ইংল্যান্ড: ২৪৬ ও ৬-০
ভারত: ২৭৩ (পুজারা ১৩২ ন: আ:, ৫/৬৩)
দীপ দাশগুপ্ত: ছোটবেলা থেকে একটা কথা খুব শুনতাম। ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্পে একটা কথা খুব বলা হত। ট্যালেন্ট। ক্রিকেটারের প্রতিভা। তখন মনে হত, একজন ক্রিকেটার কতটা প্রতিভাবান বোঝা যায় তার শটে। সে কত সুন্দর কভার ড্রাইভ মারল। কত দুর্ধর্ষ স্কোয়ার কাট মারল। পরে যত বড় হয়েছি বুঝেছি যে, ক্রিকেটে প্রতিভা দু’রকমের হয়। একটা বিরাট কোহলি ঘরানার। যা দেখে চোখ ঝলসে যাবে। দেখতে দেখতে স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়টা চেতেশ্বর পুজারা ঘরানার। যা দেখে চোখ আরাম পাবে। স্নায়ু উত্তেজিত হবে না। কিন্তু শান্ত থাকবে। এই বুঝি আউট হল- ভয়টা থাকবে না।
ক’টা শট আছে বলুন তো পুজারার কাছে? ক’টা শট ও খেলে শুরুতে? পায়ে বল করলে মারে। সে আমি-আপনিও মারব। স্পিনারকে মাঝে-মাঝে স্টেপ আউট করে। কাট মারে। গুণে আপনি বলে দিতে পারবেন শটের সংখ্যা। আমি নিশ্চিত, পাঁচ-ছ’টার বেশি শট পুজারার থেকে পাবেন না। চিরকাল ক্লাসিক্যাল ক্রিকেটের ভক্ত বলে কথাবার্তা একটু আবেগপ্রবণ শোনাচ্ছে হয়তো। কিন্তু এটা সত্যি। কেএল রাহুল, অজিঙ্ক রাহানে প্রতিভায় অনেক এগিয়ে পুজারার চেয়ে। রাহানে-রাহুল যা সব শট খেলতে পারে, পুজারা পারে না। কিন্তু পুজারা যা পারে, তা আর কেউ পারে না। ক্রিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকা। টেস্ট ক্রিকেটে যা সবচেয়ে বেশি দরকার।
[সাউদাম্পটন টেস্ট জিততে ৮০ থেকে ১০০ রানের লিড নিতে হবে বিরাটদের]
শুক্রবার সাউদাম্পটনে ছ’ঘণ্টা ব্যাট করেছে পুজারা। ইংল্যান্ড বোলিংকে নিজের মতো করে শাসন করেছে। এটাও কিন্তু ট্যালেন্ট ছাড়া হয় না। নিজে সেঞ্চুরি তো করেছে বটেই। দেখছিলাম, ইশান্ত শর্মা আর জশপ্রীত বুমরাকে নিয়ে শেষ দু’উইকেটে ৭৮ রান যোগ করেছে! পুজারা ছেড়ে দিলাম। ইশান্ত-বুমরার অর্ধেক অ্যাপ্লিকেশন ক্ষমতাও যদি হার্দিক পান্ডিয়া, ঋষভ পন্থ, রবিচন্দ্রন অশ্বিনরা দেখাতে পারত, ভারত ২৭ নয়, ৭২ রানের লিড নিয়ে শেষ করতে পারত! পুজারার সেঞ্চুরি ইনিংসে আগে আসি। আমি তো বলব, খুব সম্ভবত সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসটা আজ খেলে ফেলল পুজারা। ভারত যদি এখান থেকে টেস্ট জিতে যায়, পুজারার ইনিংস কতটা গুরুত্বপূর্ণ দেখাবে, ভাবতে পারছেন? চলতি সিরিজে তিনটে অসাধারণ সেঞ্চুরি দেখলাম। দু’টো বিরাটের ব্যাট থেকে। একটা আজ, পুজারার ব্যাট থেকে। দু’টোর তুলনা হয় না। দু’জনের খেলার স্টাইল আলাদা। ঘরানা আলাদা। কিন্তু ট্রেন্টব্রিজে ভারতের জয়ের নেপথ্যে যদি বিরাটের অসাধারণ সেঞ্চুরি থাকে, তা হলে সাউদাম্পটনে ভারত জিতলে থাকবে পুজারারটা। আর সিরিজের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয়টা কোথাও যেন একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভাবতে পারেন, ভারত সাউদাম্পটনে জিতবে এখনই ধরে নিচ্ছি কী করে? ধরছি না। সম্ভাবনার কথা বলছি। আর সম্ভাবনাটা খুব কম নয়। ইংল্যান্ডের পরিবেশের কথা ভুলে যান। ধরে নিন, এ রকম রাফ সর্বস্ব পিচে, নিরপেক্ষ ভেনুতে