ভুবনবিখ্যাত পারফর্মার প্রভাব বিচারে কতটা বিত্তশালী, তা নির্ণয় করে দুই মানদণ্ড। প্রথমত, তার জনপ্রিয়তা। তাকে নিয়ে জনমানসের ঘোর। আর দ্বিতীয়ত, তাকে নিয়ে উৎকট গল্পগাছা। গুলতাপ্পি।
তা, সে প্রেক্ষিতে আমেদাবাদে বোধহয় ভারতীয় টিমের ক্রিকেটারদের মধ্যে জসপ্রীত বুমরাহ অনতিক্রম্য। ঘরের ছেলেকে আহমেদাবাদের ভালোলাগা-ভালোবাসা যে থাকবে, অনুমেয়। আছেও পুরোদস্তুর। আর সঙ্গে আছে, সঠিক মওকা বুঝে গাঁজাখুরি গল্প অক্লেশে চালিয়ে দেওয়া! শনিবার যেমন। এক মোটর চালক গাড়িতে জনা চারেক ভিন রাজ্যের ক্রিকেট সাংবাদিককে পেয়ে অনায়াসে চালিয়ে দিলেন যে, আমেদাবাদের এইচকে কমার্স কলেজে তিনি বুমরার দু’ক্লাস জুনিয়র ছিলেন! সে কলেজের হলে নাকি বুমরার ভারতীয় দলে প্রথম ডাক পাওয়ার খবর ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল! মজার হল, জীবনে কখনও এইচকে কলেজে পড়েনইনি বুমরাহ! তিনি পড়াশোনা করতেন বস্ত্রপুরের নির্মাণ হাইস্কুলে। প্রথমে লিখলাম না, মহাতারকাকে ঘিরে ঘোর। আর সে ঘোরকে লতাপাতার মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে মনের মাধুরী মেশানো গল্প যখন অকাতরে ছড়িয়ে দেয় জনতা, সে মহাতারকার প্রকৃত বোলবোলাও বোধগম্য হয়।
দুঃখের হল, এত কিছুর পরেও জসপ্রীত বুমরাহ কিছুতেই রোববারের আহমেদাবাদের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। সেটা যিনি, তাঁকে এ দিন দফায়-দফায় আমেদাবাদের পিচের কাছে অনবরত পায়চারি করতে দেখা গেল। সাদা টি শার্ট পরে। যিনি পেশায়, পিচ কিউরেটর। আসলে আহমেদাবাদ পা দেওয়ার পর থেকে পিচ নিয়ে এত চর্চা-বিশ্লেষণ শুনছি-দেখছি, তার পর ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট যুদ্ধটাই প্রায় গৌণ হয়ে গিয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে দশটা প্রশ্নের সাতটা হচ্ছে পিচকে নিয়ে, ইনিয়ে-বিনিয়ে, নানান ভাবে।
বল ঘুরবে? নাকি ঘুরবে না? ঘুরলে কতটা ঘুরবে?
বিভ্রান্তি আরও বাড়াচ্ছে ভারতীয় দলের কাজকর্ম। শনিবার ভারতীয় দলের ট্রেনিং সেশন ছিল দুপুর দু’টো থেকে। কিন্তু দুপুর একটা নাগাদ ‘হুটার’ বাজিয়ে মাঠে ঢুকে পড়লেন গৌতম গম্ভীর সহ জনা চারেক। এবং মাঠে ঢুকে ভারতীয় কোচের গন্তব্য কী হল, বুঝতে বুদ্ধি খরচ প্রয়োজন হয় না। সাদা-সাদা রংয়ের আমেদাবাদ পিচ। কখনও একা, কখনও টিমের ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটাককে সঙ্গে নিয়ে পিচ দর্শনের বিবিধ পর্ব চলল গুরু গম্ভীরের। এরপর সন্দেহ তো জাগবেই যে, হচ্ছেটা কী? তিন বছর পূর্বে এক বিশ্বকাপ ফাইনালে আমেদাবাদ পিচ নিয়ে বাড়াবাড়ি করার পরিণিতি কী হয়েছিল, তার কৃষ্ণ স্মৃতি তো আজও ধূসর হয়নি। সে দিনও বাইশ গজ নিয়ে ফাইনালের আগে দফায়-দফায় বৈঠক করেছিলেন তৎকালীন ভারতীয় কোচ-অধিনায়ক। দ্রাবিড় এবং রোহিত। আর প্যাট কামিন্সরা স্রেফ মোবাইলে পিচের ছবি তুলে, যা বোঝার বুঝে, বিশ্বকাপ ফাইনালটাই শেষ পর্যন্ত নিয়ে চলে যান! শঙ্কিত জাতীয় মিডিয়া সার্কিটের মনে হচ্ছে যে, পিচ নিয়ে নাটক পুনরায় যা শুরু হয়েছে, তালেগোলে না রোববারের সুপার এইটের ম্যাচটা গচ্চা চলে যায়! শোনা গেল, তাজা পিচ বরাদ্দ থাকছে রোববার। এবং তা নিয়ে বিশাল কোনও দাবিদাওয়া নাকি পেশ করেনি ভারত। দুরন্ত ঘূর্ণি চায়নি। আবার পুরোপুরি ফ্ল্যাট ট্র্যাকও চায়নি। ভারত নাকি চায়, বল ঘুরুক। তবে খুব বেশি নয়।
ভারতীয় দলের অনুশীলন। ফাইল ছবি।
স্বাভাবিক। বল বেশি ঘুরলে, বিপদে যে ভারতীয় টিমকেও পড়তে হবে, কে না জানে? গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে এখনও পর্যন্ত কিম্ভুতকিমাকার সব বাইশ গজে খেলতে হয়েছে। যার পরিণতি শত শতাংশ সুখের কখনওই হয়নি। ওয়াংখেড়েতে ৭৭ রানের মধ্যে সাত উইকেট চলে গিয়েছিল। আমেদাবাদে ডাচদের বিরুদ্ধে গত ১৮ ফেব্রুয়ারির খেলাতেও প্রতিপক্ষ স্পিনাররা ভুগিয়েছেন টিমের জাঁদরেল ব্যাটারদের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, অফস্পিনার দিয়ে বিপক্ষের বোলিং ‘ওপেন’ করানোর ট্রেন্ড। যা বুঝছি, রোববার তা বোধহয় আবার হবে। কারণ, এডেন মার্করাম এ দিন নেটে ঢুকে সর্বপ্রথমে স্পিন বোলিং করা শুরু করে দিলেন!
আর তাই, গ্রুপ পর্বে চারে চার করার পরেও ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবকে সাংবাদিকদের খোঁচাখুঁচি সহ্য করতে হচ্ছে বিস্তর। জনতার মনের মতো ক্রিকেট টিম খেলতে পারছে না যে! শনিবার তাঁকে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা তো এখনও টুর্নামেন্টে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেননি। শুনেটুনে সূর্য বললেন, ‘‘আমরা একশো নব্বই, দু’শো তো তুলছি স্যর। আসলে নিজেদের উপর প্রত্যাশাটা আমরা নিজেরাই বাড়িয়ে দিয়েছি। আগে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে আমরা তুখোড় ক্রিকেট খেলছিলাম। আর এখন যেটা খেলছি, তা হল নর্মাল ক্রিকেট।’’ ভারত অধিনায়ক বলে গেলেন, তাঁরা এমন টিম হতে চান না, যারা মাঠে নেমে কোনও দিক না দেখে, দমাদম চালাবে। বরং তাঁরা এমন টিম হতে চান, যারা স্মার্ট ক্রিকেট খেলবে। কারণ, টি-টোয়েন্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রিকেট খেললে, দু’চার উইকেট চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর তা হলে, ওড়ানোর পন্থা নিলে চলবে না।
যাক গে। দলের খবরাখবরে আসা যাক। অভিষেক শর্মা বা তিলক বর্মার জায়গায় কোনও ভাবে সঞ্জু স্যামসন টিমে চলে আসবেন কি না, সে প্রশ্ন স্বয়ং সূর্যই শনিবার নস্যাৎ করে দিয়ে চলে গিয়েছেন। পড়ে থাকল বোলিং। শোনা যাচ্ছে, কুলদীপ যাদবের জায়গা দলে না-ও হতে পারে। অর্শদীপ সিং খেলতে পারেন। তবে বাকি দুই স্পিনার অক্ষর প্যাটেল এবং বরুণ চক্রবর্তী খেলছেন। শেষের জনকে নিয়ে আবার বিস্তর কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা ছাউনিতে। ভারতের বিরুদ্ধে বরাবর ভালো পারফর্ম করা কুইন্টন ডি’কক এসেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাংবাদিক সম্মেলনে। তিনি বলে গেলেন, টুর্নামেন্টে ন’উইকেট পাওয়া বরুণকে খেলা সহজ হবে না। টিমের প্রত্যেককে নিজেদের ‘ইন্সটিঙ্কট’ ব্যবহার করে বরুণ-দেবতার মোকাবিলা করতে হবে। এটা না জেনেও লিখে দেওয়া যায়, বরুণ-রহস্যের বিশল্যকরণীর খোঁজে কুইন্টনেরই শরণাপন্ন হবে প্রোটিয়ারা। কারণ, গত বছর পর্যন্ত আইপিএলে কেকেআরে খেলেছেন কুইন্টন। নিয়মিত বরুণের বোলিংয়ে ‘কিপ’ করেছেন। ভারতীয় স্পিনারের প্যাঁচ-পয়জার তাঁর চেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা টিমে আর কে ভালো বুঝবে?
ওহো, এতক্ষণ লেখাই হয়নি। কুইন্টন, বাইশ গজের মর্জি-মেজাজ ছাড়াও আরও একটা বিষয় রয়েছে, যা ঈষৎ চাপে ফেলতে পারে ভারতকে। নেদারল্যান্ডস ম্যাচের আগের দিন আমেদাবাদ মাঠে সন্ধেয় ট্রেনিং করতে এসে, যার উপস্থিতি প্রবল রকম টের পেয়েছিলেন সূর্যকুমাররা। যা বিপুল পরিমাণে নেমে এলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যেতে পারে টস। সে ‘শত্রু’-কে নিষ্ক্রিয় করতে চেষ্টাচরিত্র চলছে বটে। কেমিক্যাল প্রভৃতি দিয়ে। কিন্তু ক্রিকেট-প্রকৃতির বিরুদ্ধে কে আর লড়ে সব সময় জিততে পেরেছে? কার কথা লেখা হচ্ছে বুঝতে পারলেন না? সহজ তো। উত্তর, জলবৎ তরলং। রাতের আকাশ থেকে নেমে আসা সহস্র শিশিরবিন্দু!
আজ টিভিতে
ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা
আমেদাবাদ, সন্ধে ৭.০০
স্টার স্পোর্টস
