ব্যক্তি নয়, দলের নীতিই প্রচারের মুখ। এই আদর্শ থেকে কী ক্রমশ সরে আসছে সিপিএম? কুলটির নিয়ামতপুরের মেলায় সিপিএমের স্টলে দেখা মিলল ব্যতিক্রমী দৃশ্য। কফি মগ থেকে চাবির রিং বা টি শার্টে দেখা মিলল এরাজ্যের সিপিএম নেতা বা বাম মনোভাবাপন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের ছবি। একসময় মিডিয়ার প্রচারে উঠে এসেছিল ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলেই তাঁর নিজেরই কার্যত ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সিপিএমের সোশ্যাল মিডিয়ার পেজগুলিতে বা পোস্টারে ক্যাপ্টেন আখ্যা দিয়ে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের ছবি নিয়ে বিতর্ক বেঁধেছিল। যদিও আলিমুদ্দিনের কর্তাদের দাবি ছিল, দল নয় ভোটারদের একাংশ 'ব্যক্তিপুজো' করছে।
বর্তমান সময়ের বামপন্থী যুব সমাজ, বা বলা চলে বামেদের যুব নেতৃত্ব মনে করছে, পাল্টানো প্রয়োজন! তাই এবার পালতে গেল প্রাচীন চিন্তাভাবনার বামেদের ‘প্রোগ্রেসিভ বুক স্টল’! সেখানেও মানুষকে আকর্ষিত করতে নিয়ে আসা হল এবার মুখের ছবি। বিভিন্ন মেলায় বামেদের প্রোগ্রেসিভ বুক স্টল বা প্রগতিশীল বইয়ের দোকান সবারই চেনা। এই দোকানে কার্যত বামপন্থীরা বিভিন্ন তত্ত্বমূলক বই বিক্রি করেন। উদ্দেশ্য, মানুষের মধ্যে বামপন্থী চেতনাকে আরও উদ্বুদ্ধ করা এবং অবশ্যই মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বৃদ্ধি করা। সূত্রের খবর, কয়েক বছর ধরে বামপন্থীরা নিজেরাই অনুভব করছিলেন, প্রোগেসিভ বুক স্টলের দিকে মানুষজন আর পা বাড়ান না। এবার তাই একটু অন্য রকমের ভাবনার প্রয়োগ সেই প্রোগেসিভ বুক স্টলে।
সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য পার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, "বেআইনি কয়লা, বালি তো চুরি করে বিক্রি করছে না। একজন নেতা আছেন, যিনি সামনে থাকলে বহু মানুষ এগিয়ে আসবেন। কয়লা, লোহা, বালির থেকে বুদ্ধবাবুর অনেক বেশি জনপ্রিয়তা। যারা করেছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই আদর্শকে মাথায় রেখেই করেছেন।"
কুলটির নিয়ামতপুরে চলছে শতাব্দী প্রাচীন শিবরাত্রি মেলা। সেখানেই দেখা মিলল বামেদের প্রোগ্রেসিভ বুক স্টলের। স্টলের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বেশ কয়েকজন এই সময়কালের যুবক-যুবতী। শুধু বই নয়, বইয়ের পাশাপাশি ঝকঝকে বেশ কিছু আধুনিক প্রোডাক্ট রাখা হয়েছে স্টলে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ছবি দেওয়া চায়ের কাপ বা কফি মগ। পাশাপাশি রয়েছে বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মিউজিশিয়ান সলীল চৌধুরীর ছবি দেওয়া চাবির রিং। রয়েছে ঋত্বিক ঘটক, গীতা দত্ত, সুকান্ত ভট্টাচার্য-সহ বিভিন্ন মণীষী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি দেওয়া পেপারওয়েট থেকে শুরু করে চায়ের কাপ, পেন স্ট্যান্ড, চাবি রিং। চে গুয়েভারা তো আছেই, বাড়তি সংযোজন ফিদেল কাস্ত্রোর ছবি দেওয়া টি শার্ট। শুধু তাই নয়, এই স্টলে বিক্রি হচ্ছে ফিদেল কাস্ত্রো স্টাইলের টুপিও।
স্টলে থাকা বাম-যুবনেতা প্রণয়বিকাশ ধারা বললেন, ‘‘যুগ পাল্টেছে, তাই পুরানো ভাবনা পাল্টেছে। আমরা বইয়ের পাশাপাশি বেশ কিছু জিনিসপত্র রেখেছি যা কার্যত বামেদের ব্র্যান্ড। আমরা মানুষজনের কাছে এই বার্তা নিয়ে যাবার চেষ্টা করছি, এই যে সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক কিংবা গীতা দত্তের মতো মানুষজন বামপন্থী ছিলেন এবং তাঁরা যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন, আমরা আজও সেই আদর্শেই চলছি।’’
স্টলের সামনের ছবি। নিজস্ব চিত্র
বিজেপি রাজ্য কমিটির সদস্য কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, "খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ৩৪ বছর রাজ্যে সরকার চালানোর পর সিপিএম ভোটকাটুয়া পার্টিতে পরিণত হয়েছে। এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে কাপে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব বসুর ছবি লাগিয়ে তাঁদেরকে সামনে রেখে প্রচার করতে হচ্ছে।" আসানসোল পুরনিগমের বোরো চেয়ারম্যান তৃণমূল নেতা দেবাশিস সরকার জানিয়েছেন, "বিষয়টির কোনও গুরুত্ব নেই। তবে একটা জিনিস ভালো লাগছে, সিপিএম মাও সেতুং, বিদেশিদের ছবি লাগানো ছেড়ে স্বদেশিদের ছবি কাপ, কফি মগে দিচ্ছে।"
যদিও এই অভিযোগ কানে দিতে নারাজ সিপিএম। সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য পার্থ মুখোপাধ্যায় বলেন, "বেআইনি কয়লা, বালি তো চুরি করে বিক্রি করছে না। একজন নেতা আছেন, যিনি সামনে থাকলে বহু মানুষ এগিয়ে আসবেন। কয়লা, লোহা, বালির থেকে বুদ্ধবাবুর অনেক বেশি জনপ্রিয়তা। যার সাদা পাঞ্জাবিতে কোনও কালি ছিল না। যারা করেছেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই আদর্শকে মাথায় রেখেই করেছেন।"
