বিমল হাঁসদা (প্রত্যক্ষদর্শী, বাগঘরা গ্রাম): ক’টা হবে তখন। বেলা পৌনে তিনটা। হঠাৎ বাঘের ভয়ঙ্কর এক গর্জন শুনতে পেলাম আমরা। আমরা বলতে ওই গ্রামের কয়েকজন যারা খাওয়াদাওয়ার পরে ভোট নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সকাল থেকেই বাঘের উৎপাতের খবর পাচ্ছিলাম। দু’জনকে জখমও করেছে। গর্জন শুনে বুঝতে কোনও অসুবিধা হয়নি যে বাঘটি কাছাকাছি কোথাও চলে এসেছে। ভয় লাগছিল, শিকার উৎসবে তখনও জঙ্গলে হাজার দেড়েক মানুষ। বাঘ-মানুষে টানাটানি হচ্ছে না তো! আমরা জনা কুড়ি সদস্য লাঠি সোঁটা নিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে থাকি। উদ্দেশ্য ছিল একটাই যে শিকারি দলের সদস্যদের দেখতে পেলে সাবধান করা। গ্রাম থেকে জঙ্গলের পথে আমরা তখন এক দেড় কিলোমিটার ঢুকেছি। কোথাও কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। না বাঘ দেখতে পাচ্ছি, না শিকারি দলের কোনও সদস্যকে।
[বন দপ্তরের গাফিলতির জেরে বেঘোরে প্রাণ গেল লালগড়ের রয়্যাল বেঙ্গলের?]
ফিরে যাব ভাবছি ঠিক সেই সময়ই, জঙ্গলের ভিজে মাটিতে বাঘের একটি স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম। তখন সন্দেহ আরও তীব্র হল। যে যার মতো করে এদিক সেদিক খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। ঠিক তখনই ঘন জঙ্গলের মধ্যেই মাটির উপর বাঘটিকে শুয়ে থাকতে দেখি। বাঘ দেখেই শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা হিমস্রোত বয়ে গেল। তবে কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছিলাম না। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলাম, বাঘ বাবাজি হয়তো ঘুমোচ্ছে। সকালে বুনো শুয়োর খেয়ে দুপুরে শিকারি দলের সদস্যদের আঁচড় দিয়ে হয়তো বাঘটি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাই বিশ্রাম নিচ্ছে। আমরাও অনেকক্ষণ দূর থেকে দেখতে লাগলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার পাথরের টুকরো বাঘটির দিকে ছুঁড়ে কিছু বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু বাঘটি কোনও সাড়া দিল না। তখন আমরা ধীরে ধীরে কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কাছাকাছি আসতেই দেখলাম তার মুখ দিয়ে রক্তের স্রোত সরু নালার আকার নিয়ে মাটির উপরই বয়ে চলেছে। মনে খটকা লাগল। আরও কাছে যেতেই দেখলাম মুখের নিচে বল্লম গাঁথা অবস্থায় সে পড়ে আছে। এই বল্লমগুলি শিকারিদেরই কারও। তার দেহে কোনও সাড়া ছিল না। তাকে ঘিরে রেখে খবর দিলাম বন দপ্তরকে। পরে হাজির হলেন বনকর্মীরা। তারপর উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হল প্রায় দেড় মাস ধরে এলাকার ত্রাস হিসেবে ঘোরাফেরা করা ওই বাঘটির নিথর দেহকে। খারাপ লাগছিল। বাঘটিকে তার আস্তানায় ফিরিয়ে দিতে পারলাম না আমরা, এটা বড় আফশোসের। লজ্জারও।
[দেড়মাসের বাঘবন্দি খেলা শেষ, বাগঘরার জঙ্গলে মিলল রয়্যাল বেঙ্গলের মৃতদেহ]
The post ‘বাঘটিকে আস্তানায় ফিরিয়ে দিতে পারলাম না, লজ্জায় মরা উচিত’ appeared first on Sangbad Pratidin.
