গৌতম ব্রহ্ম: সন্ত্রাস চালাচ্ছে বজ্রগর্ভ মেঘ৷ বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা৷ শুধু চলতি বছরেই রাজ্যে বাজ পড়ে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার শুধু বাঁকুড়াতেই মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের। রাজ্যের অন্য অংশে বজ্রপাতের বলি আরও পাঁচ। রবিবার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্র সরোবরে ক্যালকাটা ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পের মাঠে প্র্যাকটিস চলাকালীন বজ্রপাতে মাঠেই মৃত্যু হয় ক্রিকেটার শ্রীরামপুরের দেবব্রত পালের। ওইদিন দুপুরে একডালিয়ার একটি তিন তলা বাড়ির উপর এসি মেশিনে বাজ পড়ে আগুন লেগে যায়। ভস্মীভূত হয়ে যায় তিন তলার একাংশ। শহরেও বাড়ছে বজ্রাপাতের ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে বাজ থেকে বাঁচতে থার্টি-থার্টি রুল মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷
২০১২ সালে এপ্রিল-মে মাসে বাজ পড়ে ৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল৷ শুধু হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের উত্তর হরিশপুর গ্রামে মৃত্যু হয়েছিল ন’জনের৷ জখম হয়েছিলেন ৩০ জন৷ গ্রামের বারোয়ারি পঞ্চানন মন্দিরে চাতালে আশ্রয় নিয়েছিলেন এঁরা৷ মঙ্গলবার বিকেলেও বজ্র-সন্ত্রাস দেখল মহানগর৷
[গভীর অরণ্যে বর্ষা উপভোগের সুযোগ! পর্যটকদের জন্য বনদপ্তরের সুখবর]
আগেও বজ্রপাতে মৃত্যু হত গ্রাম-বাংলায়৷ এখনও হয়৷ তবে সংখ্যাটা অনেক বেড়ে গিয়েছে৷ মন্দিরের চাতাল থেকে খেলার মাঠ, চাষের জমি থেকে স্টেশন চত্বর, সর্বত্রই বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে৷ ঝড়-বৃষ্টি হলেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে৷
বজ্রপাতের কারণ নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা করেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল৷ তিনি বলেছিলেন, মেঘে মেঘে ঘর্ষণেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়৷ পরে অবশ্য আরও অনেক তত্ত্ব এসেছে৷ তবে মোদ্দা কথা হল, মেঘের রাজ্যে থাকা বজ্র-নালায় হঠাৎ করে তাপমাত্রা বেড়ে ২০,১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মতো হয়ে যায়৷ তৈরি হয় এক ধরনের শক-ওয়েব, যা তাপমোচনের জন্য ঠান্ডা বাতাসের খোঁজে নিচের দিকে নেমে আসে৷ এই ‘শক-ওয়েভ’-ই বাজ৷ সমস্যা হয় তখন, যখন তাপমোচনের পথে হঠাৎ করে চলে আসে গরম উষ্ণ জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস৷ তখন সংঘর্ষ হয়৷ বিকট শব্দে বজ্রপাত হয়৷
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বর্ষা আসার আগে ঘূর্ণাবর্ত বা নিম্নচাপের জেরে স্থানীয়ভাবে যে মেঘের সঞ্চার হচ্ছে তাতে ‘তড়িৎ’ খুব বেশি থাকে৷ এই মেঘগুলির উচ্চতা খুব বেশি হয়৷ উপরিভাগ দেখতে অনেকটা কুড়ুলের মতো৷ এই মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার সময়ই ওই স্থির তড়িৎ পরিবর্তিত হয় বজ্রে৷ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রাক বর্ষা বা তার আগে স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া মেঘে জলকণা কম থাকে৷ তড়িৎকণা বেশি থাকে৷ যা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ১০-১২ মেগাওয়াট৷ বর্ষার মেঘেও বিদ্যুৎ থাকে৷ তবে কয়েক হাজার গুণ কম৷ প্রায় ১০৮ মেগাওয়াট৷ এই মেঘে জলকণাই বেশি থাকে৷ তাই বর্ষার মেঘকে জলভরা মেঘও বলা হয়৷ এই জলভরা মেঘের উচ্চতাও খুব কম হয়৷ তাই, বর্ষা না আসা পর্যন্ত সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷
