shono
Advertisement
Shankar

শংকর বহু সাহিত্যিকের ঈর্ষা

কিংবদন্তি সাহিত্যিককে নিয়ে কলম ধরলেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:02 PM Feb 20, 2026Updated: 05:38 PM Feb 20, 2026

শংকরের চলে যাওয়াটা আমাদের বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল ঘটনা। অনেক ঈর্ষিত সাহিত্যিকই তাঁকে বড় সাহিত্যিক বলে মনে করতেন না। কারণ শংকর ছিলেন বেস্ট সেলার। আমাদের দেশে কারও বই খুব বেশি বিক্রি হতে থাকলেই ধরে নেওয়া হয় তিনি সস্তার সেন্টিমেন্টের বই লিখছেন। ফলে তিনি বড় সাহিত্যিক নন। শরৎচন্দ্রকেও একসময় এমন বদনাম পেতে হয়েছে। যে কারণে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তেমনভাবে আমরা সাহিত্যিকই মনে করলাম না! এই শরদিন্দুরই প্রভাব পড়েছিল শংকরের উপরে। উনি এই কথাটা স্বীকারও করতেন।

Advertisement

শংকর ভীষণ সুন্দর বুনোটের গল্প লিখতে পারতেন, যা আমরা অনেকেই পারি না। ওঁর গল্পের মধ্যে কোনও ফাঁকি থাকত না। যেমন 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ', 'জন অরণ্য'। এগুলো নিয়ে সেই কারণেই সুপারহিট ছবিও হয়েছে। তাছাড়া শংকর এমন সব বিষয় নিয়ে লিখেছেন, যেগুলি আমাদের বেশির ভাগ বাঙালি সাহিত্যিকই ধরতে পারেননি। এই বিষয়গুলি উচ্চবিত্ত সমাজের। যেগুলো আমরা অনেকেই জানি না। 'জন অরণ্য'-তে নানা স্তরের চরিত্র আছে। একেবারে নিচের স্তরের চরিত্র আছে, আবার নিচের স্তর থেকে চালাকি করে উঠে আসা চরিত্রও রয়েছে। চাকরির পিছনে কত রকম ষড়যন্ত্র কাজ করে, কীভাবে চাকরি পাওয়া যায়, কীভাবে চাকরি ধ্বংস করা যায়... এই চাকরির জগৎ, নানা রকম পেশার জগৎ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে তেমন কোনও লেখা হয়নি।

শংকর ভীষণ সুন্দর বুনোটের গল্প লিখতে পারতেন, যা আমরা অনেকেই পারি না। ওঁর গল্পের মধ্যে কোনও ফাঁকি থাকত না। যেমন 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ', 'জন অরণ্য'। এগুলো নিয়ে সেই কারণেই সুপারহিট ছবিও হয়েছে।

'সীমাবদ্ধ'র কথাই ভাবুন। শুধু অর্থের জন্য, বিত্তের জন্য বা উচ্চপদে আসীন হওয়ার জন্য মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়ার ঘটনা তো চারপাশে কতই ঘটে চলে! এঁদের মধ্যে কোনও চরিত্রও নেই, কোনও চারিত্রও নেই। কেবল তাঁরা উন্নতি করতে চাইছেন। এঁদের নিয়ে শংকর লিখেছেন 'সীমাবদ্ধ', যা অতুলনীয়। সত্যজিৎ তাঁর ছবিতেও তা ফুটিয়ে তুলেছেন। হোটেল জগৎ নিয়ে শংকরের আগে আমি কাউকে লিখতে দেখিনি। বা লিখলেও তাঁরা এমন ভিতরের খবর জানতেন না। শংকর তা জানতেন। আর জানতেন বলেই তিনি এমন উপন্যাস লিখতে পেরেছেন।

শংকরের একটা অসাধারণ গুণ ছিল। উনি অনায়াসে বহু তথ্য মনে রাখতে পারতেন। আমি ওঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করে দেখেছি উনি যেন এক ব্লটিং পেপারে মতো সব কিছু শুষে নিতে জানেন! শহুরে জীবনের এত দিক উনি জানতেন... আলোর পাশাপাশি কালো দিকটাও ওঁর নখদর্পণে ছিল। এদিকটা না জানলে উনি 'চৌরঙ্গী' লিখতে পারতেন না।

