দিল্লির অধ্যাপিকা দেবস্মিতা পালের খুনে ধৃত রামপ্রসাদ দাস ও তার স্ত্রী বনশ্রী দাসকে ট্রানজিট রিমান্ডে নিল পুলিশ। সোমবার বর্ধমান আদালতে তাঁদের পেশ করে দিল্লি পুলিশ। একই সঙ্গে ওই দম্পতির বছর এগারোর ছেলেকে পূর্ব বর্ধমান চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (সিডাব্লুসি)-র কাছে পেশ করা হয় এদিন। ঘটনার 'মূল সাক্ষী' করা হতে পারে তাকে। তাকেও দিল্লি নিয়ে যেতে চায় পুলিশ। তাকে বনশ্রী দাসের মা অর্থাৎ ছেলেটির দিদিমার হাতে তুলে দেওয়া। তার বাবা-মা যে 'খুন' করেছে, সেটা পুলিশের কাছে জানিয়েছে ওই নাবালক।
এদিকে, এই ঘটনার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে দিল্লি পুলিশ। ট্রেনে করে দিল্লি গিয়ে পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভে একরকম পোশাক পরে ঢুকেছিল ওই দম্পতি ও তাদের ছেলে। খুনের পর পোশাক বদলে তারা নেমে এসেছিল। তারপর প্রথমে ট্যাক্সি ও পরে থ্রি সিটার অটোয় চেপে আনন্দবিহার হয়ে নতুন দিল্লি স্টেশনে যায়। সেখান থেকে পূর্বা এক্সপ্রেসে বর্ধমানে আসে। বর্ধমান থেকেও তারা ট্রেনেই দিল্লি গিয়েছিল। দিল্লির ডাল্লুপুরার রেস্ট ইন গেস্ট হাউসে এক রাত ছিল। পুলিশের চোখে ধুলো দিতে ধুলো দিতে গেস্ট হাইসে ভুয়ো আধার কার্ড জমা দিয়েছিল। সেখানে তারা বিহারের নওয়াদার বাসিন্দা সতীশ কুমার এবং বর্ধমানের সোমা চৌধুরীর নামে দুইজনের আধার কার্ড জমা দিয়েছিল। দিল্লি পুলিশ সেগুলো পরীক্ষা করে ভুয়ো বলে জানতে পারে। তবে গেস্ট হাউসে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়েছিল রামপ্রসাদ। ফলে পুলিশের কাজ সহজ হয়ে যায়।
বর্ধমানে গ্রেপ্তার ভাড়াটে দম্পতি!
২ জুন রামপ্রসাদ তার স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে দিল্লি গিয়েছিল। বর্ধমানের বাড়ির ভাড়া দেওয়ার অছিলায় ফোন করে দেবস্মিতাকে। তিনি দরজা খুলে দেন। তারপর আচমকা ভারী কিছু দিয়ে দেবস্মিতার মাথায় আঘাত করে। অধ্যাপিকা লুটিয়ে পড়লে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া দাড়ি কাটার ক্ষুর দিয়ে দেবস্মিতার শরীরের বিভিন্ন অংশে শিরা কেটে দেয় ওই দম্পতি! মৃত্যু নিশ্চিত করতেই এমনটা করা হয়! ছেলের সামনেই তারা পুরো নৃশংস কাজটি করে! এই মামলায় ওই ছেলের সাক্ষী পুলিশের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খুনের তদন্তে নেমে দিল্লি পুলিশ জানতে পারে, বর্ধমানে মাতুলালয়টি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন দেবস্মিতারা। সেই বাড়িটি দেখভাল করতেন ওই অধ্যাপিকা। তাঁর কাছ থেকে বাড়ির নীচের তলাটা ২০২৩ সালে ভাড়া নিয়েছিল রামপ্রসাদরা। অভিযোগ, বাড়ি ভাড়া নিয়মিত দিত না। এই নিয়ে বিবাদও হয়েছিল। সম্প্রতি রামপ্রসাদদের বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছিলেন দেবস্মিতা।
এদিকে দিল্লি পুলিশের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়িটির মালিক ছিলেন দাদু এনজি কোনার। তাঁর অবর্তমানে বাড়িটি পান দেবস্মিতার মা অঞ্জলি পাল। তাঁর স্বামী চিত্তরঞ্জন পাল, ছেলে, ও আর এক মেয়ে দেবারতিও দিল্লির ওই আবাসনের সংলগ্ন ফ্ল্যাটে থাকেন। পুলিশের অনুমান, রামপ্রসাদের ধারণা ছিল বর্ধমানের বাড়িটি দেবস্মিতার ভাগেই আছে। এদিকে, এই বাড়িটি বিক্রির জন্য কয়েক জনের কাছে ৫ লক্ষাধিক টাকাও না কি অগ্রিম নিয়েছিল রামপ্রসাদ। বাড়ি বিক্রিতে রাজি ছিলেন না দেবস্মিতা। আবার বাড়ি থেকে ভাড়াটিয়াকে উঠে যেতেও বলেছিলেন। সেই আক্রোশ থেকেই ওই দম্পতি খুন করেছে বলে অনুমান পুলিশের।
ওই অধ্যাপিকার বর্ধমানের বাড়ি।
সোমবার দিনভর বর্ধমানের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেপ্তার করে ওই দম্পতিকে। বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে খুনে ব্যবহৃত ক্ষুর, খুনের সময়ের ও পরে বদলে ফেলা পোশাক, টুপি, মাস্ক। দেবস্মিতার অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনও উদ্ধার হয়েছে। সেটি সম্ভবত ওই দম্পতির ছেলে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। খুনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এই ছেলেই। সূত্রের খবর, দিল্লি পুলিশের কাছে বাবা-মা কীভাবে খুন করেছিলো সে কথা তদন্তকারীদের জানিয়েছেন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া ছেলেটি।