[ব্যান্ডেলে গ্রেপ্তার জেএমবি জঙ্গি, হুগলিতে স্লিপার সেলের সন্ধানে তল্লাশি গোয়েন্দাদের]
যদিও রাজ্যে বর্ষা পা রাখলেও দু’-তিনদিন ধরে টানা বজ্রপাত চলছে! আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ, বর্ষার সময় কয়েকটি এলাকায় বিপরীতমুখী বায়ুস্রোতের ধাক্কায় ‘ডবল পয়েন্ট’ বা ‘ট্রিপল পয়েন্ট’ তৈরি হয়৷ এই পয়েন্টগুলিতে থাকা বায়ুকণাগুলি সঙ্ঘর্ষের ফলে তড়িদাহত হয়ে থাকে৷ ফলে বজ্রপাতকে টেনে আনে৷ বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের অফিসারদের অনুমান, শহরে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ বেড়ে যাওয়াতেই বজ্রপাতের ঘটনা বাড়ছে।
বজ্রপাতে ক্ষতি এড়ানোর উপায়?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাধারণ মানুষ সচেতন হলে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা অনেকটাই এড়ানো যায়৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই ব্যাপারে সচেতনতা নেই বললেই চলে৷ বরং বিভ্রান্তি প্রচুর৷ ‘ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসেস লাইটনিং সেফটি’ জানিয়েছে, এই সব ক্ষেত্রে ‘থার্টি-থার্টি রুল’ অনুসরণ করা উচিত৷ এই ‘রুল’ বলছে, বজ্রপাতের আলো দেখার ৩০ সেকেন্ড বা তার কম সময়ে যদি আপনি মেঘ গর্জনের শব্দ শোনেন তবে জানবেন বজ্রগর্ভ মেঘ আপনার ১০ কিমির মধ্যে রয়েছে৷ বিপদ আঁচ করার আরও একটি উপায় আছে৷ ঝড়বৃষ্টির সময় যদি আপনার মাথার চুল খাঁড়া হয়ে যায় তবে জানবেন আপনাকে ঘিরে ‘পজিটিভ চার্জ’ বাড়ছে৷ যা আপনার বজ্রাহত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বজ্রপাত এড়াতে-
- ঝড়-বৃষ্টির সময় বাড়ি থেকে বেরোবেন না৷
- সঙ্গে ধাতব পদার্থ না রাখাই ভাল৷ মানিব্যাগে থাকা খুচরো পয়সা কিংবা হাতের আংটিও বাজকে আকর্ষণ করতে পারে৷
- ঝড়-বৃষ্টির সময় খোলা জায়গায় দাঁড়াবেন না৷ তেমন হলে নীলডাউন হয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়তে হবে।
- উঁচু বাড়ি বা গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়াই ভাল৷ কারণ, উঁচু জায়গাতেই বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি৷
- সেলফোন বা ল্যাপটপের মতো সামগ্রী সঙ্গে রাখবেন না৷ সেলফোন থাকলে তা সুইচ অফ করে দিন৷
- বাড়ির ছাদে ‘আর্থিং’-এর ব্যবস্থা রাখুন৷
- বজ্রপাতের সময় জলাশয়ের ভিতরে বা আশপাশে থাকবেন না৷ এতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়ে৷
- বাড়ির ভিতরে থাকলেও টেলিফোন ব্যবহার করবেন না৷ শাওয়ারে স্নান করবেন না, কল খুলে হাত ধোবেন না৷
- দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হবে৷
- বাড়ির ভিতরে থাকা সমস্ত ইলেকট্রিক বা ইলেকট্রনিক সামগ্রী ‘আনপ্লাগ ’ করে রাখা উচিত৷
- বজ্রপাতের সময় গাড়িতে থাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ৷ তবে এই সময় গাড়ির ধাতব অংশে হাত না রাখাই ভাল৷
ছবি: শুভাশিস রায়
[রেশন পাচারের চেষ্টা, গ্রামবাসীদের তৎপরতায় উদ্ধার আটা ও গম]
The post বঙ্গে মারণমেঘের বজ্র সন্ত্রাস, নিজেকে বাঁচাবেন কেমন করে? appeared first on Sangbad Pratidin.
