সুরজিৎ দেব, ডায়মন্ড হারবার: স্বামীর মৃত্যুর পরও তাঁকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেননি কেউ। বছর সাতেকের একমাত্র ছেলেকে আঁকড়ে অনেক স্বপ্ন নিয়ে হাল ধরেছিলেন সংসারের। ভেবেছিলেন ছেলের লেখাপড়া, বিয়ে দেওয়া, এসব নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু হঠাৎই আবার একদিন সংসারে নেমে এল দুশ্চিন্তার মেঘ। কঠিন অসুখে আক্রান্ত ছেলে মৃত্যুশয্যায়৷ এই দুঃসময়ে নাতিকে নিয়ে ঘর ছেড়েছেন পুত্রবধূও। ডায়মন্ড হারবারে চায়ের দোকান চালিয়ে অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করছেন বছর পঞ্চান্নর পুতুল দলুই। কোনওমতে দিন গুজরান হচ্ছে তাঁর।
[আরও পড়ুন: কার্যত চমকহীনভাবেই রাজ্যে দ্বিতীয় দফার প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করল বিজেপি]
আঠারো বছর আগে মারা গিয়েছেন দুর্বাচটির পশ্চিম সুরেন্দ্রনগরের বাসিন্দা মহেশ্বর দলুই। স্বামীর মৃত্যুর পর সাত বছরের পুত্র তপেশ্বরকে নিয়ে যেন অথৈ জলে পড়েছিলেন পুতুলদেবী। এর ওর কাছে সাহায্য চেয়ে সে যাত্রা কোনওক্রমে সামলে নিয়েছিলেন। টালির চালের বাড়ি লাগোয়া চায়ের দোকান চালিয়েই বড় আদরের তপেশ্বরকে পাঠিয়েছিলেন স্কুলে। তবে ছেলে মাধ্যমিক পাশ করার পর আর তার লেখাপড়ার ভার টানতে পারেননি প্রৌঢ়া। কিন্তু ভেঙে পড়েননি একটুও। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চায়ের দোকান চালিয়েই সংসারটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন পুতুলদেবী। বাইশ বছর বয়সে ছেলের বিয়ে দেন। বছর দু’য়েকের মধ্যে নাতিরও মুখ দেখেন প্রৌঢ়া। আর্থিক অনটনের মধ্যেও মোটামুটি সুখে-শান্তিতেই দিন কাটছিল দলুই পরিবারের। কিন্তু কোথা থেকে যে আবার কী হয়ে গেল! চোখের জল যেন আর বাঁধ মানছিল না তাঁর। আঁচলের খুঁট দিয়ে লুকিয়ে দু’চোখের কোল মুছে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিলেন যেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কাঁদতে কাঁদতেই জানালেন ছেলের কঠিন অসুখের কথা।
[আরও পড়ুন: ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোচবিহারের বিজেপি প্রার্থী, মনোনয়ন বাতিলের দাবি তৃণমূলের়়]
বৃদ্ধা পুতুলদেবীর কথায়, “সুখে শান্তিতেই চলছিল। কিন্তু ওপরওয়ালা এতোই নিষ্ঠুর যে আমার এই সুখটুকুও তাঁর বেশিদিন সহ্য হল না! পঁচিশ বছরের ছেলেটা ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার বলল, ওর নাকি দু’টো কিডনিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখনই ভাল জায়গায় চিকিৎসার দরকার। কিন্তু বড় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই আবার সাহায্য চাইলাম প্রতিবেশীদের কাছে। তাঁদের মাধ্যমে স্থানীয় বিধায়ক সমীর জানা ও পরবর্তীকালে মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরার সঙ্গে যোগাযোগ করি। মূলত তাঁদের চেষ্টাতেই নবান্ন পর্যন্ত ছেলের চিকিৎসার জন্যে দরবার করি। মমতাদিদি আমার আবেদন শুনেছেন। দু’দফায় এক লক্ষ দশ হাজার টাকা সরকারের কাছ থেকে পেয়েওছি। কিন্তু চিকিৎসা করাতেই প্রায় সব টাকা শেষ। জানি না, ছেলেটা শেষপর্যন্ত বাঁচবে কিনা।”
[আরও পড়ুন: লড়াই কঠিন বুঝেই অচেনা কেন্দ্রে জনসংযোগে জোর বিজেপি প্রার্থী অনুপমের]
চিকিৎসকরা বৃদ্ধাকে জানিয়েছেন, তপেশ্বর অ্যাকিউট রেনাল ফেলিওরে ভুগছে। ডায়ালিসিস চলছে, তবে খুব একটা উন্নতি যে হচ্ছে বলা যাবে না। কিডনি প্রতিস্থাপন জরুরী। আর এসব শুনেই মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা প্রৌঢ়ার। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “কোথা থেকে পাবো অত টাকা! চোখের সামনে তাহলে কি ছেলের মৃত্যুও দেখতে হবে?” মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বৃদ্ধা মায়ের তাই করুণ আর্তি, “মমতাদিদি তুমি আমার জন্যে এত করলে আর একটু যদি করো। আমার একমাত্র ছেলেটাকে বাঁচিয়ে তোলার দায়িত্ব তুমি নাও। তুমিই পারো ওকে সুস্থ করতে, তুমিই যে আমার ভগবান।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চই তাঁকে ফেরাবেন না, এই আশাতেই দিন গুনছেন প্রৌঢ়া৷
The post ‘ আমার ভগবান তুমিই’, অসুস্থ ছেলেকে বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কাতর আরজি প্রৌঢ়ার appeared first on Sangbad Pratidin.
