ব্রিটিশ জেলাশাসকের হত্যাকাণ্ডে নাম জড়িয়েছিল। ব্রিটিশ পুলিশের চোখে তিনি ছিলেন 'ফেরার' বিপ্লবী। ঢাকা, বক্সার, হিজলি, আলিপুর ও মেদিনীপুরের জেলে কেটেছে জীবনের প্রায় ১৪ বছর। স্বাধীনতার পরে গোপীবল্লভপুর থেকে চারবার বিধায়ক হয়েছেন। পেয়েছেন স্বাধীনতা সংগ্রামীর তাম্রপত্রও। অথচ সময়ের সঙ্গে ঝাড়গ্রামের বিপ্লবী ধনঞ্জয় কর যেন বিস্মৃতির আড়ালে চলে গিয়েছেন। ৮০ তম স্বাধীনতা দিবসের আগে ধুলো ঝেড়ে সেই স্মৃতির পাতায় চোখ রাখল 'সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল'।
১৯০৫ সালের ৫ ডিসেম্বর গোপীবল্লভপুরের নয়াবসান গ্রামে জন্ম ধনঞ্জয়ের। বাবা দ্বারিকানাথ করের ব্রিটিশ-বিরোধী অবস্থান ছোটবেলা থেকেই প্রভাব ফেলেছিল তাঁর উপর। বারিপদা হাই ইংলিশ স্কুলে পড়ার সময় এই কিশোর ব্রিটিশ আধিকারিকের সামনে ইউনিয়ন জ্যাককে স্যালুট করতে অস্বীকার করেছিল। তার জন্য তাকে শাস্তির মুখেও পড়তে হয়। পরে মেদিনীপুর কলেজ থেকে স্নাতক হন ধনঞ্জয়। ১৯২২ সালে অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে যুক্ত হন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে। ১৯২৬ সালে প্রথম গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাসে যান। মেদিনীপুরের তিন ইংরেজ জেলাশাসক - জেমস পেডি, রবার্ট ডগলাস ও বার্জের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় গবেষক উদয়শঙ্কর মহন্তির দাবি, ওই তিন হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ষড়যন্ত্রী হিসেবে ধনঞ্জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে প্রমাণের অভাবে পরে মুক্তি পান তিনি।
গোপীবল্লভপুরের থানাচকের কাছে পুরনো বাজার এলাকায় ধনঞ্জয় করের আবক্ষ শ্বেতমার্বেলের মূর্তি। নিজস্ব ছবি
১৯৩৩ সালে ফের গ্রেপ্তার হন ধনঞ্জয় কর। ১৯৩৮ পর্যন্ত জেলে ছিলেন। ১৯৪০ সালের ১২ মে ঝাড়গ্রামে সুভাষচন্দ্র বসুর সভায় যোগ দেওয়ার পর ফের গ্রেপ্তার হন। মুক্তি পান ১৯৪৪ সালে। আত্মগোপনের সময়ে ছৌ নাচ শেখা থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার নানা কাহিনি এখনও গোপীবল্লভপুরে লোকমুখে ফেরে। স্বাধীনতার পরে ১৯৫১-৫২ সালে কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টির হয়ে বিধায়ক হন ধনঞ্জয়। পরে প্রজা সোশালিস্ট পার্টি এবং ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে সংযুক্ত সোশালিস্ট পার্টির হয়ে গোপীবল্লভপুর থেকে নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের স্বীকৃতিতে পান তাম্রপত্র।
১৯৮২ সালের ২৩ ডিসেম্বর মৃত্যু হয় ধনঞ্জয় কর। অথচ দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের যথাযথ মূল্যায়ন আজও হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর, তাঁর জন্মদিনেই, একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে গোপীবল্লভপুরের থানাচকের কাছে পুরনো বাজার এলাকায় বসানো হয়েছে ধনঞ্জয় করের আবক্ষ শ্বেতমার্বেলের মূর্তি। স্থানীয়দের বক্তব্য, তাঁর জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা নিয়ে আরও প্রচার হওয়া প্রয়োজন। পরিবারের কাছে থাকা তাম্রপত্র, কারাবাসের নথি ও অন্যান্য দলিলের ভিত্তিতে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হোক ঝাড়গ্রামের এই বিস্মৃত বিপ্লবীর ইতিহাস।
