নিউজিল্যান্ড নয়, রবিবার ভারতের প্রতিপক্ষ স্বয়ং টিম ইন্ডিয়াই! ক্রিকেটীয় পরিমণ্ডল এটাই ব্যাখ্যা দিচ্ছে। কারণ ভারতবাসী ধরেই নিয়েছে, রবিবার বিকেলে তারা রিকি মার্টিন শুনবে। ফাল্গুনী পাঠক শুনবে। তার পর পরপর দু'বার টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের সুখ নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরবে। সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিতে পারে গৌতম গম্ভীরের ছাত্ররাই।
আসলে ঝঞ্ঝাট পাকিয়েছে নিউজিল্যন্ড। তার অস্ট্রেলিয়া নয়। ইংল্যান্ড নয়। নিদেনপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজও নয়। ব্ল্যাক ক্যাপসরা বরাবরের 'লো প্রোফাইল' টিম। দর্শনমাত্র তাদের কেউ ভয় পেয়ে যায় না। বিরাট কোহলি বলতেন, ক্রিকেটের সবচেয়ে ভদ্র টিমের নাম নিউজিল্যান্ড। টিমে খেলা প্রতিটা প্লেয়ার আদ্যোপান্ত ভদ্রলোক। ক্রিকেটের সঙ্গে কর্কশ আচরণ তারা কখনও মেশায় না। তাই নিউজিল্যান্ড পৃথিবীর সমস্ত দেশের ক্রিকেট সমর্থকরা ভালোবাসে, পছন্দ করে, তারা জনতার টিম, তাদের হৃদয়ের টিম। ব্ল্যাক ক্যাপস অধিনায়ক মিচেল সান্টনার সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন বটে, কিছু হৃদয় ভঙ্গ করে একটা আইসিসি ট্রফি যদি আসে, আসুক। কিন্তু মনে হয় না, স্যান্টনারের কথা শোনার পরেও কেউ ভয়ডর পাবে বলে। বাহ্যিক ভাবে অন্তত পাবে না। তা সে যতই টিম সাইফার্ট আর ফিন অ্যালেন ইডেনে সেমিফাইনালে কাগিসো রাবাডাদের পিটিয়ে ছাতু করে আহমেদাবাদ ফাইনাল খেলতে আসুন। স্টেডিয়াম আসার সময় উবার ড্রাইভার বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন, ফাইনালে ভারতের সঙ্গে খেলবে কে? ভদ্রলোক জানতেন না। নিউজিল্যান্ড জানার পর, সামান্য আগ্রহও আর দেখলেন না।
সাধারণত টিমের জুনিয়রদের আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যান না সূর্য। শাসন-টাসন করেন না। উল্টে সরস ভাবে বলেন, "আরে, ওদেরই তো রাজত্ব চলে টিমে। আমি বলতেই পারি। কিন্তু শুনবে কে? আমি বরং ওদের স্বাধীনতা দিয়ে দিই। পুরো ছেড়ে দিই। আর স্বাধীনতা পেলে, ওর মাঠে প্রতিপক্ষকে নিয়ে যা ইচ্ছে করে আসে।"
ক্রিকেটীয় পরিমণ্ডল বরং বলছে, রবিবার ভারতের প্রতিপক্ষ একটাই দল, স্বয়ং ভারত! গৌতম গম্ভীরের টিমের প্লেয়াররা যদি গোলযোগ বাঁধান, এক লক্ষের স্টেডিয়ামে নেমে একশো চল্লিশ কোটি জনতার প্রত্যাশার চাপ যদি তারা অনুভব করতে থাকেন, তা হলে একমাত্র ভারত ফাইনাল হারতে পারে। নইলে নয়। নয়তো আড়াই বছর পূর্বের অভিশপ্ত বিশ্বকাপ ফাইনালের অমানিশা চিরতরে ধুয়েমুছে ফেলতে বিশেষ অসুবিধে হবে না। শনিবার রাত পর্যন্ত দলের 'আবহাওয়া' ঠিকই আছে। ঝড়-বাদল বা পরিপূর্ণ দুর্যোগের ইঙ্গিত তেমন অন্তত নেই (শুধু দু'টো কাঁটা বাদে। অভিষেক আর বরুণের ফর্ম। যদিও তা নিয়েই ম্যাচের পর মাচ জিতে চলেছে ভারত। সূর্যও তেমন চিন্তিত নন) ভারতীয় দলের কোচ এবং অধিনায়ক-দু'জনের মন্ত্রই সেমিফাইনাল পর্যন্ত কাজ করেছে। গম্ভীর চান না, টিমের নির্দিষ্ট এক বা দু'জনকে নিজে অতিরিক্ত নাচানাচি হোক। ব্যক্তিপুজো, তারকা-প্রথা নয়। গম্ভীরের কাছে টিমই সব, এগারোর এগারোই গুরুত্বপূর্ণ।
"গৌতি ভাই কালচারটাই পাল্টে দিয়েছে। ওর কাছে যে হাফসেঞ্চুরি করছে আর যে ৭ বলে ২১ করছে, দু'জনেই সমান," সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন সূর্য। টি-টেয়ান্টি বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত তাই ঘটছে। ইডেন এবং ওয়াংখেড়েতে সঞ্জু সামসনের দু'খানা দুর্ধর্ষ ইনিংসের সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দু'টো বাউন্ডারি, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিলকের ৭ বলে ২১। ভারত অধিনায়কের দর্শনও কাজ করছে দিব্য। সাধারণত টিমের জুনিয়রদের আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যান না সূর্য। শাসন-টাসন করেন না। উল্টে সরস ভাবে বলেন, 'আরে, ওদেরই তো রাজত্ব চলে টিমে। আমি বলতেই পারি। কিন্তু শুনবে কে? আমি বরং ওদের স্বাধীনতা দিয়ে দিই। পুরো ছেড়ে দিই। আর স্বাধীনতা পেলে, ওর মাঠে প্রতিপক্ষকে নিয়ে যা ইচ্ছে করে আসে। শুনুন, ওদের কান-টান ধরে, বা ওদের বাবা-জ্যাঠা সেজে কোনও লাভ নেই। তার চেয়ে স্বাধীনতা দিয়ে দাও। বাকিটা ওরা করে দেবে।"
দিন না, দিন। আর একটা তো দিন, একটা তো ম্যাচ। আড়াই বছর পূর্বের সেই অভিশপ্ত ফাইনালে খেলেছিলেন সূর্য। কাপ জিততে পারেননি। রোহিত-বিরাটের কান্নার শরিক হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। আজ তিনি আবার ফিরছেন সে মাঠে, ফিরছেন আর এক বিশ্বকাপ ফাইনালে। বিরাট-রোহিতের মতো ক্রিকেট-প্রাজ্ঞরা যা পারেননি, তা আড়াই বছর পর সুর্যর নূতন যৌবনের দূতরা যদি সবরমতী তীরে করে দেখায়, মন্দ কী?
