সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়: তোলাবাজি ও ঠিকাদারি বন্ধ হওয়ার বদলা নিতে পুরনো বন্ধু পুরপ্রধান মনোজ উপাধ্যায়কে একটি বিয়েবাড়িতে বসে খুনের ছক কষেছিল মূল অভিযুক্ত রাজু ও রতন চৌধুরি। মনোজেরই প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সাংগঠনিক প্রতিরোধের জেরে দীর্ঘদিন এলাকাছাড়া ছিল রাজু-রতন। নিজেদের আত্মীয় জুটমিলের এক শ্রমিকের মেয়ের বিয়েতে ঘটনার দিন যোগ দিতে ভদ্রেশ্বরে এসেছিল অভিযুক্তরা। সেখানেই দেখা হয় পুরনো শাগরেদ ও দুষ্কৃতী-বন্ধুদের সঙ্গে। আলোচনায় উঠে আসে কীভাবে মনোজ ক্রমশ ক্ষমতার জাল বিস্তার করছে এবং রাজু-রতনরা উপেক্ষিত হচ্ছে। ঠিক হয়, ওইদিনই মনোজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। পুরপ্রধানকে খুনের ঘটনায় ধৃতদের জেরা করে মিলিছে এরকমই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।
জানা গিয়েছে, বিয়ে বাড়িতে খুনের ছক কষার পরেই ফোন করে কৃষ্ণা, রাজেশদের মতো এলাকার অন্য দুষ্কৃতীদের ডেকে পাঠায় দুই ভাই। যেহেতু পুরপ্রধান মনোজের পুরনো বন্ধু তথা দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ছিল রাজু-রতন, তাই মনোজের গতিবিধি পুরোটাই মুখস্থ ছিল খুনিদের। ঠিক হয়, মনোজের বাড়ি আসার আগে একটা মোড়ে ‘স্পিড ব্রেকার’-এ পুরপ্রধানের বাইক ধীর গতি হতেই হামলা চালানো হবে। সেইমতো বিয়েবাড়ি থেকে বেরিয়ে একটি মাঠ পেরিয়ে ওই স্পিড ব্রেকারের পাশে অপেক্ষা করতে থাকে আততায়ীরা। রাত পৌনে এগারোটা নাগাদ ঘটনাস্থলে বর্তমান ছায়াসঙ্গী চিন্টু দুবের বাইকে চেপে আসেন পুরপ্রধান। হামলাকারীদের একজন পুরপ্রধানের নাম ধরে ডাকে। বাইক থেকে নামেন তিনি। এরপরই কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে একে একে সাত-আটটা গুলি চালায় খুনিরা। বারাণসীতে চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের টিমের হাতে ধরা পড়ার পর প্রাথমিক জেরায় খুনের মোটিভ-প্লট এবং সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছে রাজু ও রতন চৌধুরি।
[‘পদ্মাবতী’ নিয়ে নেতাদের এত কথা কেন, কেন্দ্রকে তোপ সুপ্রিম কোর্টের]
চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার এদিন জানিয়েছেন, ভদ্রেশ্বরের শ্যামনগর জুটমিলের দশ নম্বর গেটের কাছে একটি শ্রমিক বস্তিতে বসেই এই খুনের ছক সাজানো হয়েছিল। এলাকাছাড়া থাকা রাজু-রতন সেদিনই ওই বিয়েবাড়িতে এসেছিল। এলাকায় ঢোকার সুযোগ নিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে কেটে পড়েছিল। প্রথমে ট্রেনে চেপে ভদ্রেশ্বর থেকে হাওড়া এবং পরে ট্রেন ধরে মোগলসরাই হয়ে বারাণসী চলে গিয়েছিল। পুলিশ কমিশনার আরও জানিয়েছেন, “আজই ধৃতদের বারাণসী কোর্টে তোলা হয়েছে। ট্রানজিট রিমান্ডে রাজ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে।” ভদ্রেশ্বরে ধৃতদের এনে ঘটনার পুনর্গঠনও করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
পুরপ্রধান খুনে অভিযুক্ত মূল দু’জন রতন ও রাজু একসময় মনোজের ঘনিষ্ঠ ছিল। ভদ্রেশ্বরের শ্যামনগর জুটমিলে তাদের ঠিকাদারির কাজ পাইয়েও দিয়েছিল মনোজ। কিন্তু মনোজের নাম ভাঙিয়ে মিলের মালিকের পাশাপাশি শ্রমিকদের কাছ থেকেও তোলাবাজি চালাত দুই ভাই। ঘটনার জেরে পুরপ্রধানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। এরপর এলাকায় একটি খাটাল তোলাকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরমে পৌঁছায়। খাটাল মালিকের পক্ষ নেয় রাজু-রতন। অন্যদিকে আদালত ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের নির্দেশও ছিল খাটাল তুলে দিতে হবে। স্বভাবতই পুরপ্রধানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাজু-রতনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন মনোজ। অর্থের লালসায় বাধা আসায় ক্ষিপ্ত হয়েই তারা পুরসভার চেয়ারম্যানকে খুনের ছক কষে। বারাণসী থেকে ধরা পড়া রাজু ও রতনের বাবা রামরতন চৌধুরি শ্যামনগর-ভদ্রেশ্বর লাইনের কুলি লেবার ছিলেন। তাদের আসল বাড়ি উত্তরপ্রদেশে হলেও ভদ্রেশ্বরেই থাকত তারা।
[নীলরতন থেকে নিখোঁজ মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধা, অভিযোগ গাফিলতির]
প্রাথমিকভাবে খুনের মোটিভ জানা গেলেও পিছনে আর কোনও ‘মাস্টার মাউন্ড’ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখবে পুলিশ। চেয়ারম্যানকে হত্যা করার ‘কিংপিন’ হিসাবে চৌধুরি পরিবারের এই দুই সদস্যকেই প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছিল সিআইডি ও চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেট। বারাণসীর একটি হোটেলে পাঁচ দুষ্কৃতীকে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছিল রাজু ও রতন। মোবাইলের নেটওয়ার্ক দেখে সাতজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে চন্দননগর কমিশনারেটের পুলিশের একটি বিশেষ টিম। ধৃতদের নাম রাজু চৌধুরি, রতন চৌধুরি, আকাশ চৌধুরি, রাজেশ চৌধুরি, কৃষ্ণ চৌধুরি, দেবু পাকড়ে ও সন্তোষ। বারাণসী থেকে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু তা ভেস্তে যায় পুলিশের আগাম খবরে। কমিশনার হিসাবে অজয় কুমার দায়িত্ব নেওয়ার পরই এই সাফল্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েও দেখছে প্রশাসনিক মহল।
The post বিয়েবাড়িতে বসেই তৃণমূল পুরপ্রধানকে খুনের ছক রাজু-রতনের appeared first on Sangbad Pratidin.
