দার্জিলিং চায়ের 'জিআই' তকমা রক্ষায় কঠোর আইনি নজরদারি। নেপালের নিম্নমানের চা দার্জিলিং চা ব্র্যান্ডের মতো চালানোর 'জালিয়াতি' রুখতে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ। আজ, শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাতে প্রকাশিত বিজেপির নির্বাচনী সংকল্পপত্র। সেখানে উত্তরবঙ্গের চা বাগানের উন্নয়ন, চা শ্রমিকদের জীবন ও মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে একাধিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উল্লেখিত আশ্বাসে নতুন কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না উত্তরের চা বণিকসভাগুলি! আধিকারিকদের পালটা বক্তব্য, দার্জিলিং চায়ের গৌরব রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন থেকে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকে ওইসব দাবি জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। পরিণতিতে চায়ের উৎপাদন তলানিতে পৌঁছে গিয়েছে।
দার্জিলিং পাহাড়ে জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত ৮৭টি চা বাগান রয়েছে। তার মধ্যে অন্তত ১৫টি এখন বন্ধ। বাকিগুলোতে এক-দেড়শো বছরের পুরনো গাছ বেশি। তাই উৎপাদন কমছে। কিন্তু লোকসান বেড়ে চলায় পুরনো গাছ উপড়ে নতুন গাছ বোনার কথা কেউ ভাবতে পারছে না। ওই পরিস্থিতিতে অন্তত ২৫ জন মালিক চা বাগান বিক্রির খদ্দের খুঁজছেন! নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি তথা চা বাগান মালিক সতীশ মিত্রুকা বলেন, "আমি নিজেই খদ্দের খুঁজে বেড়াচ্ছি। পাচ্ছি না। কেউ বাগান কিনতে রাজি হচ্ছে না।" তিনি আরও জানান, গত দু'দশকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টি কমেছে দার্জিলিং পাহাড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরে 'সিলভার নিডেল হোয়াইট টি'-সহ দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন গত সাড়ে পাঁচ দশকে উদ্বেগজনকভাবে কমেছে।
দার্জিলিং পাহাড়ে জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত ৮৭টি চা বাগান রয়েছে। তার মধ্যে অন্তত ১৫টি এখন বন্ধ। বাকিগুলোতে এক-দেড়শো বছরের পুরনো গাছ বেশি। তাই উৎপাদন কমছে। কিন্তু লোকসান বেড়ে চলায় পুরনো গাছ উপড়ে নতুন গাছ বোনার কথা কেউ ভাবতে পারছে না। ওই পরিস্থিতিতে অন্তত ২৫ জন মালিক চা বাগান বিক্রির খদ্দের খুঁজছেন!
চা বণিকসভাগুলি সূত্রে জানা গিয়েছে, দার্জিলিং পাহাড়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দু'মাস 'ফার্স্ট ফ্লাশ'-এর পাতা তোলা হয়। ওই পাতা থেকে অন্তত দুই মিলিয়ন কেজি চা তৈরি হয়। এটা মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। এটাই মরশুমের সেরা দার্জিলিং চা। সেটা জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টির অভাবে পাতা মিলছে না। ওই কারণে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে চা উৎপাদন পুরোপুরি মার খাচ্ছে। ১৯৭০ সালে উৎপাদন ছিল ১৪ মিলিয়ন কেজি, সেখান থেকে ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৫.৫১ মিলিয়ন কেজিতে। কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন নেপাল ও কেনিয়া থেকে নিম্নমানের চা আমদানি নিয়ে প্রতিবাদ করে যাচ্ছি। কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও দরবার করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি।"
প্রতীকী ছবি।
ওই সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, নেপাল থেকে শুল্ক ছাড়াই বছরে ১১ মিলিয়ন কেজি সিটিসি এবং ৫ মিলিয়ন কেজি অর্থডক্স চা ভারতে ঢুকছে। নেপালের সস্তা এবং গুণমানে খারাপ। চা শিলিগুড়ির বাজারে ঢোকার পর এক শ্রেণির ব্যবসায়ী দার্জিলিং চা হিসেবেও বিক্রি করছেন। ফলে একদিকে যেমন দার্জিলিং চায়ের গৌরব ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অন্যদিক, উত্তরবঙ্গের ২১০টি বটলিফ কারখানায় উৎপাদিত সিটিসি এবং অর্থডক্স চায়ের বাজারে সংকট ঘনিয়েছে। ২০২৫ সালে নেপালের চায়ের ৪৩টি নমুনার মধ্যে ২২টি ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার পরীক্ষায় ফেল করেছে।
বিজয়বাবু বলেন, "দার্জিলিং চায়ের গৌরব রক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে প্রকাশিত বিজেপির সংকল্পপত্রে, যা বলা হয়েছে, সেটি কার্যকরী হলে ভালো।" বলা হয়েছে, পুরনো বাগানগুলো চাঙ্গা করতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে উচ্চ ফলনশীল চারা রোপণ করা হবে। রাসায়নিক কীটনাশক মুক্ত পরিবেশবান্ধব চা উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। চা রপ্তানি সম্প্রসারিত করতে বিশেষ রপ্তানিকেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে গুণগতমান যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী চা বাগানগুলোকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, "এসব দাবি অনেক আগে থেকেই কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রককে বারবার জানানো হচ্ছে। ভালো লাগছে আমাদের দাবিগুলো নির্বাচনী ইস্যু হতে দেখে।"