দু’টো টিম খেলছে। এবার ভারতের ব্যাটিং বনাম ইংল্যান্ড বোলিং ভাবুন। আর ইংল্যান্ডের ব্যাটিং বনাম ভারতীয় বোলিং ভাবুন। কাকে এগিয়ে রাখবেন? আসলে ভারতের লিডটা যদি গোটা দশেক রানের হত, তা হলে সেটা বড় ব্যাপার হত না। কিন্তু ইনিংস পিছু আড়াইশো রানের টেস্টে ২৭ রানের লিড খারাপ নয়। শনিবার সকালে ইংল্যান্ডের তাড়াতাড়ি একটা উইকেট গেলেই দেখবেন, অত অল্প লিডকেই কেমন বড় দেখাচ্ছে। আমার রাগটা অন্য জায়গায়। সত্যি সত্যি বড় লিড আমরা নিতে পারতাম। পারলাম না, হার্দিকদের অবিশ্বাস্য কিছু ভুলের জন্য। তা-ও যেখানে ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট অপ্রত্যাশিত সুবিধে করে দিয়েছিল ভারতের।
সুবিধে বলতে মইন আলিকে অনেক, অনেক পরে আনা। মইন লাঞ্চের আগে এক ওভার করেছিল। তা দেখলাম রোজ বোল পিচের রাফে পড়ে বল এমন চকিত টার্ন করল যে, অভাবনীয়। আমরা কমেন্ট্রি বক্সে বলাবলি করছিলাম, গেল রে। মইন ঝামেলা করবে আজ। যে কোনও ক্যাপ্টেন এরপর লাঞ্চের পরই মইনকে আনবে। কিন্তু রুট উল্টোটা করল। ওকে সরিয়ে দিল! মুশকিল হল, অযাচিত সুবিধে পেলে শুধু হয় না। তার থেকে ফায়দা তুলতে হয়। ভারত একটা সময় ১৪০-২ ছিল। সেখান থেকে স্কোরটা ৩২০-৩৩০ হতেই পারত মিডল অর্ডার একটু দায়বদ্ধতা দেখালে। কিন্তু বিরাট আউট হতেই সব ওলটপালট। হার্দিক দেখল, শর্ট মিড উইকেট দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তার পরেও মইন আলিকে রাফ থেকে কব্জি ব্যবহার করে খেলতে গেল। আমার বক্তব্য হল, বোলার কী বল করবে না করবে, বোঝা কঠিন। কিন্তু ফিল্ড প্লেসমেন্ট দেখে তো আন্দাজ পাওয়া যায়। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, মইন শর্ট মিড উইকেট ট্র্যাপ সেট করেছে হার্দিককে তুলবে বলে। হার্দিক কব্জি ব্যবহার করে শট মারে। আর আউট হবে। হার্দিকের শটটা ভাল উইকেটে চলে। শর্ট মিড উইকেটের উপর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে রোজ বোলের মতো পিচে হবে নাকি? অশ্বিন আবার আগেভাগে ঠিক করে রেখেছিল মইনকে রিভার্স সুইপ মারবে। ওটা ব্যাকফুটে খেলার বল। আর ঋষভ? ২৯ বল খেলে ০!
রাহানে নিয়েও আমি হতাশ। ক্রিজের মধ্যে জড়োসড়ো হয়ে কেন যে ও ঢুকে থাকছে, জানি না। গত টেস্টে ও রান পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এই ক্রিজের মধ্যে ঢুকে থাকার সমস্যাটা চোখে পড়েছিল। যতই সাউদাম্পটনে বল তেমন মুভ না করুক, শত হলেও ইংল্যান্ডের মাঠ তো। একটু-আধটু করবেই। আর ক্রিজের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকলে প্রবলেম হবেই। সেখানে পুজারাকে দেখুন। কী অসাধারণ ফুটওয়ার্ক দিয়ে পুরোটা ম্যানেজ করে গেল। ব্যাকফুটে কাট মেরেছে। মইনকে স্টেপ আউট করে মেরেছে। বিরাটের টেস্টে ছ’হাজার রান আজ পূর্ণ হল। ১১৯ ইনিংস খেলে। ও সুনীল গাভাসকরের পরেই। গাভাসকরের ছিল ১১৭ ইনিংসে। আমরা ভাগ্যবান যে, একটা বিরাট কোহলিকে পেয়েছি। কিন্তু আমরা ততোধিক ভাগ্যবান যে, কোহলির সঙ্গে সঙ্গে একটা চেতেশ্বর পুজারাও পেয়েছি!
The post পুজারার সেঞ্চুরিতেও স্বস্তিতে নেই ভারত appeared first on Sangbad Pratidin.