'চৌরঙ্গী'র এতটা জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটা কারণ অবশ্যই উত্তম কুমার। স্যাটা বোসের চরিত্রে তিনি নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলেন। এমন চরিত্র আমি অন্তত বাংলা সাহিত্যে আর দেখিনি। আবার সুপ্রিয়া দেবী ছিলেন করবী গুহ নাম্নী চরিত্রে। এই চরিত্রটিকে আমার অনেকেই চিনি, অবশ্য ওই নামে নয়। করবী গুহর কেচ্ছার পাশাপাশি মিসেস পাকড়াশির কথাও মনে পড়ে। দীপ্তি রায় অভিনয় করেছিলেন। কী অপূর্ব অভিনয়! মিসেস পাকড়াশির রাত্রিবেলা অভিসারে আসার দৃশ্য আমরা ভুলব না। তাঁর স্বামী অনিন্দ্য পাকড়াশির ভূমিকায় ছিলেন বিশ্বজিৎ।

শংকরের একটা অসাধারণ গুণ ছিল। উনি অনায়াসে বহু তথ্য মনে রাখতে পারতেন। আমি ওঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করে দেখেছি উনি যেন এক ব্লটিং পেপারে মতো সব কিছু শুষে নিতে জানেন!

 

একটা গল্পের ভিতরে এতগুলি চরিত্রে এঁদের আমরা পেলাম! শংকর এটা পারতেন। অনেকগুলি চরিত্র, সকলেই নিজের নিজের চারিত্রে, নিজের নিজের বুননে ফুটে উঠত। এটা শংকরের মুন্সিয়ানা। শুধু চরিত্র নিয়ে আসা নয়, তাদের ফুটিয়ে তোলা এবং তাদের টানাপোড়েনের মধ্যে পাঠককে নিয়ে যাওয়া। এই সব চরিত্রই কিন্তু একটু সফিস্টিকেটেড ধাঁচের। আমরা যারা শহুরে এবং এই সব জগতে ঘোরাফেরা করেছি, তাদের এই সব চরিত্রকে ভালো লেগে যায়। মনে পড়ছে 'সীমাবদ্ধ'র রেসের মাঠ। উপন্যাসের মতোই সিনেমাতেও তা চমৎকার ফুটে উঠেছিল। আসলে সত্যজিৎ এই সফিস্টিকেশনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।
এই সব সৃষ্টির জন্যই শংকর আমাদের মনে থেকে যাবেন। আমি বিশ্বাস করি, আগামিদিনে তাঁর নতুন ভাবে মূল্যায়ন হবে। গল্প বলার এই মুন্সিয়ানাকে বলে পেনম্যানশিপ। এটা সবার নেই। গল্পতে আমরা নানা রকম মনস্তত্ত্ব নিয়ে আসতে পারি, পাতার পর পাতা একঘেয়ে লিখে যেতে পারি, পুরস্কারও পেতে পারি... কিন্তু শংকর যেমন চাবুক মারা গল্প লিখতেন, ঘোড়া ছুটিয়ে গল্প লিখতেন, রঙের তাসের গল্প লিখতেন তা আমরা পারিনি।

শুধু তো লিখলেই হয় না। বই বিক্রিও তো হতে হবে। শংকর সেটা জানতেন। আজকের দিনে বই লিখলে তা 'আনপুটডাউনেবল' হতে হবে। তবেই বাংলা সাহিত্য থাকবে, বাংলা ভাষাও থাকবে। প্রস্তের মতো পাতার পর পাতা লিখে যাওয়ার দিন আর নেই। সময় নেই কারও! তাই আঁকড়ে ধরে পড়িয়ে নিতে হবে। সেই কায়দাটা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন শরদিন্দু বা সত্যজিৎ। এবং শংকরও। বুঝিয়ে দিয়েছেন এই গল্প লিখতে হবে, এই ভাষা লিখতে হবে, এই সাহিত্য লিখতে হবে... তবেই পাঠককে আকর্ষণ করা যাবে।

শংকর আমাদের মনে থেকে যাবেন। আমি বিশ্বাস করি, আগামিদিনে তাঁর নতুন ভাবে মূল্যায়ন হবে। গল্প বলার এই মুন্সিয়ানাকে বলে পেনম্যানশিপ।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার