনৈতিক দাপট থাকায় চাইলেও কোনও পদক্ষেপ করা যায়নি।’
বীরভূমের রাজনৈতিক মহলে এটি ‘ওপেন সিক্রেট’ যে, রাজীবের কলকারখানায় আসলে খাটত জেলার এক শীর্ষ প্রভাবশালী নেতার টাকা। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই কেলেঙ্কারি কয়েক বছর আগের হলেও এতদিন কেন চুপ ছিল খাদ্য দপ্তর?
তদন্তে উঠে এসেছে দুর্নীতির এক অভিনব কৌশল। জেলায় এক সময় এমন লক্ষাধিক ভুয়ো রেশন কার্ড ছিল, যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। সেই ‘ফাঁপা’ কার্ডগুলোর বিপরীতে প্রতি মাসে যে বিপুল পরিমাণ চাল বরাদ্দ হতো, তা সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে ঘুরতি পথে চলে আসত রাজীবের মিলেই। পরে সেই চালই নতুন বস্তায় ভরে ফের সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। খাদ্য দপ্তরের একাংশের সঙ্গে ‘গোপন সেটিং’ এবং জেলার সিংহভাগ ধান ক্রয় কেন্দ্র বা সিপিসি নিজের কুক্ষিগত করে এই বিপুল ঘপলা চালানো হতো। রাজনৈতিক পেশীশক্তি খাটিয়ে অন্য মিলগুলিকে কোণঠাসা করে রাখা এই ‘রাইস মিল সম্রাটের’ পতনে জেলা রাজনীতিতে এখন তীব্র আলোড়ন।
