সকাল ৬টায় মেয়েকে ঘুম থেকে ডাকেন। নিজে হাতে তৈরি করেন। সন্তান বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলেছিল, "মা মনটা কেমন করছে, একটু জল দাও।" জলও খাইয়ে দিয়েছিলেন মা। তার ঠিক মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সব শেষ। চোখের জল মুছতে মুছতে বারবার একই কথা বলে যাচ্ছেন মুর্শিদাবাদে পুলকারে ট্রেনের ধাক্কায় মৃত জেসিকা শবনমের মা। জ্ঞানও হারাচ্ছেন মাঝেমধ্যেই।
মুর্শিদাবাদের দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পুলকার। নিজস্ব চিত্র
মুর্শিদাবাদের গোবিন্দপুরের বাসিন্দা জেসিকা। বছর নয়েকের খুদে পড়ুয়া যদুপুর রয়্যাল অ্যাকাডেমির তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বাড়িতে বাবা-মা ছাড়াও রয়েছে ছোট বোন। প্রতিদিন মায়ের এক ডাকে ঘুম থেকে উঠে পড়ত। স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি করে দিতেন মা। সকাল ৬টায় বেরিয়ে পড়ত সে। বাড়ির অদূরে দাঁড়িয়ে থাকত পুলকার। মা বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতেন ঠিকমতো উঠেছে কিনা। ছোট্ট মেয়ে নাকি কোনও কোনওদিন ফের মাকে দেখতে বাড়ির সামনে আসত। তারপর দৌড়ে গিয়ে পুলকারে উঠে পড়ত। মা বাড়িতে ঢুকে কাজ শুরু করতেন। শুক্রবার সকালে মেয়ে বেরনোর সময় বলেছিল, "মনটা কেমন করছে, একটু জল দাও।"
নিহত ও আহত পড়ুয়াদের স্কুলব্যাগ ও জলের বোতল। নিজস্ব চিত্র
জল খেতে স্কুলের পথে রওনা দেয়। মায়ের কথামতো এদিন আর দ্বিতীয়বার মাকে দেখতে আসেনি সে। মেয়েকে পুলকারে উঠতে দেখে কাজ শুরু করতে যান মা। সেই সময় শোনেন বহরমপুরের কর্ণসুবর্ণ ও গোবিন্দপুর স্টেশনের মাঝে লেভেল ক্রসিং পারাপারের সময় পুলকারে ট্রেনের ধাক্কার কথা। এক কাপড়ে বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরন। পথে বারবার খোঁজ নেন পুলকারটি কেমন। লাল রঙের শুনে মনে কু ডাকতে থাকে। টোটোচালককে বলেন ঘটনাস্থলে নিয়ে যেতে। পৌঁছে মেয়েকে দেখতে পান না। আরও উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মরদেহর উপর থেকে সাদা কাপড় সরিয়ে নিজে হাতেই মেয়ের দেহ দেখেন। বারবার ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন জেসিকার মা। তার বাড়িতে ভিড় পাড়া-প্রতিবেশীদের। হাজার সাত্ত্বনাতেও চোখের জল বাঁধ মানছে না তাঁর।
