চার দেওয়াল ঘেরা আদালত নয়। প্রকৃতির মাঝে এ এক অন্য 'কোর্ট'! কথাটা খানিকটা অদ্ভুত ঠেকছে না? কিন্তু এটাই যে সত্যি। বছরে একটা দিন এমন 'আদালত' বসে প্রকৃতির মাঝে। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন সেন্দ্রা উৎসবে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের সুতান টান্ডিতে। শুক্রবার সেই ছবির ব্যতিক্রম হল না ওই পাহাড়ে। সেন্দ্রা উৎসবে। যার আক্ষরিক নাম 'ল' বীর-বাইসি'। সাঁওতাল সমাজের নানান ঝুট-ঝামেলা, সমস্যার নিষ্পত্তি হয় এই বিচার ব্যবস্থায়। যেখানে 'বিচারক'-র ভূমিকায় থাকেন ওই সমাজের মোড়ল বা কর্মকর্তারা।
পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে সেন্দ্রা উৎসবে শামিল হওয়া মানুষ। ছবি: অমিতলাল সিং দেও
প্রকৃতির মাঝে এই কোর্ট সেন্দ্রা উৎসবের আওতায়। বহু বছর ধরে যা চলে আসছে এই পাহাড়ে। এতটায় প্রাচীন সেন্দ্রার এই বিচার ব্যবস্থা। সেন্দ্রায় বন্যপ্রাণ হত্যা রুখতে হিউমেন কমিটির সদস্য তথা ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহলের জিলা পরগনা রতনলাল হাঁসদা বলেন, "সাঁওতালি শব্দ সেন্দ্রা-র বাংলা অর্থ বহুবিধ। অনুসন্ধান, খোঁজ এমনকি শিকার। তবে বুদ্ধ পূর্ণিমায় কোন প্রাণী হত্যা নয়। জঙ্গল ও বন্যপ্রাণকে রক্ষা করে উৎসবে শামিল হওয়া।" হাই কোর্টের যে নির্দেশ রয়েছে রক্তপাতহীন সেন্দ্রার। তাই প্রশাসন, বনদপ্তর এমনকি জেলা ও দায়রা জজের নজরদারিতে এই উৎসব সুষ্ঠু ভাবে হয়। অযোধ্যা পাহাড়ে হাজির হয়ে পুরুলিয়া আদালতের জেলা ও দায়রা জজ সন্দীপ চৌধুরি জানান " রক্তপাতহীন সেন্দ্রা পালিত হয়েছে। কোথাও কোন বন্যপ্রাণ হত্যা হয়নি। মানুষ উৎসবে শামিল হন।"
সেন্দ্রা উৎসবে শামিল হওয়া মানুষজন। শুক্রবার পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে। ছবি: অমিতলাল সিং দেও
তাই অযোধ্যা পাহাড়ে এদিন ভোরের আলো ফুটতেই শোনা যায় কিন্দরির সুর। ছাতনি গ্রামের ৭৬ বছরের নবীন হেমব্রম পিঠে তীর-ধনুক নিয়ে উৎসবে মিশে যান। জঙ্গলে যাওয়ার পথে শুক্রবার সাতসকালে পাহাড়ি রাস্তায় কিঁদরির সুর তোলেন তিনি। ওই গ্রামের ৬৫ বছরের মহেশ্বর হেমব্রম এই প্রাচীন উৎসবের কথা নতুন প্রজন্মকে জানাতে তার পাঁচ থেকে সাত বছরের তিন নাতনিকে নিয়ে জঙ্গলে যান। মহেশ্বরের কথায়, "বুদ্ধ পূর্ণিমায় সেন্দ্রায় অংশ নেওয়া আমাদের বহু প্রাচীন রীতি। সেই রীতি নতুন প্রজন্মকে জানাতেই আমি নাতিদেরকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলে যাচ্ছি। "
সেন্দ্রা উৎসবে শিঙা। শুক্রবার পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে। ছবি: অমিতলাল সিং দেও
পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার কুরচিডাঙ্গা থেকে ৫০ জনের দল এই পাহাড়ে পা রাখেন। তাদের কথায়, " শিকার নয়। জঙ্গলে যাওয়ার প্রাচীন রীতিটাই আমাদের কাছে প্রধান। এরপর জঙ্গলে গিয়ে যদি কোন বন্যপ্রাণের মুখোমুখি হই তাহলে আত্মরক্ষার্থে আমাদের মোকাবিলা করতেই হবে। " শুক্রবার ভোররাতে জঙ্গলে গিয়ে সাতটি হাতির মুখোমুখি পড়ে যান ওই গড়বেতার ৩৪ জনের একটি দল। ওই দলের সদস্য তপন কোটাল বলেন, " আমরা এদিন একেবারে সকালের দিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠছি। আর সাতটি হাতির দল জল খেয়ে নিচে নামছে। একেবারে মুখোমুখি হয়ে যাই । কোনক্রমে উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে আমরা প্রাণ বাঁচাই। "
সেন্দ্রায় প্রশাসনের বার্তা ছিল একটাই, সুষ্ঠুভাবে উৎসব পালন করুন। তাই এই উৎসবে শামিল হতে আসা মানুষজন বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে গেলেও তাদেরকে বাধা দেওয়া হয়নি। জঙ্গলে ঢুকে পটকা ফাটালেও কড়া নজরদারির মধ্যে ছিলেন তারা। এদিন প্রশাসনের স্লোগানই ছিল, " শিকার নয়। উৎসবে অংশ নিন।" তাই আদিবাসী মানুষজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যেমন শিঙা বাজিয়েছেন। তেমনই বাজিয়েছেন বাঁশি। সবে মিলিয়ে একেবারে রঙিন হয়ে যায় এই উৎসব।
