নন্দন দত্ত, সিউড়ি: অস্ফুটে দুটি শব্দ। মনে পড়ল শুধু মহম্মদবাজার আর দাদা নীলু খানের নাম। সেই দুটি শব্দের সূত্র ধরে রমজানের আগেই খুশির ইদের উপহার এল ঘরে। হারিয়ে যাওয়া মেয়ে ঘরে ফিরল কুড়ি বছর পর। মেয়েকে ফিরে পাওয়ায় অভাবের সংসারে যেন খুশির চাঁদ নেমে এসেছে মহম্মদবাজারে লোহাবাজারে।
[বাগনানে খুন তৃণমূল নেতা, অভিযোগের তির বিজেপির দিকে]
স্মৃতির বিস্মৃতি। তাতেই জীবনের খেই হারিয়ে গিয়েছে কুড়ি বছরের। জীবন চলত ভিক্ষার ক্ষুন্নিবৃত্তিতে। তখনই একদিন অস্ফুটে দুটি শব্দ ভেসে আসে মনের কিনারায়। সেটাই সূত্র। তাকেই আঁকড়ে ধরে রবিবার মহম্মদবাজারের টগরি বিবি বাড়ি ফিরলেন। জীবনের কুড়ি বছর পার হওয়া মেয়েকে উঠানে দেখে জড়িয়ে ধরলেন মা বিলানুর বিবি। বড় মেয়ে টগরি বিবিকে বিয়ে দিয়েছিলেন রানিগঞ্জে। কিছুদিন পর টগরি বিবি উত্তরপ্রদেশের বরোদার নরিন্দর নামে এক ব্যক্তির ঘরনি হয়ে ওঠেন। তারপর থেকেই কেমন যেন খাপছাড়া হয়ে যায় মহম্মদবাজারের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র। কেউ কেউ বলছিলেন মেয়েকে পাচারকারীরা বিক্রি করে দিয়েছে। কিন্তু এক সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সুখেই ছিলেন।
তখনই দুর্ঘটনায় মোড় ঘুরে গেল টগরির। ১৯৯৯ সালের ২ এপ্রিল। স্বামী সন্তান ননদ ও তাদের সন্তানদের নিয়ে ট্রেনে সফরে বেরিয়েছিলেন তাঁরা। গাইসালে ঘটে গেল ভয়াবহ ট্রেন দূর্ঘটনা। মৃত্যু হয় ২৬৮ জনের। একমাত্র জীবিত ছিলেন টগরী। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই হয়নি তাঁর। স্বামীর মৃত্যুর দায় তাঁর উপর চাপিয়ে বিতাড়িত করা হয় তাঁকে। শ্বশুরবাড়ি থেকে কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর সোনা দানা, টাকা পয়সা এমনকী মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকুও। চুরির মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে তাঁকে তিন বছর জেল খাটানো হয়। ক্রমশ স্মৃতি বিস্মৃ্তির অন্তরালে চলে যান টগরি। তারপর পথই তাঁর ঠিকানা। ফুটপাতই তাঁর আশ্রয় হয়ে ওঠে। কয়েকদিন আগে অস্ফুটে তাঁর মাথার মধ্যে মহম্মদবাজার আর তাঁর দাদা নীলু খানের নাম মনে পড়ে। এই দুটি শব্দের জেরে দিল্লি থেকে সাঁইথিয়া হয়ে রবিবার নিজের বাড়িতে ফিরে আসা।
দাদা বছর ৪৫-এর নীলু খান ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়ান গ্রামে, হাটে। তিনি বলেন “কোথায় খুঁজিনি বোনকে। আমি যেখানে যাই, সেখানকার মেলায়, হাটে ঘাটে সর্বত্রই দু’চোখ দিয়ে শুধু বোনকে খুঁজেছি। রবিবার সকালে কে যেন বলল, তোর বোন আসছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। মনে হচ্ছে আল্লা মেহেরবান ইদে আমাদের যেন উপহার পাঠিয়ে দিয়েছেন। ম্যাজিক দেখিয়ে লোকের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে পেট চলে। আজ আমার চোখের সামনে ম্যাজিক দেখালেন আল্লা। মনে হচ্ছে এভাবেও ফিরে আসা যায়।” এদিকে বাড়ি ফিরে টগরির সব যেন নতুন লাগছে। জীবনের কুড়িটা বছর তাঁর হারিয়ে গিয়েছে। রেলপথে জীবন গিয়েছে স্বামী-সন্তানের। জীবনের শেষ আশা, এ জীবনে যদি মহম্মদবাজারের মেঠো আলপথে একবার তাঁদের দেখা পাই।
[বিদেশের সোনা গলিয়ে ‘দেশি’ বার, শহরে ফাঁস বড়সড় পাচার চক্র]
The post বিস্মৃতি কাটিয়ে ২০ বছর পর বাড়ি ফিরলেন মহম্মদবাজারের টগরি বিবি appeared first on Sangbad Pratidin.
