আইপিএলের উনিশ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে এ জিনিস কখনও ঘটেনি। আইপিএল (IPL 2026) কখনও এ হেন রান-প্লাবন দেখেনি, উনিশতম সংস্করণে এসে যা দেখছে। গুগল সার্চ দিয়ে দেখা গেল, মঙ্গলবার সন্ধের পাঞ্জাব কিংস বনাম রাজস্থান রয়্যালস ম্যাচের আগে পর্যন্ত দু’শো প্লাস রান উঠেছে মোট একত্রিশ বার! গড়পড়তা রান রেট দাঁড়িয়েছে ৯.৬৮। অর্থাৎ, প্রায় দশ!
আজ্ঞে। টুর্নামেন্ট এখনও দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করেনি। পুরো মে মাসটা বাকি পড়ে রয়েছে। অগণিত দু’শো প্লাসের স্রোত শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, কেউ জানে না। ভাবা যায়, দিনকাল এমনই যে, ২৬৪ রান তুলেও নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন আগে দিল্লি ক্যাপিটালস ২৬৪ তুলেছিল শ্রেয়স আইয়ারের পাঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে। কেএল রাহুল দেড়শো রান করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও জিততে পারেনি দিল্লি। বরং হাতে সাত বল বাকি রেখে অনায়াসে ম্যাচ জিতে নেয় পাঞ্জাব! যার পর প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, বোলারদের এহেন তীব্র লাঞ্ছনার শেষ কোথায়? করবেন কী তারা? কোন অস্ত্রে এহেন ভয়াল সংহারের মোকাবিলা করবেন? আইপিএলের ‘সেফ স্কোর’-ও বা তা হলে কী?
প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, বোলারদের এহেন তীব্র লাঞ্ছনার শেষ কোথায়? করবেন কী তারা? কোন অস্ত্রে এহেন ভয়াল সংহারের মোকাবিলা করবেন? আইপিএলের ‘সেফ স্কোর’-ও বা তা হলে কী?
সোমবারের অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে দিল্লি ক্যাপিটালস বনাম আরসিবি যুদ্ধের পর ক্রিকেটমহল ঈষৎ আশাবাদী। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের কারও কারও মনে হচ্ছে, নিখুঁত প্রতিষেধক না হলেও, একটা রাস্তা সম্ভবত বেরিয়েছে। আশার হালকা দীপ্তি পাওয়া গিয়েছে। যা দেখিয়ে গিয়েছেন দু’জন। দুই আরসিবি পেসার ভুবনেশ্বর কুমার এবং জশ হ্যাজেলউড মিলে। সম্মিলিত তিন-তিন ছ’উইকেট নিয়ে।
সে প্রতিষেধকের নাম? টেস্ট ম্যাচ বোলিং লেংথ! ব্যাটারের পজিশন থেকে ৬-৮ মিটারের যে অঞ্চল, সেটাকেই আদর্শ টেস্ট বোলিং লেংথ ধরা হয়। যে লেংথে বল রাখলে, ব্যাটাররা শট খেলতে অসুবিধেয় পড়ে। উইকেট যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এবং দিল্লির বিরুদ্ধে গত সন্ধেয় ঠিক সেই কাজটাই করেছেন ভুবনেশ্বর-হ্যাজেলউড মিলে। টেস্ট ম্যাচ লেংথে বোলিং করে গিয়েছেন। যার নিটফল, একটা সময় ৮ রানে ৬ উইকেট চলে গিয়েছিল দিল্লি ক্যাপিটালসের! এবং পরিশেষে ৭৫ অলআউট। পুরো কুড়ি ওভার খেলতে না পেরে।
