সুজন মুখোপাধ্যায়। ইডেন কিউরেটর। যাঁর পিচ ভারতের শীর্ষস্থানীয় হওয়া সত্ত্বেও মাঝে মাঝে বিতর্কিত শিরোনাম সৃষ্টি করে। আইপিএলের শ্রেষ্ঠ পিচ ও মাঠের স্বীকৃতি পেয়েছে ইডেন। যা নিয়ে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে সাক্ষাৎকার দিলেন সুজন। যিনি একইসঙ্গে কল্যাণী মাঠের হালচাল নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায়।
প্রশ্ন : আরও একবার ইডেন আইপিএলের সেরা মাঠের সম্মান পেল। বোর্ড পুরস্কার ঘোষণার পর কী মনে হচ্ছে?
সুজন: ভালোই লাগছে। এত দিন ধরে মাঠ করছি। বাংলা ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। পুরস্কার পেলে ভালো কাজের এনার্জি আরও বেড়ে যায়। তবে এখানে আমি আমার মাঠকর্মীদের কথা বলব। এই পুরস্কার ওদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। আসল কিন্তু ওরা, আমার মাঠকর্মীরা। যারা গোটা বছর রোদ-ঝড়-জল জুড়ে ইডেনের সম্মান অটুট রাখে। কী জানেন, আমি বড়জোর নির্দেশ দিতে পারি। কিন্তু সেই নির্দেশ মতো কাজটা না হলে, কোনও লাভ আছে?
প্রশ্ন : পুরস্কার অর্থের পঞ্চাশ লক্ষের কী হবে, কিছু জানেন? মাঠকর্মীরা পাবেন?
সুজন : সেটা সিএবি বলতে পারবে। প্রেসিডেন্ট-সচিব আছেন, ওঁরা নিশ্চয়ই কথা বলে কিছু একটা ঠিক করবেন।
পুরস্কার পেলে ভালো কাজের এনার্জি আরও বেড়ে যায়। তবে এখানে আমি আমার মাঠকর্মীদের কথা বলব। এই পুরস্কার ওদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। আসল কিন্তু ওরা, আমার মাঠকর্মীরা। যারা গোটা বছর রোদ-ঝড়-জল জুড়ে ইডেনের সম্মান অটুট রাখে।
প্রশ্ন : ইডেনের দায়িত্ব নেওয়ার পরের দিন থেকে দু’টো চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আপনাকে যুঝতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। এক, পূর্বতন ইডেন কিউরেটর প্রবীর মুখোপাধ্যায় নামক এক দীর্ঘ ছায়ার সঙ্গে। দুই, ইডেন পিচের সঙ্গে। কারণ, প্রবীরবাবুর আমলের ইডেন বাইশ গজ, আর আজকের ইডেন বাইশ গজ–এক রকম নয়। তখন পিচ স্লো টার্নার হত।
সুজন : প্রবীরদা আমার সিনিয়র ছিলেন। ওঁকে সম্মানও করি। তবে এটা ঘটনা যে, সেই সময় ইডেন পিচ নিয়ে খুব কথা হত। প্রবীরদা যখন দায়িত্ব ছেড়ে দেন, সৌরভ (গঙ্গোপাধ্যায়) আমাকে ফোন করে। সেই সময় ও সিএবি প্রেসিডেন্ট। সৌরভ আমাকে দায়িত্ব নিতে বলে দ্রুত। দেখুন, আমার কয়েকটা শর্ত ছিল। ঠিক করেছিলাম, পিচের চরিত্র সর্বাগ্রে বদলাব। কারণ, লোকে খেলা দেখতে আসে আনন্দ পেতে। ঢিকির-ঢিকির ক্রিকেট দেখতে নয়। তাই পিচের মাটি বদলে ফেললাম। বারমুডা গ্রাস বসালাম। তিরিশ গজী বৃত্তেও একই ঘাস রাখলাম।
প্রশ্ন : মুশকিল হল, এত কিছুর পরেও আপনার পিচ নিয়ে সমালোচনা চলে। কেকেআর প্রায়ই বলে। ২০২৫ আইপিএলের সময় তো হর্ষ ভোগলে আর সাইমন ডুল মিলে ধুন্ধুমার বাঁধিয়ে দিলেন। দু’জনে সমবেত বললেন যে, কিউরেটরের কাজ ফ্র্যাঞ্চাইজির মন মতো পিচ তৈরি করে দেওয়া। তার জন্য সে টাকা পায়। কথা বলার জন্য পায় না। বোর্ড পুরস্কার কি ভোগলেদের জবাব?
সুজন : সৌরভ যখন খেলত, সে সময়ও তো ভোগলে ওকে নিয়ে কত কিছু বলেছিল। অত কিছু নিয়ে ভাবলে কী আর চলে? তাই ও সমস্ত জবাব-টবাব কিছু নয়। আর গতবার ধারাভাষ্যকাররা নিজেদের এক্তিয়ার ভুলে গিয়েছিলেন। পরে বোর্ড একটা ই-মেল করে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের জানায় যে, কোচ-ক্যাপ্টেন কেউ প্রকাশ্যে পিচ নিয়ে বিবৃতি দিতে পারবে না। দিলে শাস্তির মুখে পড়বে।
প্রশ্ন : কেকেআর এবার অত না বললেও টুকটাক বলেছে। সিএবি-র কেউ কেউও বলেছেন।
সুজন : বলুক না কেকেআর। তাতে আমার ভালো করার আরও এনার্জি বাড়বে। আর সিএবি বাদই দিলাম। অনেকে তো জানেনও না কোথায় কবে কোন খেলা হচ্ছে? মাঠে গিয়ে জানতে পারেন! সিএবি প্রেসিডেন্ট কী বললেন, সেটা আসল। আমি তাঁর কাছে অ্যাকাউন্টেবল।
প্রশ্ন : ইডেনে গত ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্টও কিন্তু পিচ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। এটা ঘটনা যে, সেই টেস্টের পিচে অসমান বাউন্স ছিল।
আইপিএলের সময় সিএবি সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুজন
সুজন : আরে, পিচে জল দেওয়া কমিয়ে স্লো করতে বলা হয়েছিল। গৌতমকে (ভারতীয় দলের হেড কোচ গৌতম গম্ভীর) কেউ একজন বুঝিয়েছিল যে, সাউথ আফ্রিকার হাতে রাবাডা রয়েছে। আমি কিন্তু গৌতমকে সতর্ক করেছিলাম যে, টার্নার চাইছ, ঠিক আছে। কিন্তু তাতে ভারতকেই ভুগতে হতে পারে। ভারত ভুগলও। তবে গৌতম স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছেলে। প্রকাশ্যে বলল যে, ও অমন উইকেটই চেয়েছিল। পরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইডেনে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে দু’শো করে রান উঠল। গৌতম খুব খুশি হয়ে সে দিন বলেছিল, এ রকম পিচই হওয়া উচিত। তখন হাসতে-হাসতে ওকে বলি, তা হলে সাউথ আফ্রিকা টেস্টে কেন ওই পিচ চেয়েছিলে?
প্রশ্ন : ইডেনের সম্মান-লাভের দিনে একটা অন্ধকার দিকও কিন্তু রয়েছে।
সুজন : যেমন?
প্রশ্ন : কল্যাণীর মাঠ নিয়ে। শোনা যাচ্ছে, মাঠের মালিরা সব ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন? পনেরো জন মালি থেকে কমতে-কমতে সংখ্যাটা পাঁচে নেমেছে? সাতজন ইস্তফা দিয়েছেন ‘পে রিভিশন’ হওয়ার কারণে?
সুজন : অস্বীকার করব না। গত বার তিনটে রনজি ম্যাচ হয়েছে কল্যাণী মাঠে। বোর্ডের অন্যান্য ম্যাচ হয়েছে। কিন্তু এবার কী হবে, জানি না। মাত্র দশ হাজার টাকা মাইনে করে দেওয়া হয়েছে মালিদের। এতে সংসার চলে?
গৌতম স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছেলে। প্রকাশ্যে বলল যে, ও অমন উইকেটই চেয়েছিল। পরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইডেনে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে দু’শো করে রান উঠল। গৌতম খুব খুশি হয়ে সে দিন বলেছিল, এ রকম পিচই হওয়া উচিত। তখন হাসতে-হাসতে ওকে বলি, তা হলে সাউথ আফ্রিকা টেস্টে কেন ওই পিচ চেয়েছিলে?
প্রশ্ন : কাউকে জানাননি?
সুজন : সিএবি সচিবকে জানিয়েছি। উনি যা ভালো বুঝবেন, করবেন।
প্রশ্ন : কল্যাণী মাঠের সাত জন মালি সত্যি ছেড়ে দিয়েছেন?
সুজন : হ্যাঁ। বাকি পাঁচজনও ছাড়বে-ছাড়বে করছে। ওরা আমাকে বলে দিয়েছে, আর টানা সম্ভব হচ্ছে না। পাঁচজন মালি দিয়ে আর যা-ই হোক, মাঠ তৈরি করা সম্ভব নয়। ওরাও চলে গেলে কী হবে, জানি না। শুনেছি বলা হয় যে, কল্যাণীতে নাকি প্রচুর টাকা ‘লিকেজ’ হচ্ছে। কোথায় যে হচ্ছে, জানি না। এই তো ক’টা টাকা দেয়!
