খাতায় শুধু নম্বর ওঠে। ঢাকা পড়ে অভাব আর একাকী লড়াই। প্রথম প্রজন্মের হাত ধরেই পরিবারে প্রথম আলোর প্রবেশ। নম্বর নয়, এরা ইতিহাস বদলের কারিগর। লিখছেন ফুলবাড়ী শীতলা হাইস্কুলের (উঃমাঃ), দক্ষিণ ২৪ পরগনা , শিক্ষক ভোলানাথ দাস ।
একজন ছাত্র যখন পরীক্ষার খাতায় লিখতে বসে, আমরা সাধারণত তার নম্বর দেখি। কিন্তু সেই নম্বরের পিছনে যে ঘর, যে পরিবার, যে অভাব, যে অদেখা লড়াই—তা অনেক সময় আমাদের চোখে পড়ে না।
নিজস্ব ছবি
আমাদের গ্রামবাংলায় এমন বহু ছাত্রছাত্রী আছে, যারা শুধু নিজের জন্য পড়ে না। তারা পড়ে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর জন্য। বাড়িতে হয়তো কেউ মাধ্যমিক পাশ করেননি, কেউ কলেজের দরজা দেখেননি, কেউ ভর্তি-ফর্ম, বৃত্তি, বিষয় নির্বাচন বা পেশার পথ বোঝেন না। সেই বাড়ির প্রথম সন্তান যখন বই হাতে এগিয়ে যায়, তখন সে শুধু একজন ছাত্র থাকে না—সে হয়ে ওঠে পরিবারের প্রথম আলোর রেখা।
এই ছাত্রছাত্রীদের আমরা বলতে পারি—প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। তাদের সংগ্রাম অন্যদের মতো নয়। একই শ্রেণিকক্ষে বসে থাকলেও তাদের শুরুর জায়গা আলাদা। কারও বাড়িতে পড়ার টেবিল আছে, কারও নেই। কারও বাবা-মা পড়ার ভুল ধরিয়ে দেন, কারও বাবা-মা শুধু বলেন, 'ভালো করে পড়।' কারও কাছে ইন্টারনেট আছে, কিন্তু কীভাবে পড়াশোনায় ব্যবহার করতে হয়, তা শেখানোর মানুষ নেই।
নিজস্ব ছবি
দেশে বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ছে। সাম্প্রতিক ASER 2024 অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। কিন্তু ভর্তি হওয়া আর শেখা এক কথা নয়। দেখা যাচ্ছে, সরকারি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির মাত্র প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় শ্রেণির স্তরের পাঠ পড়তে পারে, আর প্রায় ৩১ শতাংশ শিশু ভাগের অঙ্ক করতে পারে। অর্থাৎ শিশুরা বিদ্যালয়ে আসছে, কিন্তু সবাই সমানভাবে শিখতে পারছে না।
প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গভীর। কারণ তাদের শেখার পথে শুধু বইয়ের সমস্যা নেই; আছে পারিবারিক সহায়তার অভাব, আত্মবিশ্বাসের অভাব, ভয়, সংকোচ, আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্ধকার। তারা অনেক সময় প্রশ্ন করতে লজ্জা পায়। ভুল করলে সবাই হাসবে—এই ভয় তাদের চুপ করিয়ে দেয়। ফলে আমরা তাদের 'দুর্বল ছাত্র' বলে চিহ্নিত করি। অথচ সত্যি হল, তারা দুর্বল নয়; তারা অনেক সময় একা।
মাধ্যমিক স্তরে এই একাকিত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে। UDISE+ তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার প্রায় ১৪ শতাংশ, আর পশ্চিমবঙ্গে তা প্রায় ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। দশম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণিতে যাওয়ার পথেও অনেক ছাত্রছাত্রী হারিয়ে যায়। এই হারিয়ে যাওয়া শুধুই পরিসংখ্যান নয়; এর ভিতরে আছে অগণিত অসমাপ্ত স্বপ্ন।
নিজস্ব ছবি
একজন প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী যখন স্কুল ছাড়ে, তখন শুধু একজন ছাত্র হারায় না—একটি পরিবারের সম্ভাবনাও পিছিয়ে যায়। কিন্তু সে যদি টিকে থাকে, মাধ্যমিক পাশ করে, উচ্চমাধ্যমিকে ওঠে, কলেজে যায়, কাজ পায়—তখন শুধু তার নিজের জীবন বদলায় না; তার পরের প্রজন্ম আর প্রথম প্রজন্ম থাকে না। এটাই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সামাজিক শক্তি।
তাই এই ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমাদের ভাবনা আলাদা হওয়া দরকার। শুধু বৃত্তি দিলেই হবে না, দরকার নিয়মিত হাতধরা। শুধু বই দিলেই হবে না, দরকার বই পড়ার পদ্ধতি শেখানো। শুধু পরীক্ষা নিলেই হবে না, দরকার পরীক্ষার ভয় কমানো। শুধু অভিভাবক সভা করলেই হবে না, দরকার অভিভাবকদের সহজ ভাষায় বোঝানো—সন্তানের পড়াশোনা কীভাবে ধরে রাখতে হয়।
বিদ্যালয়ে প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা জরুরি। কার বাড়িতে পড়ার পরিবেশ নেই, কে নিয়মিত স্কুলে আসছে না, কে চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে, কার নম্বর হঠাৎ কমছে—এসব লক্ষণ শিক্ষকরা খুব সহজেই বুঝতে পারেন, যদি একটু মন দিয়ে দেখা যায়। স্কুলছুট একদিনে হয় না; তার আগে অনেক নীরব সংকেত আসে।
এখানে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই শেষ করেন না; তিনি অনেক সময় একটি পরিবারের সঙ্গে শিক্ষার প্রথম সেতু তৈরি করেন। একটি ফোনকল, একটি বাড়ি-ভিজিট, একটি উৎসাহের কথা, একটি ছোট সাহায্য—এসব অনেক সময় একটি শিশুকে স্কুলে ধরে রাখতে পারে।
আমাদের দরকার বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা। দুর্বল ছাত্রদের জন্য ছোট দল তৈরি করে অতিরিক্ত পাঠ, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত কথা, বৃত্তি ও ভর্তির তথ্য সহজভাবে দেওয়া, পেশা-পরামর্শ, ডিজিটাল শিক্ষার ব্যবহার, এবং সবচেয়ে বড় কথা—আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।
কারণ প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী শুধু নম্বরের জন্য পড়ে না। সে পড়ে পরিবারের অশিক্ষার ইতিহাস ভাঙার জন্য। সে পড়ে বাবার শ্রম, মায়ের ত্যাগ, গ্রামের সীমাবদ্ধতা আর নিজের ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য।
আমরা যদি এমন একজন শিশুকে ধরে রাখতে পারি, তবে আমরা শুধু একজন ছাত্রকে সাহায্য করি না; আমরা একটি পরিবারকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে দিই। শিক্ষা তখন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, হয়ে ওঠে সামাজিক পরিবর্তনের শক্তি।
একজন প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী যখন বই হাতে এগিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে এগিয়ে যায় একটি পরিবার, একটি গ্রাম, একটি সমাজের স্বপ্ন। তাই তাকে শুধু 'ছাত্র' হিসেবে নয়, পরিবর্তনের বাহক হিসেবে দেখতে শিখতে হবে।
