সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: একই নদী। সেই নদীর এক জায়গায় শিলান্যাসের সাত বছর পরেও সেতু হয়নি। আবার সেই নদীর-ই অন্য জায়গায় টানা বৃষ্টিতে বে-আইনিভাবে বালি উত্তোলনের জেরে একেবারে ধনুকের মতো নুইয়ে পড়েছে সেতু। ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে যাতায়াত। নদীর যে স্থলে সাত বছরেও সেতু হয়নি সেখানে গ্রামবাসীরা স্বেচ্ছাশ্রমে চাঁদা আদায় করে অস্থায়ী সাঁকো গড়ে পারাপার শুরু করেছিলেন বটে।
কিন্তু বৃষ্টির তোড়ে সেটাও ভেঙে যায়। তাই ওই কাঁসাই নদীতে বাঁশ দিয়ে তৈরি ভেলা নামিয়ে মানুষজনকে পারাপার করে দিচ্ছেন পুরুলিয়ার আড়শা ব্লকের বামুনডিহা গ্রামের নয় যুবক। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত চারজন পালা করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে পারাপার করছেন। কিন্তু এই কাজে কোন ধরা বাঁধা টাকাপয়সা নয়। খুশি মনে যে যা দিচ্ছেন সেটাই তাঁরা গ্রহণ করে প্রায় ১২ ঘন্টা জলে থেকে এই পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
পুরুলিয়ার এক নম্বর ও আড়শা ব্লকের সংযোগকারী কাঁসাই নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতুর শিলান্যাস হয়েছিল সাত বছর আগে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ওই প্রস্তাবিত সেতু নির্মাণে যে ডিপিআর ( ডিটেলস প্রজেক্ট রিপোর্ট ) তৈরি করা হয়। সেই মোতাবেক কাজ করতে গিয়ে বিপুল অর্থ খরচ হওয়ায় তা থমকে যায়। অন্যদিকে এই নদীর ওপর আড়শার বেলডিতে বাম আমলেই প্রায় ৩০ টি গ্রামের মানুষজনের যাতায়াতকে সহজ করতে গড়ে ওঠে সেতু। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে এই সেতুতে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।
[আরও পড়ুন: ‘ED ডাকবে না’! কোটি কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেলেঙ্কারিতে নুসরতের পাশে স্বামী যশ]
তারপরও নদী বক্ষ থেকে চলছিল বেআইনি বালি উত্তোলন। যদিও এখন পুলিশ পাহারা থাকে। কিন্তু ওই বালির উত্তোলনের জেরেই টানা বৃষ্টিতে ওই সেতু একেবারে নুইয়ে পড়ে। প্রথমে আটটি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখন আরও ১৪ টি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৫ পিলারের এই সেতু যেকোনো সময়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়তে পারে। তাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে যাতায়াত। ফলে আড়শা ব্লক এলাকা থেকে কম সময়ে পুরুলিয়া মফস্বল বা শহরে আসতে নদীপথে ওই ভেলায় এখন অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।
এই ভেলায় শুধু পথচলতি মানুষ নন। সাইকেল, মোটরবাইককেও পারাপার করে দিচ্ছেন বামুনডিহা গ্রামের ওই নয় যুবক। দীনবন্ধু মাহাতো, পঙ্কজ মাহাতো, রূপচাঁদ যোগী, উপাসি মাহাতো, বঙ্কিম মাহাতো, ছুটু যোগি, করমচাঁদ যোগি, নির্মল মাহাতো ও ভগীরথ মাহাতো। ছুটু যোগি ও করমচাঁদ যোগি বলেন, “আমরা গ্রামের মানুষজন মিলে চাঁদা আদায় করে স্বেচ্ছাশ্রমে যে অস্থায়ী সাঁকো গড়ে পারাপারের ব্যবস্থা করেছিলাম। তা টানা বৃষ্টিতে ভেঙে গিয়েছে। তাই এখন ভেলা নিয়েই মানুষজনকে পারাপার করছি। এই কাজে আমাদের যে যেমন টাকা দিচ্ছেন সেটাই আমরা আনন্দে গ্রহণ করছি।”
বেলডি সেতুর বিপর্যয়ের কারণে আড়শার তেতলো, ভুরসা, বেলডি, গোরাদাগ, মানপুর গ্রামের মত মানুষজনও সময় বাঁচাতে বামুনডিহা এসে ভেলা-র সাহায্যে কাঁসাই পারাপার হচ্ছেন। তাদের মধ্যে নিত্য যাতায়াত করা আড়শার গৌতম কুমার, কাঞ্চনপুরের সন্তোষ মাহালী বলেন, “পেটের জন্য ফি দিন আমাদেরকে নদী পারাপার হয়ে পুরুলিয়া মফস্বল বা শহরে আসতে হয়। এই বর্ষায় এখন ভেলায় আমাদের অন্যতম ভরসা। পুরুলিয়া এক ও আড়শার এখন প্রায় ২০ টির বেশি গ্রামের ৫০ হাজার মানুষ এভাবেই যাতায়াত করছেন। “
