ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফুটে ওঠেনি। বাঁকুড়ার মাজদিয়া গ্রামের পুরনো বটগাছটার নিচে দাঁড়ালেই মনে হয়, গাছটা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ডালে ডালে ঝুলে থাকা হাজার হাজার বাদুড় একসঙ্গে ডানা ঝাপটালে হালকা শোঁ শোঁ শব্দ। পাশেই দাঁড়ানো আশি ছুঁইছুঁই নরেন হাঁসদা হেসে বলছেন, “এরা আমাদের সঙ্গে বড় হয়েছে। ভয় পাওয়ার কী আছে?” নিপা ভাইরাস নিয়ে যখন চারদিকে উদ্বেগ, বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের প্রত্যন্ত মাজদিয়া গ্রামে তখন অন্য ছবি। এখানে বাদুড় মানে আতঙ্ক নয়, এরা যে সব গ্রামেরই বাসিন্দা। কবে থেকে? সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কেউ জানেন না। নরেনবাবুর কথায়, “আমার দাদুর মুখেও শুনেছি, এই গাছেই বাদুড় ঝুলত।”
নিপা ভাইরাস নিয়ে যখন চারদিকে উদ্বেগ, বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের প্রত্যন্ত মাজদিয়া গ্রামে তখন অন্য ছবি। এখানে বাদুড় মানে আতঙ্ক নয়, এরা যে সব গ্রামেরই বাসিন্দা।
গ্রামের শাল, কদম, অশ্বত্থ আর বটগাছই বাদুড়দের আশ্রয়। দিনের বেলায় নিশ্চিন্তে ঝুলে থাকা, সন্ধে নামলেই উড়ে যাওয়া - ওদের এই রোজনামচায় মানুষ অভ্যস্ত। গৃহবধূ লীলা সোরেন বললেন, “ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। তাই ভয় লাগে না। ওরা নিজের মতো থাকে, আমরাও।” এই অভ্যাস তৈরি করেছে এক অলিখিত নিয়ম - বাদুড়কে বিরক্ত করা চলবে না। গ্রামের যুবক কার্তিক মুর্মু জানালেন, “কেউ ওদের দিকে ঢিল ছুড়লে আমরা বাধা দিই। বাইরের লোক ধরতে এলে ফেরত পাঠাই।” একসময় চোরাশিকারিরা বাদুড় ধরতে এলে রাত জেগে পাহারা দেওয়ার গল্পও এখনও শোনা যায় মাজদিয়ায়।
বাদুড় থেকেই নিপা সংক্রমণ বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের।
নিপা নিয়ে সতর্কতার বার্তা অবশ্য গ্রামেও পৌঁছেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়া বন্ধ হয়েছে, আধাখাওয়া ফল ফেলে দেওয়া হচ্ছে, বাদুড়ের আশ্রয়ের খুব কাছে অযথা ভিড় এড়ানো হচ্ছে। স্কুলশিক্ষক অমল মাহাতো বললেন, “ভয় নয়, সাবধানতাই আসল।” জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শ্যামল সরেনও একই কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্য, “নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রে অযথা আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক নয়। বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হতে পারে, কিন্তু সরাসরি সংক্রমণ এড়াতে কিছু নিয়ম মানলেই ঝুঁকি অনেকটাই কমে। আধাখাওয়া ফল বা কাঁচা খেজুরের রস এড়াতে হবে, অসুস্থ বা মৃত বাদুড় কখনও স্পর্শ করা যাবে না। কোথাও উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ জরুরি।”
নিপা নিয়ে সতর্কতার বার্তা গ্রামেও পৌঁছেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়া বন্ধ হয়েছে, আধাখাওয়া ফল ফেলে দেওয়া হচ্ছে, বাদুড়ের আশ্রয়ের খুব কাছে অযথা ভিড় এড়ানো হচ্ছে।
পাশাপাশি তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বাদুড় নিধন কোনও সমাধান নয়। এতে পরিবেশের ক্ষতি হয়।” পঞ্চায়েত সূত্রে জানা গিয়েছে, বনদপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এভাবে নিপা আবহে বাদুড় তাড়ানোর বদলে তাদের আগলে রেখেও গ্রামবাসীরা যে সচেতনতার বার্তা দিচ্ছেন, সেটা সত্যিই শিক্ষণীয়। পরিবেশ রক্ষা এবং ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছেন গ্রামবাসীরা।
