একটা বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য সাইকেল মিস্ত্রি কৃষ্ণ বাউড়িকে মিথ্যা মামলায় যেতে হয়েছিল জেলে। সকলের সামনে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়েছিল তাঁর স্ত্রীকে। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে শোওয়ার ঘরেই চিতি সাপ ছোবল মেরেছিল তাঁকে! আলো না থাকায় কাঁকড়াবিছে দেখতে না পেয়ে তার উপর পা পড়ে গিয়েছিল মেয়ের, বিষ ঢেলে দিয়েছিল বিছে! লম্ফের আলোয় থমকে গিয়েছিল ছেলের শিক্ষা। এভাবেই প্রায় ১৫ বছর আঁধার জীবন কাটানোর পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জনতার দরবারে অভিযোগের ১২ দিনের মাথায় দেড় দশকের অন্ধকার ঘুচল ওই সাইকেল মিস্ত্রির পরিবারে। পুরুলিয়ার পুঞ্চা ব্লকের লৌলাড়া গ্রামে ওই দরিদ্র পরিবারে এখন খুশির হাওয়া।
এ যে শুধু রাতের বেলা ঘরের আঁধার নয়। এ যেন জীবনের আঁধার দূর করে আলো নিয়ে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। 'আলো নয়ন-ধোওয়া' অনুভূতিতে আর আবেগ ধরে রাখতে পারছেন না কৃষ্ণ। রবিবার আঁধার জীবনের যন্ত্রণা শোনাতে গিয়ে চোখ ছলছল হয়ে গিয়েছিল। তারপর হাউমাউ করে সে কী কান্না! হাত জোর করে কপালে ঠেকিয়ে বলেন, ‘‘নতুন সরকার এসেছে, তাই ঘরে আলো এল। কত যে যন্ত্রণা, কত যে কষ্ট - সে শুধু আমরা জানি। ছেলেটা লম্ফের আলোতে লেখাপড়া করতে পারেনি। আমাকে বলেছে, 'বাবা আবার আমি লেখাপড়া করব।' আমাদের পরিবারের তরফে মুখ্যমন্ত্রীকে অজস্র ধন্যবাদ। ভগবানের পরই উনি।"
ঘরে আলো জ্বালাচ্ছেন কৃষ্ণ বাউড়ির স্ত্রী কল্পনা। রবিবার পুরুলিয়ার পুঞ্চার লৌলাড়া গ্রামে। নিজস্ব চিত্র।
কৃষ্ণ বাউড়ি সিপিএম সমর্থক। পড়শিদের সঙ্গে জমি নিয়ে ঝামেলায় গত ১৫ বছরে তার পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। পঞ্চায়েত, ব্লক, ভূমি ও ভূমি সংস্কার এমনকী বিদ্যুৎ দপ্তরের কাছে গিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর মাসখানেক আগে বিদ্যুতের জন্য পুঞ্চা ব্লক প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন তিনি। কিন্তু জমি জটিলতায় সেই কাজ যেন এগোচ্ছিল না। গত ১৩ জুলাই কৃষ্ণর স্ত্রী কল্পনা বাউড়ি ও তাঁর মেয়ে বর্ধমানের বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের কাজ করা কাকলি বাউরি বিধাননগরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জনতার দরবারে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় অন্যান্য আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে আসেন। তাঁকে বলা হয়েছিল এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ না এলে আবার এখানে আসতে। কিন্তু আর যেতে হয়নি।
সপ্তাহ পার হলেও এখন রাতের অন্ধকারে আলোয় ঝলমল করছে ওই সাইকেল মিস্ত্রির বাড়ি। মেয়ে কাকলি বাউড়ি বলেন, ‘‘আমার দাদুর নামে আগে বিদ্যুৎ ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের বিল দিতে না পারায় সংযোগ ছিন্ন করে দেয়। আমরা বিপিএল তালিকাভুক্ত হওয়ায় ২০১৪ সালে বিনা পয়সায় বিদ্যুতের সুযোগ পায়। কিন্তু জমির সমস্যায় বিদ্যুতের স্তম্ভ নিয়ে জটিলতা বাড়ে। মিথ্যা মামলায় বাবাকে জেলে যেতে হয়। আরও কত কী যে ঘটনা ঘটে গিয়েছে।" গত শুক্রবার বিদ্যুৎ আসার পরেও যে পড়শিদের সঙ্গে জমি নিয়ে ঝামেলা, তাঁরা রীতিমতো হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কাকলি আগেভাগেই পুঞ্চা থানায় অভিযোগ করে রেখেছেন।
১৫ বছর পর বিদ্যুতের সংযোগ সাইকেল মিস্ত্রি কৃষ্ণ বাউরির বাড়িতে। নিজস্ব ছবি
জনতার দরবারে তারা অভিযোগ জানিয়ে আসার পর ২৩ তারিখ দুপুরে পুঞ্চা বিডিও কার্যালয়ে তাদের শুনানি ছিল। সেখানে বিডিও, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং বিদ্যুৎ দপ্তরের আধিকারিকরা ছিলেন। যে পড়শিদের সঙ্গে ঝামেলা তারা না দেখাতে পারেন জমির কোনও দলিল। না বলতে পারেন প্লট নম্বর। বলতে পারেননি জমির পরিমাণও। অথচ কৃষ্ণর মেয়ে কাকলি দলিল থেকে প্লট নম্বর, সেই সঙ্গে জমির পরিমাণের সব নথি দেখিয়ে দেওয়ায় তার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই বিদ্যুৎ দপ্তরের আধিকারিকরা গিয়ে ওই সাইকেল মিস্ত্রির বাড়িতে সংযোগ জুড়ে দেয়। পুঞ্চার বিডিও দীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘জমি নিয়ে সমস্যায় বিদ্যুৎ সংযোগ মিলছিল না। আমাদের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তারপর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন তারা। জেলা প্রশাসনের নির্দেশ মোতাবেক
আমরা সব কিছু খতিয়ে দেখে ওই পরিবারে আলো পৌঁছে দিয়েছি।"
