'রিঙ্কু, একটা মিড অন রেখেছি। ও দিক থেকে একটা ছয় বার কর।'
'ঈশান, তোর জন্য একটা মিড অফ, একটা মিড উইকেট দিলাম। পারবি তো?'
'সাবাশ ভাই, সাবাশ!'
শনিবারের বারবেলা। উপর বর্ণিত কথোপকথন অনুমান নির্ভর বটে, তবে দৃশ্যপট কখনওই নয়। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ভেতরে কে কী বলছেন-টলছেন, শোনা যায় না বিশেষ। কিন্তু মানুষটাকে তো দিব্য দেখতে পাচ্ছি। টিম জার্সি পরে দাঁড়িয়ে। রিঙ্ক-ঈশানরা যে পিচে ব্যাট করছেন, তার নাক বরাবর। সচরাচর গৌতম গম্ভীর যেখানে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত দেখেন। কিন্তু আজকের মতো সে স্থলে গম্ভীর নেই। আজকের মতো সেখানে সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav), ওরফে ক্যাপ্টেন অফ ইন্ডিয়া!
বহু দিন যাবৎ ভারতীয় টিমের রীতি হল, খেলার আগের দিন, যতটা কম সম্ভব, ট্রেনিং করো। শুভমান গিলের মতো নাছোড় কেউ কেউ হলে আলাদা কথা। কিন্তু সাধারণত, খেলার আগের দিন দু'চার জন প্লেয়ারের বেশি মাঠে আসেন না। তাঁরা জিম করেন। বিশ্রামে থাকেন। নিজেদের তাজা রাখেন। এ দিনও তার ব্যত্যয় হয়নি। রিঙ্কু-ঈশানের কথা লিখলাম। আর এসেছিলেন কুলদীপ যাদব এবং অধিনায়ক স্বয়ং। সূর্য এ দিন ছুটকো স্ট্রেচিংয়ের বাইরে কিছুই করেননি। ব্যাটিং-ইত্যাদি, কিস্যু না। বরং ভারত অধিনায়ককে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবিষ্কার করা গেল শনিবার।
নেট নেতার ভূমিকায়!
সূর্যকে যাঁরা জানেন-চেনেন, তাঁরা একটা কথা প্রায়শই বলেন মুম্বইকরকে নিয়ে। তা হল, তিনি গভীর ভাবে রোহিত শর্মর নেতৃত্ব মন্ত্রে দীক্ষিত। বলা হয়, ক্রিকেটে দুই প্রজাতির ক্যাপ্টেন থাকেন। এক, যাঁরা শুধুই ড্রেসিংরুমের মধ্যে নিজের নেতৃত্বকে সীমাবদ্ধ রাখেন। খেলা মিটে গেলে ক্যাপ্টেন্সির দায়-দায়িত্বও তাঁদের চুকেবুকে যায়। দ্বিতীয় প্রজাতি আবার শুধুই ড্রেসিংরুম সীমানায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করেন না। তাঁরা প্লেয়ারের দেখভাল, ভালো থাকা-মন্দ থাকাকে প্রভৃত গুরুত্ব দেন। যাঁরা বিশ্বাস করেন, একটা স্কোয়াডে অধিনায়ক সবচেয়ে গুরুত্বহীন চরিত্র! সতীর্থদের দরকার শেষ হলে নিজেকে নিয়ে, নিজের খেলা নিয়ে ভাবার ফুরসত পান তাঁরা। রোহিত শর্মা যেমন। সূর্যকুমার যাদব যেমন। তিলক বর্মা আবদার করেছিলেন বলে, এক কথায় নিজের পছন্দের তিন নম্বর স্লট ছেড়ে দিয়েছিলেন সূর্য। তিলক কিন্তু আজও তিনে ব্যাট করেন। সূর্য যান চারে। টিমের প্রয়োজনে ব্যাটিং অর্ডারে আরও পরে যেতে তাঁর যে কোনও অসুবিধে নেই, বলেও দেন অক্লেশে। আর এ দিন দুঃসহ ফর্মের নাগপাশে বন্দি অভিষেক শর্মার পিঠে যে উদারতা দেখিয়ে সূর্য বলে গেলেন, "গত এক বছর আমাদের কাজ অভিষেক একা করেছে, এবার না হয় আমরা করব ওর কাজ," পৃথিবীর খুব বেশি ক্রিকেট অধিনায়কের তা বলার কলজে নেই। সূর্যর ঘনিষ্ঠ একজন এদিন বলছিলেন, এটাই স্বাভাবিক। এটাই সূর্যকুমার যাদব। যাঁর কাছে সতীর্থ থেকে মাঠের মালি, সবাই অগ্রাধিকার পায়। যাঁদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে যাবতীয় সুখ-দুঃখের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খ জেনে, নিরুপায়ের ক্ষেত্রে উপায় বাতলে দিয়ে তবে মাঠ ছাড়েন! এবং তাঁদের পক্ষ নিয়ে প্রয়োজনে গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়তে হলেও দু'বার ভাবেন না!
শুনলাম, শৈশব-কৈশোর থেকেই সূর্য তাই। সহজ-সরল। জমিতে পা রেখে চলা এক মধ্যবিত্ত যাপনে বিশ্বাসী এক মানুষ। সূর্যর পিতা কাজ করতেন ভাবা অ্যাটোমিক রিসার্চ সেন্টারে। পেশার খাতিরে চেম্বুরের অনুশক্তিনগরের ছোট কোয়ার্টারে সপরিবার থাকতেন। চেম্বুর দেশের অনেক নামী চরিত্রের লড়াইয়ের ময়দান এমনিতে। বলিউড অভিনেতা অনিল কাপুর থাকতেন এককালে। রাজ কাপুরের বিখ্যাত আরকে স্টুডিও ছিল সেখানে। বিদ্যা বালানের জীবনের শুরুও চেম্বুরে। কিন্তু দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মানুষ বিত্তের মুখ দেখলে ভিটেমাটি বদলায়। বিত্তশীল জায়গার খোঁজ করে। সেখানে থাকে। সূর্যও পারতেন জুহু বা বান্দ্রায় বিশাল একখানা ফ্ল্যাট বা বাড়ি করে চলে যেতে। দেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক তিনি। আইপিএলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে খেলেন। অর্থ তাঁর কম নেই। কিন্তু সূর্য যাননি। তিনি বাড়ি বদলেছেন বটে। কিন্তু চেম্বুর থেকে যাননি। পরিবারকে ছেড়ে দূরে থাকতে পারবেন না, তাই।
সূর্যও পারতেন জুহু বা বান্দ্রায় বিশাল একখানা ফ্ল্যাট বা বাড়ি করে চলে যেতে। দেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক তিনি। আইপিএলে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে খেলেন। অর্থ তাঁর কম নেই। কিন্তু সূর্য যাননি। তিনি বাড়ি বদলেছেন বটে। কিন্তু চেম্বুর থেকে যাননি। পরিবারকে ছেড়ে দূরে থাকতে পারবেন না, তাই।
আসলে ওই যে লিখলাম, সূর্য প্রথম থেকে সহজ-সরল। উচ্চবিত্ত সমাজের অংশ হয়েও প্রবল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধে বিশ্বাসী। টিম, পরিবার, নিকট-বান্ধব, প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনে সাধ্যের বাইরে গিয়ে কিছু করা যাঁর স্বভাব। সরফরাজ খানকে নিয়ে গল্পটা তো মুম্বই ক্রিকেটে লোকগাথার পর্যায়ে চলে গিয়েছে। সরফরাজকে এমনিতে খুব পছন্দ করেন সূর্য। শোনা যায়, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যে টেস্টে অভিষেক হয় সরফরাজের, সেই রাজকোটে যাওয়া নিয়ে দ্বিধায় ভুগছিলেন তাঁর পিতা নৌশাদ খান। যে খবর জানা মাত্র নাকি সূর্য তাঁকে ফোন ঘুরিয়ে বলেন, রাজকোট চলে যেতে। কারণ, এ মুহূর্ত একজন পিতার জীবনে দ্বিতীয়বার আসবে না!
যা শোনার পর, সূর্যের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা ঝুঁকে যায় আপনাআপনি। মনে হয়, ইন্ডিয়া ক্যাপ্টেন ছাড়াও তাঁর ক্ষেত্রে বোধহয় আর একটা বিশেষণ ব্যবহারের সময় হয়েছে।
পিপলস ক্যাপ্টেন! জনগণমন অধিনায়ক!
