ফুটন্ত ঘিয়ে ডুবছে হাত। মুহূর্তের জন্যও কাঁপুনি নেই চোখেমুখে। ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে ওঠে পাকুড়ডিহার মাঠ। আর সেই ফুটন্ত ঘিয়েই ভাজা হচ্ছে গুড়পিঠে। এভাবেই বাঁকুড়ার এক গ্রামে গুড়পিঠে তৈরি হয়। এই রীতি প্রায় সাড়ে তিনশো বছর ধরে চলে আসছে। কিন্তু কেন এই রীতি? এই ঘটনার সঙ্গেও জুড়ে আছে এক প্রাচীন ইতিহাস।
লোক দেখানো কৌশল নয়, কোনও খেলা নয়। বোনের মঙ্গলকামনায় শতাব্দীপ্রাচীন কৃচ্ছসাধনের ব্রত আজও হয়ে চলেছে বাঁকুড়ার তালড্যাংরা ব্লকের পাকুড়ডিহা গ্রামে। গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার এই রীতির সাক্ষী। কথিত রয়েছে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে এই গ্রামেই বাস করত সাত ভাই ও তাঁদের একমাত্র বোন। জীবিকার তাগিদে একদিন পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে শিকারে গিয়ে আর ফিরে আসেননি সেই সাত ভাই। হিংস্র বন্যপ্রাণীর আক্রমণে তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, সেই আশঙ্কাই গ্রাস করে বোনকে। ভাইদের ফিরে পাওয়ার আকুলতায় শুরু হয় কঠোর তপস্যা, আত্মসংযম আর ব্রত।
ফুটন্ত ঘিয়ে ডোবানো হয়েছে হাত। নিজস্ব চিত্র
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, সেই আত্মত্যাগেই হয়েছিল অলৌকিক ঘটনা। কিছুদিন পর ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে বাড়ি ফেরেন সেই সাত ভাই। আর সেই দিন থেকেই শুরু হয় পাল্টা কৃচ্ছসাধন। বোনের তপস্যার ঋণ শোধ করতে সাত ভাই গ্রহণ করেন কঠোর ব্রত। আজও সেই প্রথা অটুট। পৌষ মাস জুড়ে নিরামিষ আহার, সংযম আর আচার পালন চলে। মাঘ মাসের নির্দিষ্ট এক দিনে পাকুড়ডিহার মাঠে সমবেত হন গ্রামের আদিবাসী যুবকেরা। বোনদের মঙ্গল কামনায় ফুটন্ত ঘিয়ে হাত ডুবিয়ে গুড়পিঠে ভাজার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয় তাঁদের ব্রত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্রতে সামিল হয়েছেন গ্রামের অন্য যুবকেরাও।
পাকুড়ডিহা গ্রামের বাসিন্দা চুড়ারাম মান্ডি বলেন, “আমাদের গ্রামে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি চলে আসছে। এটা শুধু উৎসব নয়, বিশ্বাস আর আত্মত্যাগের স্মৃতি।” এই ব্যতিক্রমী রেওয়াজের কথা ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের গ্রামেও। মাঘ মাস এলেই পাকুড়ডিহার মাঠে ভিড় জমান বহু মানুষ। ধীরে ধীরে এই ব্রতকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে মেলার আবহ। ফুটন্ত ঘিয়ে হাত ডুবিয়ে গুড়পিঠে ভাজেন ভাইরা। ওই উৎসব দেখতে আসা তালড্যাংরার বাসিন্দা প্রবীর ঘোষের কথায়, “বাঁকুড়া জেলায় আদিবাসী গ্রামের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এমন উৎসব কোথাও দেখিনি। অন্য কোনও ধর্ম বা জাতির মধ্যেও এমন রীতি চোখে পড়ে না। তাই প্রতি বছরই এই দিনে পাকুড়ডিহায় আসি।”
