নাড়িছেঁড়া মাণিক না হোক, এ তো প্রাণের ধন, বড় আদরের! মা-হারা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে 'বুড়ো'কে বড় করে তুলেছেন। দেখতে দেখতে আজ ২০ বছর। তাই ধূমধাম করে জন্মদিন পালন হচ্ছে। না, এ সাধারণ মানুষের জন্মদিনের রঙিন গল্প নয়। এই বিশেষ দিনটি এক পোষ্য ছাগলের। আরামবাগের পূর্ণিমা চালকের প্রাণের 'বুড়ো'। নিজের ছেলের মতো করে চারপেয়েটিকে এত বছর ধরে বড় করেছেন তিনি। ইচ্ছে ছিল, ২০ বছরের জন্মদিন বড় করে পালন করবেন। শুক্রবার তাঁর সেই ইচ্ছে পূরণ হল। মাছ,মাংস, মিষ্টি, চকোলেট, কেক - সব পেটপুরে খেল ছাগলটি। খেলেন আশপাশের ৬০-৭০জন আমন্ত্রিতও। পূর্ণিমাদেবী ও তাঁর পরিবারের এই উদ্যোগকে ধন্য ধন্য করছেন সবাই। বলছেন, মা তো এমনই হন।
২০ বছরের 'বুড়ো'কে আশীর্বাদ পূর্ণিমাদেবীর, নিজস্ব ছবি
আরামবাগের পূর্ণিমা চালক দিব্যাঙ্গদের একটি স্কুলে পরিচারিকার কাজ করেন। স্বামী লালচরণ ও ছেলে মিঠুনকে নিয়ে সংসার। ছিল একটি পোষ্য ছাগল। দিব্যি কাটছিল দিন। কিন্তু সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় পূর্ণিমাদেবীর ওই পোষ্যের। ২০ বছর আগের সেই দুর্দিনের কথা বলতে গিয়ে পূর্ণিমাদেবীর চোখে জল, গলা কেঁপে যাচ্ছিল। তিনি জানালেন, ‘‘ওর মা ছিল আমার কাছে। সেদিন ওর জন্ম দিতে গিয়ে দেখলাম, দু'জনের নাড়ি জড়িয়ে গিয়েছে। চোখের সামনে মা মারা গেল। তখন ও সবে হয়েছে। মৃত মায়ের দুধ খাচ্ছিল। সেটা দেখে আর আমি থাকতে পারিনি, মায়ায় জড়িয়ে পড়ি। তারপর ওকে আমার ছেলের মতো করেই বড় করেছি। ওকে পাশে নিয়ে বিছানায় ঘুমাই।''
আজ জন্মদিনের আয়োজনের নেপথ্যেও মস্ত কারণ আছে। পূর্ণিমাদেবী জানালেন, কয়েকদিন আগে নাকি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল 'বুড়ো'। মলমূত্র ত্যাগ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে পরীক্ষা করে দুঃসংবাদই শুনিয়েছিলেন চিকিৎসক। আর বেশিদিন বাঁচবে না ছাগলটি, এমনই জানানো হয়। কিন্তু পূর্ণিমাদেবীদের সবার শুশ্রূষায় ভালো হয়ে ওঠে পোষ্য। এ যেন দ্বিতীয় জন্ম! তার উদযাপনে তো একটু জাঁকজমক থাকবেই।
'বুড়ো'র জন্মদিনের কেক, নিজস্ব ছবি
শুক্রবার 'বুড়ো'র জন্মদিনে বাড়িতে এলাহি ভোজ। ভাত, ডাল, পাঁচরকম ভাজা, শাক, মাছ, মাংস, চাটনি, পাঁপড়, মিষ্টি - কী নেই পাতে? আলপনা আঁকা মাটির থালা, বাটি, গ্লাসে সব সাজিয়ে দেওয়া হয় পোষ্য ছাগলটির সামনে। সে প্রিয় খাবারগুলো খায়। শুধু সে একা নয়, আশপাশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন আমন্ত্রিতও চেটেপুটে খাওয়াদাওয়া করেন, আশীর্বাদ করে 'বুড়ো'কে কেউ কেউ উপহারও দিয়েছেন। চকোলেট, বাটি ইত্যাদি পেয়েছে সে। পূর্ণিমাদেবীর কথায়, ‘‘খুব ইচ্ছে ছিল, ওর জন্মদিন বড় করে করব। প্রতি বছর বাড়িতে পায়েস রান্না করে ওকে খাওয়াই। এবারই সবাইকে ডেকে খাওয়ালাম।''
