বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে একের পর এক ভূমিকম্প (Earthquake) অনুভূত হয়েছে সিকিমে। কম্পন অনুভূত হয়েছে উত্তরবঙ্গের (North Bengal) দার্জিলিং, কালিম্পং ও শিলিগুড়িতেও। কেঁপেছে নেপাল ও চিনের একাংশ। অন্তত ১২ বার সিকিমের মাটি কেঁপেছে। আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ বাসিন্দা-সহ পর্যটকদের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে কতটা বিপদের মধ্যে রয়েছে শৈলশহর দার্জিলিং-সহ গোটা উত্তরবঙ্গ? ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় আগামী দিন ধসের কবলে পড়বে না তো বিস্তীর্ণ এলাকা?
ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের (বিআইএস) প্রকাশিত দেশের নতুন আপডেট সিসমিক জোনেশন ম্যাপে দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এবং সিকিমের সমস্ত জেলা-সহ পুরো হিমালয় অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জোন সিক্স-এ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে রিখটার স্কেলে ৮ থেকে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন ম্যাপের সংশোধনীটি ফল্ট-লাইন ম্যাপিং এবং টেকটোনিক স্ট্রেস বিশ্লেষণের মতো উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এটা মূলত অতীতের ভূমিকম্প রেকর্ডের উপর নির্ভরশীল। এই নতুন শ্রেণীবিভাগ এই অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছে। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, মিরিক, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, সিকিমের গ্যাংটক, মঙ্গন, নামচি এবং অন্য শহরগুলিকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তালিকাভূক্ত হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দা এবং কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার, দুর্যোগ প্রোটোকল সম্পর্কে অবগত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
সান্দাকফু এলাকা। ফাইল চিত্র
প্রসঙ্গত ১৯৬২ সালে প্রথম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা নিয়ে ম্যাপিং করেছিল বিআইএস। মোট পাচটি বিভাগে ওই সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই সময় দার্জিলিং থেকে সিকিম সিসমিক জোন ফোর-এ ছিল। অর্থাৎ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু ২৮ নভেম্বর বিআইএস মোট ছয়টি ভাগে ওই সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে দেখা যাচ্ছে হিমালয় ও সংলগ্ন এলাকার পুরোটাই বিপজ্জনক। অর্থাৎ সিসমিক জোন সিক্সে-এ দাঁড়িয়ে আছে। গোদা বাংলায় পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্স অতি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। স্বভাবতই বৃহস্পতিবার মাঝ রাতে রীতিমতো ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে সিকিমে। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তরের সিকিম কেন্দ্রের অধিকর্তা গোপীনাথ রাহা বলেন, "মৃদু থেকে মাঝারি ভূমিকম্প হলেও সাধারণ মানুষ খুবই আতঙ্কিত ছিলো।" ধারাবাহিকভাবে ১২ বার মাটি কেপে ওঠায় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, মিরিক, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, সিকিমের গ্যাংটক, মঙ্গন, নামচি এবং অন্য শহরগুলি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তালিকাভুক্ত।
কিন্তু কতটা বিপদের মধ্যে রয়েছে পাহাড়? নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা হিসেবে পরিচিত হিমালয় পর্বতমালা এখনও উচ্চতায় বাড়ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। হিমালয়ের কার্যত কোলেই রয়েছে দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং-সহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। অতীতেও বহু বার ভূমিকল্প অনুভব হয়েছে এইসব এলাকায়। কিন্তু একরাতে ১২ বার মাটি কেঁপে ওঠায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে খবর। চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূগোলের গবেষক মধুসূদন কর্মকার বলেন, "পাহাড়ে অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে প্রচুর রাস্তা হয়েছে। গার্ড ওয়ালের ব্যবস্থা না করে রাস্তা তৈরি করায় ফাটল বেড়েছে। এমনিতেই হিমালয়ের এই অংশ অত্যন্ত নবীন। এখানকার মাটি, পাথর নরম। ঝুরঝুরে। সেখানে ছয়-সাত তলা বাড়ি উঠছে। হোটেল হচ্ছে। পরিনতিতে বিপদ বেড়েছে।"
ফাইল চিত্র।
তিনি আরও জানান, হিমালয় ও তার পাদদেশ ইন্ডিয়ান প্লেটের উপর রয়েছে। এর ঠিক বিপরীতে রয়েছে ইউরেশিয়ান প্লেট। প্রতি বছর ইন্ডিয়ান প্লেট পাঁচ সেন্টিমিটার করে উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেটকে ঠেলছে। ওই ধাক্কার ফলে বিপদ ঘনীভূত হয়েছে৷ তবে শুধু দার্জিলিং, কালিম্পং, সিকিম নয় রিখটার স্কেলে ৬-এর উপরে ভূমিকম্প হলে শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি সহ উত্তরের প্রতিটি শহর-গ্রাম বিধ্বস্ত হবে। কারণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ সর্বত্র চলছে। এই এলাকায় এমনিতেই দোতলার উপরে বাড়ি নির্মাণ ঠিক নয়। প্রাচীনকাল থেকে এখানে একের পর এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছে। যে কারণে ব্রিটিশরা কাঠের নির্মাণ শৈলী বেছে নিয়েছিল। চুন-সুড়কি দিয়ে ইটের গাথনি হলেও সেটা দ্বি-তলের বেশি ছিল না। ছাদের পরিবর্তে ছাউনি হিসেবে টিনের ব্যবহার ছিল। এখন ওই নিয়ম পাহাড়েও কেউ মানছে না বলে অভিযোগ।
দার্জিলিং হিমালয়ে এই মুহুর্তে জনসংখ্যা বৃদ্ধি লাগামহীন। ১০.৬০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দার্জিলিং শহরের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১ হাজার মানুষের বসবাস। দশতলা পর্যন্ত বাড়ি, হোটেল মাথা তুলেছে! পাইন, ফার, দেবদারুর জঙ্গল ধ্বংস করে রিসর্ট গড়ে উঠছে বলে অভিযোগ। স্বভাবতই রিখটার স্কেলে ৮-৯ মাত্রায় ভূমিকম্প হলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে, সেটা ভেবে রীতিমতো আতঙ্কে ভুগছেন দার্জিলিং পুরসভার চেয়ারম্যান দীপেন ঠাকুরি।
