ভারত (প্রথম ইনিংস): ৫০৩/৯ (ডিক্লেয়ার) - দেবদত্ত ১১৭, জুরেল ১১৫, ফার্নান্দো ১০৬/৪, প্রভাত ১৩২/২)
শ্রীলঙ্কা (প্রথম ইনিংস): ২৯০/১০ - সোনাল ১০৩, পাসিন্দু ৮০, প্রসিদ্ধ ৫২/৩, সুথার ৮৫/৩
শ্রীলঙ্কা (দ্বিতীয় ইনিংস): ৪২৯/৯ - সোনাল ১৩৩*, পাসিন্দু ৯২, জাদেজা ৯৪/৩, সুথার ১২১/৩
ম্যাচ ড্র।
১১ মার্চ, ২০০১। কলকাতার ইডেনে লেখা হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের এক অবিস্মরণীয় রূপকথা। ভিভিএস লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড়ের অবিশ্বাস্য জুটি, হরভজন সিংয়ের হ্যাটট্রিকের সৌজন্যে স্টিভ ওয়র অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়ার অশ্বমেধের ঘোড়া থামিয়েছিল ভারত। সেই টেস্টেই 'ভেরি ভেরি স্পেশাল' লক্ষ্মণের ২৮১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। বৃহস্পতিবার ২৫ বছর আগের সেই লক্ষ্মণ-রূপকথাই যেন ফের মনে করিয়ে দিলেন সোনাল দিনুশা। প্রথম ইনিংসে ঝকঝকে সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসেও দুরন্ত শতরান হাঁকিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট বাঁচিয়ে শ্রীলঙ্কাকে কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করলেন তিনি। ম্যাচ হয়তো জিতল না দ্বীপরাষ্ট্র, কিন্তু এই ড্র জেতার থেকে কোনও অংশে কম নয়।
চারটি উইকেট। হাতে গোটা দিন। এমন পরিস্থিতিতে পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনেই শ্রীলঙ্কাকে অলআউট করে ম্যাচ ও সিরিজ পকেটে পুরে ফেলবে ভারত, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ক্রিকেট যে অনিশ্চয়তার খেলা, কলম্বো টেস্ট তার উদাহরণ হয়ে থাকল। শ্রীলঙ্কার শেষ চার উইকেট তুলতে গোটা দিন বল করল ভারত। তবু শেষ উইকেট পড়ল না। ২২৯/৬ থেকে দিন শুরু করে ৪২৯/৯-এ ইনিংস শেষ করল শ্রীলঙ্কা। ১৩৩ রানে অপরাজিত থাকলেন সোনাল দিনুশা। ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজে এটি তাঁর তৃতীয় শতরান। সঙ্গে টেলএন্ডারদের নিয়ে যে লড়াই করলেন, তাতেই নিশ্চিত জয়ের দরজা থেকে ফিরে আসতে হল ভারতকে।
সোনালের সঙ্গী হিসাবে কখনও নুয়ান্তা, কখনও প্রভাত জয়সূর্য, আবার কখনও লাহিরু কুমারা। ভারতের পেসার-স্পিনার, কোনও অস্ত্রই কাজে এল না। দিনের প্রথম সেশন তো দূরের কথা, ১০৫তম ওভার পর্যন্ত একটি উইকেটও ফেলতে পারেনি ভারত। নুয়ান্তা ১৫০ বলে ৪৬ করে আউট হওয়ার পর প্রভাত জয়সূর্য দ্রুত ফিরে গেলে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছিল। কিন্তু লাহিরু কুমারা সেই আশাতেও জল ঢেলে দিলেন। ন'নম্বরে নেমে ৯০ বল ক্রিজে কাটিয়ে দিলেন তিনি। শেষ উইকেটে অসিতা ফার্নান্ডোও খেললেন ২৪ বল। একটিও রান করলেন না। তবু আউট হলেন না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হয়তো উঠবে শুভমান গিলের ফলো-অন করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে। আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়কেরা সাধারণত ফলো-অন এড়িয়ে চলেন। চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করার ঝুঁকি নিতে চান না কেউই। শুভমন সেই প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে শ্রীলঙ্কাকে আবার ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন। সিদ্ধান্তটি ভুল কি ঠিক, তা নিয়ে বিতর্ক চলবেই। কারণ ফলো-অন না করালেও এই পিচে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর নিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু ফলাফলের দিকে তাকালে সিদ্ধান্তের দায় এড়ানো কঠিন।
তবে শুধু ফলো-অনকে দায়ী করলে ভুল হবে। পিচ যত মন্থর হয়েছে, ততই ভারতীয় বোলিংয়ের সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়েছে। সারাংশ জৈন ৩৭ ওভার বল করলেন। ৯৮ রান দিয়ে তাঁর শিকার মাত্র একটি উইকেট। ৩৩ বছর বয়সে অভিষেক হওয়া এই ক্রিকেটারের বোলিংয়ে বৈচিত্রের অভাব চোখে পড়েছে। সোনাল তাঁর বলে অনায়াসে সুইপ খেলেছেন। এখানে আরও একটা প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি কুলদীপ যাদবকে বাদ দেওয়া ভারতের জন্য 'আত্মঘাতী' সিদ্ধান্ত হল? মানব সুথার এবং রবীন্দ্র জাদেজাও বিশেষ কিছু করতে পারেননি। দু'জনেই বাঁহাতি স্পিনার। দু'জনের বোলিংয়েই প্রায় একই ছবি। নিষ্প্রাণ পিচ থেকে সাহায্য না পেয়ে বিকল্প পরিকল্পনাও দেখা গেল না। ফলে যা হবার নয়, তা-ই হল। জেতা ম্যাচ ড্র করে আসতে হল টিম ইন্ডিয়াকে।
আরও বেশি হতাশার ছবি, দিনের একেবারে শেষ দিকে শুভমান, যশস্বী জয়সওয়াল, ধ্রুব জুরেলরা বল করে দেখিয়ে দিলেন, পিচে সামান্য হলেও ঘূর্ণি ছিল। তাঁদের বলে প্রায় সাত ডিগ্রি পর্যন্ত টার্নও দেখা গেল। প্রশ্ন উঠবেই, তবে প্রয়োজনের সময়ে এই বোলিং কেন ব্যবহার করা হল না? শেষ পর্যন্ত ১৫৪তম ওভারে দুই দলই বুঝে যায়, এই পিচে ম্যাচের ফল হওয়া অসম্ভব। নিশ্চিত জয়ের ম্যাচ ড্র করে মাঠ ছাড়ল ভারত। শ্রীলঙ্কার কাছে এই ড্র নিছক ড্র নয়, নৈতিক জয়। আর ভারতের কাছে? সিরিজ জিতলেও দ্বিতীয় টেস্ট জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করার হতাশা নিয়ে দেশে ফিরতে হবে টিম ইন্ডিয়াকে। টেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও যার খেসারত দিতে হল।
