ধীমান রায়, কাটোয়া: এলাকার একাধিক পানীয় জলের প্রকল্প চলছে হুকিং করেই। কোনও পাম্পের স্টার্টার বক্স রয়েছে চৌবাচ্চার গায়ে সাঁটানো। মাটি থেকে মাত্র ইঞ্চি পাঁচেক উপরে। কোনও পাম্পের স্টার্টার বক্স বাঁশঝাড়ে দড়ি বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে। গ্রামের পানীয় জল প্রকল্পের বিদ্যুৎ লাইন প্রায় দেড়বছর ধরে এমনই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে বলেই অভিযোগ। যা কার্যত ছিল মৃত্যুফাঁদ। পরিণতিও হল মারাত্মক। সকালে পাম্পের জলে মুখ ধুতে গিয়ে সেখানেই ঝুলে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হল এক জনমজুরের। পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোট থানার জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের ঘটনা। মৃত ব্যক্তির নাম মৃত্যন মাজি (৪০)। তাঁর এই মৃত্যুর ঘিরে চাপানউতোর তৈরি হয়েছে।
মৃত্যন ছিলেন মঙ্গলকোটের মাজিগ্রাম অঞ্চলের ১৩৭ নম্বর বুথের বিজেপির সভাপতি। তাঁর এই মৃত্যুর ঘটনায় তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে বিজেপি। মঙ্গলকোট বিধানসভার বিজেপির যুবমোর্চার কনভেনর সৌমেন মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ, "একেই রাস্তার ধারে ধারে অপরিকল্পিতভাবে পঞ্চায়েত থেকে পাম্পগুলি বসানো হয়েছে। তার উপর পাম্পগুলি চালিয়ে আসা হচ্ছে হুকিং করেই। পঞ্চায়েত থেকে নিরাপদভাবে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ না নেওয়ার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।" যদিও মাজিগ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কাজল মণ্ডলের দাবি, "আমি শুনেছি ওই ব্যক্তি বাড়িতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গিয়েছেন।" তবে হুকিং করে পাম্প চালানোর কথা অস্বীকার করেননি কাজলবাবু। তিনি বলেন, "পাম্পের যে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে, সেখানে তারের কভার দেওয়া আছে। বিপদ ঘটার সম্ভাবনা তেমন নেই।"
[আরও পড়ুন: স্ত্রী-সন্তানদের কুড়ুলের কোপ, পরিবারের ৮ সদস্যকে খুন করে আত্মঘাতী যুবক!]
মাজিগ্রাম অঞ্চলের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের বাগদিপাড়ায় বাড়ি মৃত্যন মাজির। পেশায় ছিলেন জনমজুর। তারই উপার্জনের টাকায় সংসার চলত। বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধা মা সাগরিকাদেবী, স্ত্রী সুভদ্রা এবং দুই নাবালিকা মেয়ে, রাখি ও পূর্ণিমা। মাজিগ্রাম পঞ্চায়েত থেকে বছর দেড়েক আগে জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে বাগদিপাড়ায় ওই পানীয় জলের পাম্প বসানো হয়। পাড়ার লোকজন সেখান থেকেই পানীয় জল নেন। মৃতের স্ত্রী সুভদ্রাদেবী জানান, বুধবার সকালে তাঁর স্বামী ঘুম থেকে ওঠার পর ওই পাম্পের জলে মুখ ধুতে যান। বসে বসে মুখ ধোয়ার সময় আর উঠতেই পারেননি। মৃত্যন খেয়াল করতেই পারেননি তাঁর পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে ঝুলে থাকা বিদ্যুৎবাহী তার। ওই তার পাম্প চালানোর পরেই জলে ডুবে যায়। আর সেই জলে শরীর স্পর্শ করতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। পাড়ার আরও কয়েকজন তখন জল নিতে আসার সময় বিষয়টি খেয়াল করেন। একজন তড়িঘড়ি সুইচ অফ করে দেন। মৃত্যন ততক্ষণে জ্ঞান হারান। তাঁকে তড়িঘড়ি উদ্ধার করে সিঙ্গত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে জানান।
খবর পেয়ে মঙ্গলকোট থানার পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কাটোয়ায় পাঠায়। স্থানীয়রা জানান, জয়কৃষ্ণপুর ও পাশের ইছাপুর গ্রাম মিলে আটটি এমন পানীয় জল প্রকল্পের পাম্প রয়েছে। সবকটিই চলছে হুকিং করেই, এমনটাই অভিযোগ। এই দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃতের প্রতিবেশীরা ওই পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। মৃতের বৃদ্ধা মা বলেন,"আমার ছেলের আয়ের উপরেই পুরো সংসার চলত। এখন দুটো বাচ্চাকে নিয়ে আমরা কোথায় যাব?" পুলিশ জানিয়েছে, একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করে ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
