প্রকৃতির রোষে হড়পা বানে ধ্বংসলীলা নেপালে। তার জেরে বহু মানুষের মৃত্যু। সেই সঙ্গে দেশের বহু পর্যটক আটকে। এমন হড়পা বান নেমে আসে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়েও। আজ থেকে ২০ বছর আগে বাঘমুণ্ডি ব্লকের অযোধ্যা পাহাড়ের ডাউরি খালে ওই হড়পা বানেই ভেসে মারা যান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন পড়ুয়া। ট্রেকিং করতে এসে ঘটে যায় দুর্ঘটনা। তাই সতর্ক পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন ও বনদপ্তর। ডাউরি খাল-সহ অযোধ্যা পাহাড়ের বামনি, টুরগা, মাছকেন্দা ফলস সহ ৪ স্পটে অবাধ যাতায়াতে জারি নিষেধাজ্ঞা। ফলে সেই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তাই এই বর্ষার মরশুমে পর্যটকদের জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। পুলিশি নজরদারির পাশাপশি স্থানীয় যৌথ বন পরিচালন সমিতির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা সেরে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করেছে বনদপ্তর।
ঠিক কি ঘটেছিল ২০০৬-র ২৮ জুলাই বিকাল শেষে সন্ধ্যার মুখে। ওই সময়ের প্রায় ১২ ঘণ্টা আগে থেকে জেলায় ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছিল। আর অযোধ্যা পাহাড়ে যেন মেঘ ভেঙে পড়ে! সেই বৃষ্টির মধ্যেই ট্রেকিং করতে আসা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রছাত্রী দুপুরের পর মাঠা বনাঞ্চল থেকে রওনা দিয়েছিলেন ডাউরি খাল। তখনও ওই মৃত্যুপুরী অযোধ্যা পাহাড়ের সাইট সিয়িং হয়ে ওঠেনি। অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম করতে আসা পর্যটকদের কাছেও ওই ডাউরি খাল ছিল অজানা। কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পড়ুয়ার স্থানীয় মানুষজনদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন, অযোধ্যা পাহাড়ের ওই এলাকা 'ভয়ংকর সুন্দর'।
ওই ডাউরি খাল বা ডাউরি নালার কুমিরের হাঁ মুখের নিচ থেকে পাহাড়ি ঝোরার জল নেমে আসে সমতলের শোভা নদীতে। জঙ্গল টিলা ছুঁয়ে ওই জলের স্রোত যখন ওই কুমিরের হাঁ মুখ থেকে নেমে আসে তখন ভয়ংকর সুন্দর লাগে। আর সেই দৃশ্য দু'চোখ ভরে দেখতেই মৃত্যুপুরীতে পা রেখেছিলেন ওই পাঁচ পড়ুয়া। স্বাতী দাস, শুভঙ্কর সাহা, অরুন্ধতী ঘোষ ও
বাপ্পাদিত্য চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক সরকার। গাছে উঠে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন বাপ্পাদিত্য।
আর কৌশিক ভাসতে ভাসতে গাছের ডালকে ভর করে সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে বেঁচে ফেরেন। বাকি তিনজনের পরপর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। ওই এলাকার মানুষজন নিষেধ করেছিলেন তাদেরকে যেতে।
কিন্তু সেই কথা কানে না তোলায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ওই হড়পা বানে বিপদ নেমে এসেছিল। অযোধ্যা পাহাড়তলির বাঘমুণ্ডির ছোট্ট জনপদ কুদনা গ্রামের মানুষজনের কথায়, "জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ পড়ুয়া বেড়াতে এসেছিলেন। যাদের মধ্যে তিন ছাত্র এবং দুই ছাত্রী ছিলেন। কুদনা গ্রাম থেকে হাঁটা পথে তারা শোভা নদীর উৎপত্তিস্থল অযোধ্যা পাহাড়ের ডাউরি খালে পৌঁছান। তার পর আচমকা হড়পা বানে তিনজন ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয়। কোনওক্রমে দু'জন বেঁচে যান।"
ওই এলাকার মানুজনের কথায়, পাহাড়ে কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে তা নিচ থেকে অনুমান করা যায় না। বিভিন্ন স্রোতের বয়ে আসা জল মিলিত হয়ে পাহাড়ি ঝরনায় নেমে আসে। যা হড়পা বান। অর্থাৎ আগাম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তড়িৎ বেগে ঘোলা জল সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে ধেয়ে আসে। তাই বর্ষায় সময় পাহাড়ি ঝরনায় সেভাবে স্থানীয় মানুষজন যান না। কিন্তু এতেই যে আলাদা রোমাঞ্চ খুঁজে পান শহর থেকে আসা মানুষজন। তাই ২০০৬ সালের ওই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য পুলিশ ও বন দফতর তৎপর হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই বনদপ্তরের মাঠা রেঞ্জ এবং কুদনা বিটের বনকর্মীরা যৌথ বন পরিচালন কমিটির সঙ্গে কথা বলে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা থেকে রুখতে যাতে পর্যটকরা ডাউরি খালমুখী না হন। পুরুলিয়া বনবিভাগের তত্ত্বাবধানে সেই পরামর্শ দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। বিশ সাল আগের ওই ঘটনায় ডাউরিখাল বা ডাউরি নালাকে অযোধ্যা পাহাড়ের অন্যতম হটস্পট-র রূপ দিয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, বনদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকদের একগুঁয়ে মনোভাব এবং হঠকারিতা চলছেই। তারা জানান, এই বর্ষার মরশুমেও কিছু পর্যটক জেদ ধরে গ্রামবাসীদের বা কোনো গাইড ছাড়াই নিজেরাই সেখানে চলে যান। তবে নেপালের ঘটনার পর পর্যটকরা ঝুঁকি নিয়ে নির্দেশিকা ভঙ্গ করলে আইনি পদক্ষেপের ভাবনাও রয়েছে প্রশাসনের। তবে শুধু ডাউরি খাল, বামনি, টুরগা,মাছকেন্দা ফলস নয় ঝালদার সেঁওয়াতির মতো ঝরনাতেও বিশেষ নজর দিয়েছে পুলিশ ও বনদপ্তর।
