আশঙ্কাই সত্যি হলো। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই ভেঙে গেল আদিবাসী কুড়মি সমাজ। শনিবার পুরুলিয়ার হুড়ার উদাসীন কুম্ভ মহারাজা স্মৃতি ময়দানে জেলার কুড়মি অধ্যুষিত ১৪ টি ব্লকের প্রায় ৪৫০ জন নেতৃত্বের উপস্থিতিতে কুড়মি সমাজের আরেকটি নতুন সামাজিক সংগঠন গঠন হলো। আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতোর বিরোধী বলে পরিচিত এই নেতৃত্ব। তারাই 'ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ' নামে এই নতুন সংগঠন গড়লেন, যা ছাব্বিশের ভোটে জঙ্গলমহলের রাজনীতিতে একেবারে নতুন সমীকরণ যোগ করতে চলেছে।
এই নতুন সংগঠনের নামেই জঙ্গলমহল জুড়ে কুড়মি জনজাতিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কারণ উদাসীন কুম্ভ প্রসাদ মহারাজা ওবিসি আন্দোলন করার সময় ডাক দিয়েছিলেন, ছোটনাগপুর এলাকার সমস্ত কুড়মিকে এক হতে হবে। তাই তাঁর আদর্শ ও নীতিকে পাথেয় করেই এই ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ চলবে বলে এদিনের বৈঠক থেকে স্থির হয়। আপাতত ১৫ জনকে নিয়ে একটি এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ১৫ জন পদাধিকারীর হাতেই থাকবে সমান ক্ষমতা। সরস্বতী পুজোর পর বাংলা, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং অসমের কুড়মি জনজাতিকে নিয়ে বৈঠক করবে এই নতুন সংগঠন। সেখানে প্রাথমিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি গঠনের পর ব্লক, জেলা ও কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্তরের কমিটি তৈরি হবে।
এদিনের সভায় কুড়মিদের আদিবাসী তালিকাভুক্ত করার দাবিতে জোরদার আন্দোলন চলবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আরও কয়েকটি দাবিকে সামনে রেখে তাদের কাজকর্ম চলবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের এক্সিকিউটিভ কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা সুজিত মাহাতো বলেন, "ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ নামে আমরা একটি নতুন সংগঠন করলাম। কুড়মি জনজাতির বিভিন্ন দাবি-দাওয়াকে সফল করতেই আমাদের এই নতুন সংগঠন। আপাতত একটি এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠন হয়েছে। তারপর ধাপে ধাপে এই সংগঠন কমিটি গড়ে বিস্তার লাভ করবে।"
পুরুলিয়ায় কুড়মিতে জনসভা। নিজস্ব ছবি
গত বছর পুজোর মুখে আদিবাসী তালিকাভুক্তের দাবিতে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বেআইনি রেল অবরোধ ঘিরেই এই সংগঠনে ফাটল দেখা যায়। হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ওই রেল অবরোধের বিরুদ্ধে পুলিশ পদক্ষেপ করলে গত ৮ অক্টোবর পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী জনসভার মঞ্চ থেকে আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো তৃণমূলকে ভোট না দেওয়ার ঘোষণা করেন। যদিও ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনেও এই সামাজিক সংগঠন এই ডাক দিয়েছিল। ওই জনসভার মঞ্চ থেকে তৃণমূলকে ভোট না দেওয়ার আবেদনের পর থেকেই অজিত বিরোধীরা একেবারে ক্ষোভ জানিয়ে সামনে চলে আসেন। ডিসেম্বরে পুরুলিয়া শহরের উপকণ্ঠে বোঙাবাড়িতে জঙ্গলমহলের চার জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরকে নিয়ে একটি বৈঠক করে তারা তা বুঝিয়ে দেন। তখন থেকেই এই সংগঠন আদিবাসী তালিকাভুক্তের দাবিতে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কুড়মি জনজাতির তৃণমূলের জন প্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে নিজেদের দাবি পূরণের জন্য দরবার করেন।
পুরুলিয়ায় কুড়মিদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি
সেই কাজ শেষ হওয়ায় এবার ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের ব্যানারে কুড়মি জনজাতির বিজেপি প্রতিনিধিদের কাছে গিয়েও দরবার করবেন। নতুন সংগঠন ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ সূত্রে জানা গিয়েছে, আদিবাসী তালিকাভুক্তের মূল দাবি যেন কোথাও সরে গিয়েছিল। প্রাধান্য পেয়ে গিয়েছিল বেআইনি বালি খাদান, জমি রক্ষা সহ নানা ইস্যু। তাছাড়া আদিবাসী কুড়মি সমাজ সংগঠনে একনায়কতন্ত্র চলছিল বলেও অভিযোগ। রয়েছে নানা বেনিয়মের অভিযোগও। ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের এখন মূল দাবি, আদিবাসী তালিকাভুক্তের বিষয়ে রাজ্যকে কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন পাঠাতে হবে। সেইসঙ্গে কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত, ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন লাগু ও সেইসঙ্গে প্রাথমিক স্তরে কুড়মালি ভাষায় পঠনপাঠন-সহ শিক্ষক নিয়োগ।
