shono
Advertisement

Breaking News

T20 World Cup

ক্রিকেটের জন্য চাকরি গেছে! অনিশ্চিত ভবিষ্যতেও বিশ্বকাপের টানে কলকাতায় ইটালির 'বিদেশি' ক্রিকেটাররা

আদতে 'অভিবাসী' ওঁরা। বিভিন্ন দেশ থেকে পূর্বপুরুষরা বহু বছর পূর্বে চলে গিয়েছিলেন ইটালি। এবং ওঁরাও পাওলো মালদিনি-আন্দ্রে পির্বেদের দেশে থাকতে থাকতে কবে যে মনেপ্রাণে ইটালীয় হয়ে গিয়েছেন, নিজেরাও জানেন না।
Published By: Anwesha AdhikaryPosted: 01:00 PM Feb 08, 2026Updated: 01:55 PM Feb 08, 2026

কেউ পিৎজা বানান। কেউ কাজ করেন কুরিয়ার সার্ভিসে। কেউ মেশিন অপারেটর। কেউ বা চালান 'উবার'। করবেন কী, দিন শেষে পেশা যে। সংসার আছে। দায় আছে। দায়িত্ব আছে। স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ আছে। কিন্তু দিন শেষে সমস্ত ছাড়তে হচ্ছে। সব ছেড়েছুড়ে ভারতে আসতে হচ্ছে। করার নেই কিছু। নেশার টান, ওঁদের কাছে বড় টান। যার কাছে আপাতত নতজানু হচ্ছে পেশা। নেশার নাম? ক্রিকেট। নেশার মঞ্চ? কেন, বিশ্বকাপ। এঁদের কেউ ভারতীয়। কেউ পাকিস্তানি। কেউ শ্রীলঙ্কার। সব আদতে 'অভিবাসী' ওঁরা। বিভিন্ন দেশ থেকে পূর্বপুরুষরা বহু বছর পূর্বে চলে গিয়েছিলেন ইটালি। এবং ওঁরাও পাওলো মালদিনি-আন্দ্রে পির্বেদের দেশে থাকতে থাকতে কবে যে মনেপ্রাণে ইটালীয় হয়ে গিয়েছেন, নিজেরাও জানেন না। সময়ের নিয়মে সেদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে, জল-বাতাসে বড় হয়ে, ক্রিকেট খেলায় নাম লিখিয়ে, শেষ পার্যন্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে চলে এসেছেন এ শহরে। কলকাতায়। ইটালির হয়ে জীবিকাকে স্বেচ্ছায় 'বিসর্জন' দিয়ে।

Advertisement

ভারতের জশপ্রীত সিং যেমন। ইটালি পেস-আক্রমণের অন্যতম ভরসা। দশ-এগারো বছর বয়সে চলে গিয়েছিলেন 'কলোসিয়ামে'র দেশে। বিগত বছর কয়েক হল পরিবারকে নিয়ে ইংল্যান্ড 'শিফট' হয়েছেন। পেশায় 'উবার' চালক যিনি। শুক্রবার সন্ধেয় 'সংবাদ প্রতিদিন'-কে ফোনে বলছিলেন, "ইটালি যাওয়ার পর ভেবেছিলাম, ফুটবলার হব। যতই হোক, দিন শেষে ফুটবলের দেশ। কিন্তু খোঁজখবর নিয়ে যখন জানলাম যে, ইতালিতে ক্রিকেটের চল রয়েছে, ক্লাব ক্রিকেট হয়, দু'বার ভাবিনি।" কিন্তু 'নেশা'-কে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে পেশায় টান পড়ল যে। 'উবার' চালানোর দায়ভার কাউকে দিয়ে-টিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এলেন নাকি? সহাস্যে জশপ্রীত এবার উত্তর দেন, "ধুর, উবার। শুনুন, আমি নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী চালাতাম। ক্রিকেটকে দিয়ে যতটুকু সময় পড়ে থাকত, তখন উবার চালাতাম। ক্রিকেটের অন্য সব কিছু ছাড়া সম্ভব। কোনও কিছুর জন্য ক্রিকেট ন্যয়।" আবার বলি, কিন্তু চাকরিটা তো থাকবে না। ফুৎকারে ফের উত্তর আসে, 'ছাড়-টাড়া আবার কী? গত দু'মাস ধরে উবার তো চালাই-ইনা।" কেন। "কেন আবার? বিশ্বকাপ। ট্রেনিং করতে হবে না?"

কী বলব, এরপর কী বলা উচিত, ক্রিকেট সাংবাদিক হয়েও বোধগম্য হয় না। আর একা জশপ্রীতের কথাই বা লিখছি কেন? শ্রীলঙ্কাজাত ত্রিশান কালুগামাগে-র কথাই যদি বলি, তিনিও তো কাজ হারিয়ে কাপের সাধে ভারতে এসেছেন। পিৎজা বানাতেন ত্রিশান। সেই আয় দিয়ে জীবনযাপন চলত। কিংবা সইদ নকভি। কুরিয়র সার্ভিসে কাজ করতেন যিনি। বা কারখানায় মেশিন অপারেটর আলি হাসান। এঁদের কারও কাজ আর থাকবে না। নেই। বিশ্বকাপ খেলে ফিরে গিয়ে পুনরায় ছুটতে হবে জীবিকার সন্ধানে, আশা-আশঙ্কার দোলাচলে। ইটালি টিমের ম্যানেজার রাকবির হাসান ফোনে দুঃখ করে বলছিলেন, "এক-দেড় মাস কাজ না করলে কারই বা চাকরি থাকে বলুন। কিন্তু কী করা যাবে? বিশ্বকাপ যে বিশ্বকাপই।"

অভিভূত লাগে শুনলে। দেখতে ইটালিতে ক্রিকেট নামক খেলাটার প্রচলন শতাব্দী প্রাচীন বটে (বিশ্বাস না হলে, এসি মিলান ক্লাবের প্রতিষ্ঠা খেয়াল করবেন। এবং মিলান কিন্তু শুধুই ফুটবল নয়, ফুটবল অ্যন্ড ক্রিকেট ক্লাব)। সে দেশে দু'খানা পঞ্চাশ ওভারের টুর্নামেন্ট, দু'খানা টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট, ক্লাব ক্রিকেট, মহিলাদের ক্রিকেট নিয়মিত হয়। কিন্তু তার পরেও খেলাটার প্রসর পাওলো রোসির দেশে কখনওই বিশেষ ঘটেনি। নিখাদ ইটালীয় যাঁরা, ক্রিকেট নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী নন। পঁচাশি শতাংশ 'বিদেশি' ক্রিকেটার। যাঁরা কেউ দীর্ঘদিন ধরে ইটালিতে থাকতে-থাকতে বা আত্মীয়তা সূত্রে ফুটবলের দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলেন। ইটালির বিশ্বকাপ টিমের ব্যাটিং অলরাউন্ডার জে.জে স্মাটস জন্মসূত্রে দক্ষিণ আফ্রিকান। কিন্তু স্ত্রী ইটালীয়। খেলেন তাই ইটালির হয়ে। টিমের অধিনায়ক বিয়াল্লিশ বছরের ওয়েন ম্যাডসেনের জন্ম আবার ইংল্যান্ডে। ধমনীতে তাঁর ব্রিটিশ রক্ত বইছে। ইংল্যান্ডে সুযোগ না পেয়ে ইটালি চলে এসেছেন। এ ফাঁকে বলি, ২০০৬ সালে আবার দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ফিল্ড হকি বিশ্বকাপ খেলেছিলেন ওয়েন! পরে তাঁকে নিয়ে প্রচুর লেখাপড়াও হয়েছে।

বললাম না, ক্রিকেট এখনও নীল রক্তের খেলা নয় ইটালিতে। রাকবির হাসান নিজেই একদিকে বিশ্বকাপ টিমের ম্যানেজার, আর একদিকে ইটালীয় আম্পায়ার্স সংস্থার প্রধান। যিনি বলছিলেন, "বিশ্বকাপটা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, জানেন। ভালো খেললে, কিছু স্পনসর আসবে ক্রিকেটে। অর্থ আসবে।" শুনলাম, টিমটা যাতে ভালো খেলে, ভারত থেকে স্মরণীয় কিছু করে যায়, তার চেষ্টা-চরিত্র চলছে প্রভূত। প্রখ্যাত বিশ্বকাপার ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরিকে (জন্মসূত্রে অস্ট্রেলীয় ভিয়েরি এক সময় ক্রিকেটটাই মন দিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন) অনুরোধ করা হয়েছে, একটা ভিডিও বার্তা পাঠাতে। জশপ্রীত সিং-হ্যারি মানেন্ডিরা যাতে উদ্বুদ্ধ হন। ডিয়েরি কথা দিয়েছেন, পাঠাবেন। আগামী সোমবার ইডেনে স্কটলান্ডের বিরুদ্ধে নামার আগে তা চলে আসা উচিত। বার্তা চলে আসা উচিত এসি মিলন-জেনোয়া থেকেও।

"দেখবেন, আমরা ভালো খেলব। আমরা তো ভালো খেলছিও। নামিবিয়াকে হারিয়েছি। আরব আমিরশাহিকে দাঁড়তে দিইনি প্রস্তুতি ম্যাচে। একেবারে খালি হাতে ফিরে নিশ্চয়ই যাব না", টিম মানেজারের হাত থেকে ফোন নিয়ে এবার বলেন জশপ্রীত। ইডেনে কাপ-পদর্পণের প্রাক লগ্নে যর গলা কেমন যেন সম্মোহিতের মতো শেনায়। অস্ফুটে একবার বলেও ফেলেন, "ইডেন, আহা। কী যে মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে চলেছি আমরা। আচ্ছা, দাদা (সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়) থাকবেন তো মাঠে? দেখা করা যায় একবার ওঁর সঙ্গে?" শুনে ফোনের এ পারে শিহরণ হয়। কাঁটা দেয় গায়ে। ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। বিশ্বকাপ খেলার সাধ, স্বপ্নের নায়ককে দেখার অদম্য আকৃতি, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার উদগ্র বাসনা, কত কিছুই না করিয়ে দিতে পারে মানুষকে দিয়ে। যার পাশে গৌণ হয়ে যায় তার রুজি, তার রোজগার, তার পেশা, তার জীবন, তার যাপন। জানি না, ক'টা খেলা পারে এমন ভালোবাসাকে 'ভালো থাকা'-র বিরুদ্ধে জিতিয়ে দিতে। কেউ পারুক না পারুক, ক্রিকেট পারে। আর পারে বলেই ক্রিকেট আজও রাজার খেলা। সরি। রজার খেলা। প্রজার খেলা। জীবনের খেলা।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement