সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে রমজান অত্যন্ত পবিত্র একটি মাস। নবাবি আমলে সমগ্র রমজান মাস জুড়ে মুর্শিদাবাদ শহর খুশিতে মেতে উঠত। আজ সেই নবাবি আমল নেই। অর্থাভাবে খাওয়া-দাওয়ায় কিছু কাটছাঁটও করতে হয়েছে। তবে ইফতারের আমেজ আজও একই রকম। আহারে-বাহারে, মেজাজ-মর্জিতে আজও যেন ঝলমলিয়ে উঠে নবাবি আমল।
[ শহরে সম্প্রীতির ছবি, ইফতারের এলাহি আয়োজন দুর্গাপুজো কমিটির ]
এককালে নবাবি আমলে রমজান মাসে মুর্শিদাবাদের চেহারাটাই যেন বদলে যেত। দরিদ্র আম-আদমিও দুবেলা পেট পুরে শাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতেন। বছরভর অবশ্য তা সম্ভব ছিল না। কিন্তু রমজান উদারতার মাস। দানের লগ্ন। খোলা মনে নবাবরাও তাই দান করতেন হাত খুলে। নবাবদের বক্তব্য ছিল, সারা বছর দুবেলা ভাল করে খেতে না পাওয়া মানুষগুলো রমজানের একটা মাস অন্তত শাহী খাবারের স্বাদগ্রহণ করুক। নবাবি আমলের সন্ধ্যা নামলেই রাজধানী মুর্শিদাবাদ ভরে উঠত শাহী খাবারের হরেক পদের সুবাসে। প্রতিটি বাড়ি এবং মসজিদে প্রতিদিন আয়োজন করা হত ইফতারের। সে আমলে সকল রোজাদারদের খাওয়াতে খোলা হত লঙ্গরখানা। সেখান থেকেই পরিবেশন করা হত শাহী খাবার।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, নবাব মীরজাফরের পত্নী মুন্নি বেগম ছিলেন খুব দয়ালু। তিনি প্রচুর দান-ধ্যানও করতেন। তাঁর নির্মিত চক মসজিদে রোজাদারদের ইফতার করাতেন তিনি। পরে নবাব হাসান আলি মির্জার আমলে নতুন এক প্রথা শুরু হল। নবাবের পুত্র মুর্শিদাবাদের দ্বিতীয় নবাব বাহাদুর ওয়াসিফ আলি মির্জা ইংল্যান্ডে পড়ার সময়ে রোজা রাখতে পারতেন না। পরিবর্তে রমজান মাসে প্রতিদিন ৬০ জন রোজাদারকে দুই বেলা খাওয়ানো হত। পরবর্তী সময় ওয়াসিফ আলি মির্জা দেশে ফিরে রোজা রাখলেও তিনি তাঁর পিতার প্রচলিত নিয়ম বজায় রাখেন। কী কী থাকত সেই নবাবি ইফতারে? বাংলা গ্রীষ্মপ্রধান হওয়াতে শরবত দিয়েই শুরু হত ইফতার পর্ব। শরবত তৈরিতে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হত দুধ। এর সঙ্গে থাকত নানান রসালো ফলের নির্যাস, নানা ধরনের বাদাম, কিশমিশ, পেস্তা, জাফরান প্রভৃতি। এছাড়াও তোকমার শরবত, বেলের শরবত, বেদানার শরবত, লেবু ও তেঁতুলের শরবতও তখন থেকেই জনপ্রিয় ছিল। শরবতের পাশাপাশি থাকত ঠান্ডা ও সুমিষ্ট ফালুদা এবং ফিরনি-সহ আরও নানা ধরনের মিষ্টি। বিভিন্ন সুস্বাদু ভাজাভুজি, কখনও রুটি-মাংস। কথিত আছে, নবাবি আমলে রাতের নমাজের পর প্রতিদিনই রোজাদারদের বিরিয়ানি খাওয়ানো হত।
বর্তমানে মুর্শিদাবাদের নবাব রয়েছেন বটে, কিন্তু সেই নবাবি জৌলুস আর নেই। নেই আগের মতো প্রভাব প্রতিপত্তিও। তবু মুর্শিদাবাদ নিজামত পরিবারের সদস্যরা নবাবি আমলের বিভিন্ন পুরানো প্রথা ও রীতি-নীতি ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।তাই আজও রমজান মাসে চক মসজিদে রমজান মাসের ৩০ দিনই ইফতারের আয়োজন করা হয়। এবং ইফতারের সমস্ত খরচ বহন করে মুর্শিদাবাদ এস্টেট। তবে ইফতারের মেনু আগের মতো নয়।বর্তমানে আগের থেকে খাবারের পরিমাণ এবং গুণগতমান অনেকটাই কমে গিয়েছে, মূলত অর্থাভাবের কারণে। কিন্তু নয় নয় করেও আজ যা পদ থাকে তাও চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। বর্তমানে ইফতারের থালায় খেজুর, আপেল, কলা, ছোলা ভেজা, মটর ভেজা, ছোলার ঘুগনি ও মুড়ি থাকে।এছাড়া থাকে এক বিশেষ পদ কাচালু। চক মসজিদে ইফতার শেষ হলে সেহরির জন্য রোজাদারদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নাদ রুটি। সঙ্গে দেওয়া হয় ঘি দিয়ে রান্না করা ডাল। আবার কোনও দিন থাকে আলু কোর্মা। এখনও রমজান মাসের বিশেষ দিনগুলিতে রোজাদারদের জন্য শাহী বিরিয়ানির ব্যবস্থা থাকে। আজ রাজধানী মুর্শিদাবাদের সেই নবাবী প্রতিপত্তি না থাকলেও রমজান মাসের প্রতিটি সন্ধ্যায় রোজাদারদের সমাগমে শতাব্দী প্রাচীন মসজিদ চত্বরে যেন ফিরে আসে নবাবি আমলের মেজাজ।
তথ্য ও ছবি- ফারুক আবদুল্লাহ
The post জানেন, এখন কীভাবে মুর্শিদাবাদে আয়োজন হয় নবাবি ইফতারের? appeared first on Sangbad Pratidin.
