মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের পর এবার পুরুলিয়ার পাড়া। গুরুদেবের কাছে দীক্ষা নেওয়া ছাত্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কপালে লম্বা তিলক কেটে সেই সঙ্গে গলায় তুলসির মালা পরে আসায় আপত্তি স্কুল কর্তৃপক্ষের। পাড়া গার্লস হাইস্কুলে (উচ্চ মাধ্যমিক)গত এক বছর ধরে এমন বিতর্ক চলছিল স্কুলের দুই ছাত্রীকে নিয়ে। সম্প্রতি স্কুলের প্রার্থনার সময় একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুমনা মাজির কপালের তিলক মুছিয়ে দেওয়া হয়। জানিয়ে দেওয়া হয়, এভাবে যেন আর তিলক কেটে, গলায় তুলসির মালা পরে না আসে। প্রার্থনার সময় সকল ছাত্রী ও শিক্ষিকার সামনে এমন ঘটনা হওয়ায় স্কুলে গিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন ছাত্রীর মা। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছাত্রীর ট্রান্সফার সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দেয়। ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই জেলার শিক্ষা ইনচার্জ বা ডিআই-এর কাছে রিপোর্ট তলব করল স্কুল শিক্ষাদপ্তর। সেই চাপে আবার ছাত্রীকে ফেরাতে বাধ্য হল স্কুল কর্তৃপক্ষ।
বছর দুই আগে মুর্শিদাবাদের একটি স্কুলেও ঠিক এমনই ঘটনা ঘটেছিল। অভিযোগ উঠেছিল ছাত্রীর ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করার। তারই পুনরাবৃত্তি পুরুলিয়ার পাড়ায়। জানা যায়, স্কুল থেকে তিলক মুছিয়ে দেওয়া প্রার্থনা সভায় কপালে তিলক মুছিয়ে দেওয়ার পরও নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে সরে আসেনি ওই ছাত্রী। বরং তাতে অপমানিত হওয়ায় আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে গিয়েছিল। এই ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বাসন্তী মাঝি পাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তর রিপোর্ট তলব করেছে। গত বুধবার ওই স্কুলে তদন্তে যান জেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক মহুয়া বসাক। বৃহস্পতিবার ওই ছাত্রীর বাড়ি গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন পাড়ার বাসিন্দা তথা রাজ্যের পূর্ত ও অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউরি। তিনি বলেন, ‘‘কপালে তিলক কেটে গলায় তুলসির মালা পরে কেউ আসতেই পারেন। এটা নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস। যে সমস্যা তৈরি হয়েছে সেই সমস্যা মিটে যাবে।" এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল।
ছাত্রীর বাড়ি গিয়ে আশ্বাস বিধায়ক তথা মন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউড়ির। নিজস্ব ছবি
এই ঘটনায় কয়েক দিন ধরে হইচই বেঁধে যাওয়ায় হস্তক্ষেপ করে স্কুল শিক্ষা দপ্তর। তারপরেই ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় ছাত্রীকে দেওয়া ট্রান্সফার সার্টিফিকেট প্রত্যাহার করে নিতে। মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক মহুয়া বসাক বলেন, ‘‘আমি ওই স্কুলে গিয়েছিলাম। আমি রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ ট্রান্সফার সার্টিফিকেট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আবার নতুন করে ছাত্রীর নাম নথিভুক্ত হয়েছে। ওই ছাত্রীর যাতে লেখাপড়ায় কোন সমস্যা না হয় সেটা আমরা দেখছি।"
ওই স্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুমনা মাজি ছাড়াও তিলক-তুলসিমালা নিয়ে তার সহপাঠী অনুপমা বাউরির সঙ্গেও খারাপ আচরণ করে স্কুল কর্তৃপক্ষ বলে অভিযোগ। একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুমনা মাজির কথায়, ‘‘আমার সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা গত এক বছর ধরে চলছে। যেদিন প্রার্থনা সভায় আমার কপালে তিলক মুছিয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে আমি ভীষণ অপমানিত হয়েছি। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আমাকে অপমান তো করেইছেন। সেইসঙ্গে আমার গুরুদেব নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছেন।" ওই ছাত্রীর মা বাসন্তী মাজি বলেন, ‘‘আমার মেয়ের সঙ্গে এক বছর ধরে স্কুল কর্তৃপক্ষ যা আচরণ করছে তা মেনে নেওয়া যায় না। সেই কারণেই আমি পাড়া থানায় অভিযোগ করতে বাধ্য হয়েছি।" ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুস্মিতা ঘোষ বলেন, ‘‘স্কুলের তো একটা নিয়মশৃঙ্খলা থাকে, সেটা সবাইকে মেনে চলতে হয়। ওই ছাত্রীর পরিবার সমাজ মাধ্যমে নানান কথা বলছে। আমাদেরও অনেক বক্তব্য আছে। এভাবে এক লাইনে কোন ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।"
