'ওয়ার্ক হার্ড। ড্রিম বিগ। স্টে হাম্বল।'
কথাগুলো জসপ্রীত বুমরাহর জীবনের মন্ত্র নয় শুধু পুরো নির্মাণ হাইস্কুলের মন্ত্র।
বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে নতুন কোনও জায়গা খুঁজে বের করতে বিশেষ খাটাখাটনি করতে হয় না। গুগল ম্যাপে দেখে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু নির্মাণ হাইস্কুল খুঁজতে গুগল ম্যাপের দরকার নেই। বজ্রপুরে দাঁড়িয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবেন। যা কি না জশপ্রীত বুমরাহর স্কুল।
কলকাতার নামী স্কুলগুলো যেমন। এখানে নির্মাণ হাইস্কুল ঠিক তেমনই। চারতলা বিল্ডিং। সিঁড়ি দিয়ে সামান্য উঠতেই দেখা গেল বিশাল একটা বোর্ড। যেখানে লেখা রয়েছে, 'ওয়ার্ক হার্ড। ড্রিম বিগ। স্টে হাম্বল।' বোর্ডের উলটোদিকে বুমরাহর শৈশবের স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। স্কুলের হয়ে ট্রফি জেতার ছবি। সবার উপরে বুমরাহর বড় ছবি। সেখানে লেখা, বুমরাহ তোমার জন্য গর্বিত।'
ভারতীয় পেসারের মা এই স্কুলেরই প্রাইমারি বিভাগের প্রিন্সিপাল ছিলেন। বুমরাহ অবশ্য ছোট থেকেই লেখাপড়ার বিষয়ে খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না। টেনেটুনে পাশ করার মতো নম্বর পেতেন।
ধ্যান-জ্ঞান বলতে শুধুই ক্রিকেট। স্কুলের পাশেই প্র্যাকটিসের জায়গা। তিনটে নেট সেখানে। নির্মাণ স্কুলের একটা রীতি রয়েছে। খেলাধুলার ব্যাপারে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। ক্রিকেট পাঠ শেখানোর জন্য প্রাক্তন রনজি ক্রিকেটারকে নিয়োগ করা হয় কোচ হিসেবে। স্কুলটা যাঁর, সেই আশিস দেশাই বলছিলেন, "এখানে কোচ হতে গেলে রনজি খেলতেই হবে। আমরা রনজি ক্রিকেটার ছাড়া কাউকে কোচ করি না। এর আগে কোচ ছিলেন কিশোর ত্রিবেদী। এখন যিনি রয়েছেন, তিনি ভারতীয় দলের হয়ে খেলেছেন।"
স্কুলে পড়ার সময় কিশোর ত্রিবেদীর চোখে পড়ে যান বুমরাহ। যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি তাঁকে আকৃষ্ট করছিল, সেটা বুমরাহর (Jasprit Bumrah) অদ্বিতীয় বোলিং অ্যাকশন। নেটে অসম্ভব জোরে বোলিং করতেন। প্রথমদিন বুমরাহকে একটাই কথা বলছিলেন ত্রিবেদী, 'আর যাই করো, কখনও নিজের বোলিং অ্যাকশন বদলে ফেলো না।' সেদিনের কথাগুলো বলতে বলতে বারবারই আবেগে ভেসে যাচ্ছিলেন বুমরাহর ছোটবেলার কোচ।
স্কুলে কোচিং এখন আর করেন না। করেন সাত-আট কিলোমিটার দূরে রয়্যাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। সারা দিন সেখানেই পড়ে থাকেন। শনিবার বিকেল নিজের অ্যাকাডেমিতে বসেই বলছিলেন, "বুমরাহকে প্রথম দেখার পরই বলছিলাম কখনও নিজের অ্যাকশন বদলে ফেলো না। বাকিদের থেকে বুমরাহর বোলিং অ্যাকশন আলাদা। ওর অ্যাকশনের সবচেয়ে বড় সুবিধে, কোন ডেলিভারি ভেতরে আসবে, কোনটা বাইরে যাবে, সেটা বোঝা খুব কঠিন হয়ে যায়।"
শনিবার বিকেল নিজের অ্যাকাডেমিতে বসেই বলছিলেন, "বুমরাহকে প্রথম দেখার পরই বলছিলাম কখনও নিজের অ্যাকশন বদলে ফেলো না। বাকিদের থেকে বুমরাহর বোলিং অ্যাকশন আলাদা। ওর অ্যাকশনের সবচেয়ে বড় সুবিধে, কোন ডেলিভারি ভেতরে আসবে, কোনটা বাইরে যাবে, সেটা বোঝা খুব কঠিন হয়ে যায়।"
বুমরাহর ক্রিকেট-পাঠ অবশ্য শুরু হয়েছিল একটু দেরিতে। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়। শুরুর দিকে ইয়র্কার নয়, বুমরার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল বাউন্সার। স্কুলে রীতিমতো বাউন্সার স্পেশালিস্ট হিসেবে ডাকা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাউন্সারে সেভাবে সাফল্য আসছিল না। ত্রিবেদীর কথায়, "ব্যাটাররা শট খেলে দিচ্ছিল। কখনও আবার ব্যাটের কানায় লেগে বাউন্ডারি হয়ে যেত। তখন থেকেই ইয়র্কারের ট্রেনিং শুরু করে। আগে খুব একটা ইয়র্কার করত না। আমি ওকে বলেছিলাম, নিখুঁত ইয়র্কার করার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। বুমরাহ সেটা করত। স্কুলের পর দুপুর তিনটে নাগাদ চলে আসত। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে ইয়র্কার করে যেত। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে, নিখুত ইয়র্কার দিতে গেলে রিস্ট পজিশন কীরকম রাখতে হবে। আর এখন?
নতুন করে কিছু বলতে হবে। বিশ্বের এক নম্বর পেসার এখন। সেটা এমনি হয়নি। হয়েছে ওর পরিশ্রমের জন্য।"
আহমেদাবাদে থাকলে এখনও মাঝেমধ্যে স্কুলে আসেন বুমরাহ। গতবছর এসেছিলেন। দেশাই বলছিলেন, "ওর সবচেয়ে বড় গুণ কী জানেন, প্রচণ্ড সাদাসিধে। ছোট থেকেই শান্ত। কম কথা বলত। এখনও একইরকম রয়েছে। এতবছর দেশের হয়ে খেলার পরও এতটুকু বদলায়নি। আহমেদাবাদ আর মুম্বই, দু'টো শহরে থাকে। এখানে থাকলে মাঝেমধ্যেই চলে আসে। এই তো বিশ্বকাপের আগেই গুজরাট ইউনিভার্সিটির মাঠে প্র্যাকটিস করছিল। বুমরাহ একইরকম রয়ে গিয়েছে।'
স্কুল থেকে বেরনোর সময় আরও একটা লেখা চোখে পড়ল। ফাইনালের জন্য ভারতকে শুভেচ্ছাবার্তা লেখা। রবিবার পুরো নির্মাণ হাইস্কুল পুরনো ছাত্রের জন্য গলা ফাটাবেন। প্রার্থনা করছেন ত্রিবেদী স্যরও, কাপ জিতুক ভারত। সেরা হোক বুমরাহ।
এর চেয়ে ভালো গিফট আর কী হতে পারে ইয়র্কার কিংয়ের পরিজনদের।