গতকাল খেলা শেষে সম্প্রচারকারী সংস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবাদপ্রতিম পেসার ডেল স্টেইন বলেছেন যে, টি-টোয়েন্টি ব্যাটার যতই দুঁদে হোক না কেন, তার পক্ষে ‘হার্ড লেংথ’-এর মহড়া নেওয়া সহজ হয় না। ‘‘আমি শুধু ভুবি আর হ্যাজেলউডের কথা বলব না। একই সঙ্গে বলব, কাগিসো রাবাডা আর জোফ্রা আর্চারের কথাও। ওরা ব্যাটারের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। আরে, হার্ড লেংথ তো আর এমনি এমনি হার্ড নয়। ব্যাটাররা সেভাবে হার্ড লেংথ বোলিংয়ের বিরুদ্ধে প্র্যাকটিস করে কোথায়,’’ সম্প্রচারকারী সংস্থায় বলে দিয়েছেন স্টেইন।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিগত পাঁচ-সাত বছরে টি-টোয়েন্টি ব্যাটারের ‘অ্যাটাকিং প্লে’-র উন্নতি ঘটেছে। অবনতি ঘটেছে ‘ডিফেন্সিভ প্লে’-র। প্লাস, অতি আক্রমণের পথ ধরতে গিয়ে ব্যাটারদের ‘ব্যাট স্পিড’ বেড়ে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে বল নড়াচড়া করলে তা খেলা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে যায়।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিগত পাঁচ-সাত বছরে টি-টোয়েন্টি ব্যাটারের ‘অ্যাটাকিং প্লে’-র উন্নতি ঘটেছে। অবনতি ঘটেছে ‘ডিফেন্সিভ প্লে’-র। প্লাস, অতি আক্রমণের পথ ধরতে গিয়ে ব্যাটারদের ‘ব্যাট স্পিড’ বেড়ে গিয়েছে। সেক্ষেত্রে বল নড়াচড়া করলে তা খেলা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে যায়। একই কথা প্রযোজ্য, স্পিনারের বিরুদ্ধে। ‘মুভিং ডেলিভারি’ কিংবা ‘অ্যাকিউট টার্ন’–দু’টো সামলাতে ব্যাট স্পিড কম থাকা দরকার। যাতে অ্যাডজাস্টমেন্টটা করা যায়। বলাবলি চলছে, টি-টোয়েন্টি ব্যাটাররা ‘থ্রু দ্য লাইন’ খেলে-খেলে অভ্যস্ত। ‘ফার্স্ট লাইনে’ খেলতে কোনও সমস্যা হয় না অধুনা টি-টোয়েন্টি ব্যাটারের। কিন্তু বল ‘মুভ’ করতে শুরু করলে, ‘ফার্স্ট লাইনে’ খেললে চলে না।
ধারাভাষ্য-জগতে যে বঙ্গসন্তান প্রভূত নামডাক করে ফেলেছেন, দুঁদে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গোটা ভারতবর্ষে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছেন, সেই দীপ দাশগুপ্ত এ দিন ফোনে বলছিলেন, “আরসিবি-দিল্লি খেলাটা দেখেছি আমি। টেস্ট ম্যাচ লেংথ অবশ্যই রান নিয়ন্ত্রণের একটা রাস্তা। কিন্তু তার জন্য বল মুভ করা প্রয়োজন। কোটলায় কিন্তু বল মুভ করছিল। হ্যাজেলউড আর ভুবি সেটাকে আরও বেশি করে কাজে লাগিয়েছে, টেস্ট ম্যাচ লেংথে বোলিং করে। হ্যাজেলউড সচরাচর তাই করে। তা ছাড়া ও লম্বা বলে বাড়তি বাউন্স পেয়ে থাকে।”
এটা সত্যি যে, সব টিমে ভুবনেশ্বর-হ্যাজেলউডের মতো গুণী বোলার নেই। এটাও ঘটনা যে, টানা টেস্ট ম্যাচ লেংথে বল করে যাওয়াও মুখের কথা নয়। তবু যা-ই হোক। দিন শেষে একটা উপায় পাওয়া গিয়েছে তো। যতই শিবরাত্রির সলতে হোক, আশার সলতে তো!
