নারী দিবস মানে পুরুষদের প্রায়শ্চিত্তের দিন নয়। বরং নারীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারের দিন। স্বপ্নের মতো জয় পেয়েছে ভারত। তার পর থেকেই সমুদ্রের সাঁই-সাঁই ঢেউ আছড়ে পড়ছে মনে। এই তো মাস চারেক আগে কথা। ২ নভেম্বর, ২০২৫। আরও একটা স্বপ্নপূরণের রাত ছিল। মোম হয়ে অমাবস্যার আঁধেরা জ্বেলেছিলেন হরমনপ্রীত কৌর, স্মৃতি মন্ধানারা। নারী থেকে রানি হয়ে প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারতীয় মহিলা দল। আর এবার পুরুষ থেকে রাজা হয়ে নারীদিবসে ভুবনজয়ী সূর্যরা। গর্ব করে বলতেই হচ্ছে, ক্রিকেটবিশ্বে রাজা-রানি ভারতই।
কয়েক দশক আগেও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্য। মেয়েরা ক্রিকেট খেলবে, এমন বিশ্বাস করাটাও ছিল ‘অপরাধ’। একদিকে বিশ্বজোড়া খ্যাতির আহ্বান, অন্যদিকে মেয়ে মানেই ঘরকন্নাই মুখ্য – এমনই ‘অরূপকথা’র মতো সংস্কারে বিদ্ধ সমাজ কেবল ক্রিকেট নয়, যে কোনও খেলাতেই অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটা সময় নিরুৎসাহিত করে এসেছে। দুঃখ মন্থন করে ‘না পাওয়ার দেশ’টাকেই মানিয়ে নেওয়া, এটাই যেন বিশ্বাস করতে শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ‘ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে, গন্ধ সে চাহে ধূপেরে রহিতে জুড়ে’। নিজেদের জ্বালিয়ে গন্ধ ছড়িয়েছেন। জেদ, ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, মেজাজের যোগফলে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন পেয়েছেন মেয়েরা। কিন্তু তার আগে...
চোখটা বন্ধ করুন। এক লহমায় নিজের ভাবনাকে নিয়ে যান কয়েক দশক আগে। তখনও সব কিছু ছিল। জেদ, ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায়, মেজাজ – সব। ছিল না কেবল তাঁদের নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস। দুঃখ মন্থন করে ‘না পাওয়ার দেশ’টাকেই মানিয়ে নেওয়া। সেই অপ্রাপ্তিকে রপ্ত করে নিতে নিতেই যেন সাহসী হয়েছেন তাঁরা। নিজে নিজেই। কারণ কয়েক দশক আগেও ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে ছিল অদ্ভুত এক বৈপরীত্য। সেখান থেকে বিশ্বজয়। এরপর?
দুরন্ত ছন্দে ভারতীয় বোলাররা
সূর্যকুমার যাদব, হার্দিক পাণ্ডিয়াদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পাশে দাঁড়ালেন জেমাইমা রডরিগেজ, শেফালি বর্মারা। সত্যিই তো! ‘হামরা ছোড়ে ছোড়িসে কম হ্যায় কে?’ ‘ক্যাচফ্রেজে’র উলটপুরাণেই এমনটা যেন সম্ভব হল। আমির খান অভিনীত ‘দঙ্গল’ সিনেমাটা যাঁরা দেখেছেন, এই সংলাপটা তাঁদের পরিচিত। সেখানে অবশ্য ছেলেদের উদাহরণ টেনে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটের একেবারে টাটকা সাফল্যটা এনে দিয়েছে মেয়েরাই। আনন্দে উদ্বেল হয়েছিল ‘আসেতুহিমাদ্রি’। এবার ছেলেদের কাছেও সুযোগ ছিল মেয়েদের ‘পথ’ ধরে দেশকে গর্ব এনে দেওয়া।
সূর্যকুমার যাদব, হার্দিক পাণ্ডিয়াদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পাশে দাঁড়ালেন জেমাইমা রডরিগেজ, শেফালি বর্মারা। সত্যিই তো! ‘হামরা ছোড়ে ছোড়িসে কম হ্যায় কে?’ ‘ক্যাচফ্রেজে’র উলটপুরাণেই এমনটা যেন সম্ভব হল। আমির খান অভিনীত ‘দঙ্গল’ সিনেমাটা যাঁরা দেখেছেন, এই সংলাপটা তাঁদের পরিচিত। সেখানে অবশ্য ছেলেদের উদাহরণ টেনে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল।
তার জন্য নতুন স্লোগানও তৈরি করে ফেললেন শেফালিরা। সামনে রাখেন মহিলাদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ ট্রফিটা। তারপরই হরিয়ানার শেফালি নিজের ঢংয়ে বলেন, “হামরা ছোড়ে ছোড়িসে কম হ্যায় কে?” এভাবেই লিঙ্গবৈষম্য ঘোচানোর চেষ্টা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কথা রাখলেন ভারতের ছেলেরা। ধূপের মতো নিজে পুড়ে সুগন্ধ ছড়ানোর উদাহরণ পুরুষ দলেও ভূরি-ভূরি। লড়াইয়ের গল্পটা যেন কোথাও গিয়ে মিলে যায়। যেমন সঞ্জু স্যামসন। সূর্যকুমার যাদব। যেমন অভিষেক শর্মা। ঈশান কিষান। অক্ষর প্যাটেল থেকে জশপ্রীত বুমরাহ, রিঙ্কু সিং প্রত্যেকে। কথা রাখলেন তাঁরা। দুরতিক্রমণীয় দিনগুলি রাতগুলি পেরতে হয়েছে তাঁদেরও। বিশ্বকাপের আগে রানখরা চলছিল সঞ্জুর। নানান উত্থান-পতনের সাক্ষী ছিলেন। নিজের পছন্দের জায়গা হারিয়েছেন। দল থেকে বাদ পড়েছেন। আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর ব্যাটে ভর করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছাপ রেখে গিয়েছে ভারত। ফাইনালেও তাঁর ব্যাটের আগুন ঝলমল করে উঠল। আর সূর্য? সাম্প্রতিক অতীতে ব্যাটে রান আসছিল না। গত বছর একটিও অর্ধশতক করতে পারেননি। তবু কেরিয়ারে ওঠাপড়া দেখেও বলেছিলেন, “আপনি অবশ্যই সূর্যকে ফিরে আসতে দেখবেন।” সেই সূর্য নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেতাবি লড়াইয়ে ব্যাটিংয়ে ব্যর্থ হলেও তাঁর হাতেই আজ 'রাজত্বে'র ব্যাটন।
এভাবেই লিঙ্গবৈষম্য ঘোচানোর চেষ্টা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কথা রাখলেন ভারতের ছেলেরা। না না। তাঁদের দেশটায় ‘অরূপকথা’ নির্যাস অতটা নেই। কিন্তু লড়াইয়ের গল্পটা যেন কোথাও গিয়ে মেলে। যেমন সঞ্জু স্যামসন। সূর্যকুমার যাদব। যেমন অভিষেক শর্মা। ঈশান কিষান। যেমন... প্রত্যেকে। কথা রাখলেন।
এবার অভিষেকের কথা। এবারের বিশ্বকাপটা তাঁর কাছে কাঁটা বিছানো ছিল। ফাইনালের আগে জিম্বাবোয়ে ম্যাচটা ছাড়া রান আসেনি। তাতে কি? টিম ম্যানেজমেন্ট পুরোদস্তুর পাশে ছিল বাঁহাতি ওপেনারের। পেস হোক কিংবা স্পিন, এই বিশ্বকাপে বারবার সমস্যায় পড়েছেন অভিষেক। এ হেন পরিস্থিতির নাগপাশে পড়েই 'অভিশপ্ত' বিশ্বকাপ ফাইনালের মাঠে বিশ্বরেকর্ড গড়ে মেজাজি পঞ্চাশ হাঁকালেন তিনি। তাও আবার আঠারো বলে। সমালোচকদের যেন জানিয়ে গেলেন, 'স্লগার' নন, বড় মঞ্চের জন্য তিনি তৈরি।
সময় আমাদের বড় শিক্ষক। যা বহু কিছু শিখিয়ে যায় প্রতি মুহূর্তে। সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে সর্বোচ্চ রান করেও জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন না ঈশান কিষান। অথচ কে জানত, ফিনিক্সের মতো জাতীয় দলে ফিরবেন তিনি! সকলকে চমকে দিয়ে উইকেটকিপার-ব্যাটার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন। নীল জার্সি গায়ে চাপিয়েই জাত চিনিয়েছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইনিংসটার কথাই ভাবুন। চিরস্মরণীয়। ফাইনালেও বা ছাড় দেবেন কেন? ফাইনালের ইনিংস দেখে ভারত বুক বাজিয়ে বলবেই বলবে 'জয় ঈশান'। বুমরাহই বা বাদ যাবেন কেন? ফাইনালেও অমন আগুনে স্পেলের পর ম্যাচের শেষে জয়ের উচ্ছ্বাসে তাঁর দু’হাত মুষ্ঠিবদ্ধ। চোখ দু’টি স্থির। স্বপ্নপূরণের সেই সরণিতে আরও একবার হেঁটে বিশ্বজয় করলেন। দু’টো বছর আগে, বার্বাডোজে ঠিক এইভাবেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন। রবিবার সেই স্বপ্নেরই পুনরাবৃত্তি। রিঙ্কু সিংয়ের কথা না বললেই নয়। তিনি প্রথম এগারোয় নেই। ফিল্ডিং করেছেন। বাবার দাহকার্য সেরেই জাতীয় শিবিরে যোগ দেওয়ার ঘটনা চোখে জল এনে দিয়েছে সকলের। ক্রিকেটার হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্পগুলি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরেও ত্যাগের কিসসা থেমে থাকে না। জীবন হয়তো এভাবেই শিখিয়ে-পড়িয়ে নেয়, খেলার মতো, খেলোয়াড়দের মতো, সময়ের মতো। নারী দিবসের রাতে এভাবেই সূর্যোদয়। আরও একবার। ভুবনজয়ী ছেলেরা। সত্যিই ‘হামরা ছোড়ে ছোড়িসে কম নেহি হ্যায়’। ক্রিকেটবিশ্বে রাজা-রানি ভারতই। ২ নভেম্বরের পর ৮ মার্চ। পুরুষদের এমন ধন্যবাদই তো বারেবারে জানাতে চেয়েছেন মেয়েরা।
